ইসলামি ভাবধারায় আকৃষ্ট হলেই চরমপন্থা বলা যায় না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ পিএম, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। নির্বাহী সভাপতি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা। উন্নয়ন প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর।

দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়নের সংকট এবং সমাধান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। গণতন্ত্র, সুশাসনের অভাবই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন। বলেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই হারিয়ে গেছে, যেখান থেকে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এ বিশ্লেষক। ‘লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার আমাদের। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে কাজ করছে ভারতের কয়েক লাখ মানুষতারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে রেখেছে’ বলেও অভিযোগ করেন।

এরপরও উদ্যমী মানুষের ওপর ভরসা রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের নিয়ে নানা সম্ভাবনার দিকও তুলে ধরেন। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : আগের আলোচনায় নানা সংকটের আলোকপাত করেছেন। এত সংকট থাকার পরও এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ নিয়ে অনেকে মিরাকেল (অলৌকিক ঘটনা) বলছেন। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান : মিরাকেল একটি মুখরোচক শব্দ। এমন শব্দের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি বাংলাদেশের সঙ্গে আরও দেশের তুলনা করেন। দেখেন, তারা কোথায় গেছে! আমরা আমাদের অতীতের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে অভ্যস্ত। অন্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চাই না।

সার্বিকভাবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গতি ও মানের। মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে হলে এ গতি ও মানের উন্নয়ন করতে হবে। এ এগিয়ে যাওয়া আমরা কোন কাঠামোতে নির্ধারণ করব, তা নিয়ে এখন আলোচনা করতে হবে।

জাগো নিউজ : আলোচনা শুরু হয়েছিল গণতন্ত্র, নির্বাচন প্রসঙ্গ দিয়ে। আপনি নানা সংকট ও সমাধানের কথা বলছেন। রাজনৈতিক সংকট জিইয়ে রেখে এসব সমাধান সম্ভব?

হোসেন জিল্লুর রহমান : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নানাভাবেই আসতে পারে। রাজনৈতিক সংকট রেখেও এগিয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা সেখানেও আমরা আসলে সফল কি-না, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। সরকারের লোকেরা সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের কথা বলে। ওই দেশগুলো দক্ষতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক এগিয়ে। আমরা কী সেখানে যেতে পেরেছি?

hossain-zillur-02

বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখতে পারছে ঠিক, কিন্তু নিজ দলের মধ্যেও যোগ্যদের ঠাঁই দেয়া হচ্ছে না। অদক্ষ, অযোগ্যরা দল ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তার মানে, সংকট সব জায়গাতেই। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করছে… সিঙ্গাপুরের ব্যাংক, শেয়ারবাজার কি বাংলাদেশের মতো? বালিশ-পর্দার দুর্নীতিই এখন বাংলাদেশের চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র দেখেন। সব বুঝতে পারবেন।

জাগো নিউজ : এ সংকটের জন্য দায় কি শুধুই শাসক দলের?

হোসেন জিল্লুর রহমান : না। এ সংকটের জন্য আরও দুটি পক্ষ দায়ী। বিরোধী শক্তি তার দায়িত্ব কি পালন করতে পারছে? শাসক দলের মতো তারাও দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেনি কোথাও। এমনকি নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্যেও। আরেকটি পক্ষ হচ্ছে, নাগরিক সমাজ। নাগরিক সমাজ তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি বলেই সমস্যা তীব্র হচ্ছে।

জাগো নিউজ : রাজনৈতিক সংকটের আলোচনা করলেন। নাগরিক সংকটের জন্য কোন বিষয়কে দায়ী করবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : নাগরিক সংকট নিয়ে আসলে আলোচনাই হচ্ছে না। আলোচনা করতে তো কোনো বাধা নেই। তুচ্ছ সুবিধার জন্য নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলের কাছে ভিড়ছে। যে কারণে নাগরিকদের হয়ে কথা বলার ভিত্তি তারা ক্রমশই দুর্বল করে ফেলছে। সুশীলরা ব্যক্তিস্বার্থে নির্লজ্জভাবে রাজনীতির পিছে দৌড়াচ্ছে।

এ কারণেই বলছি, বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক সংকট ও চ্যালেঞ্জে পড়েছে। শাসকশ্রেণি, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিতেই মানুষের ভরসা মিলছে না। কোনো মডেলই এখানে কার্যকর হবে না। আসলে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি, তা ভাবনার বিষয়।

hossain-zillur-02

জাগো নিউজ : কোন দিকে যাচ্ছি?

হোসেন জিল্লুর রহমান : আমাদের সম্ভাবনা ছিল দ্রুততার সঙ্গে মান নিয়ে ওপরের দিকে ওঠা। ঠিক দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এগিয়ে যেতে পারতাম আমরা। কিন্তু পারিনি।

আমি শঙ্কিত থাকি, আমাদের অবস্থা অনেকটা ফিলিপাইনের মতো হচ্ছে কি-না! ষাটের দশকে ফিলিপাইন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে আরও সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নানা সংকটের কারণে ফিলিপাইনে এখন চরম দরিদ্র লোকের বসবাস প্রচুর। সেখানে অতি-ধনী মানুষও আছে। ঠিক বাংলাদেশের মতো, বৈষম্যও তীব্র।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষতা ও সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারে আমরা নজর দিতে পারলে… দক্ষিণ কোরিয়ার মতো হতো বাংলাদেশ।

আমরা যদি এসবে নজর দিতে না পারি, তাহলে ফিলিপাইনের দিকেই যাত্রা হবে। যদিও অবধারিত নয়। কারণ শেষ বেলায় দুটি ভরসা আমাদের আছে। একটি হচ্ছে, উদ্যমী মেহনতি মানুষ। আরেকটি হচ্ছে, শত সংকটের মধ্যেও শাসকশ্রেণির কিছু বিষয়ে নজর দেয়ার বাধ্যবাধকতা। রাজনৈতিক চাপের কারণে নয়। কাঠামোর কারণেই নজর দিতে হয় কিছুটা।

আমরা খণ্ডিত অর্জন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। অথচ, আমাদের বিরাট সম্ভাবনার পথ এখনও রুদ্ধ হয়নি। রাজনৈতিক সংকট আমাদের ঘিরে ধরছে।

জাগো নিউজ : এ সংকট থেকে চরমপন্থার সংকটকেও অনেকে যুক্ত করছেন। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান : সমাধানের পথগুলো আমরা খুলে রাখতে না পারলে চরমপন্থায় যে কেউ ভরসা করতেই পারে। রাজনীতির ঘাটতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে অন্য কেউ এসে পূরণ করবে, তা খুব স্বাভাবিক।

hossain-zillur-02

জাগো নিউজ : ধর্মীয় অনুভূতির প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্রই। বিশেষ করে ওয়াজ-মাহফিল ও বাউলদের কয়েকটি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত। সংসদেও আলোচনা হলো। এ নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ আছে আপনার?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিষয়টি আরেকটু দেখা দরকার। এসব বিশ্লেষণ করতে হলে গভীরে যেতে হয়।

সময় ও বাস্তবতার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। পাশের দেশ ভারত মুসলিমবিরোধী অবস্থান নিয়ে আইন করছে। রোজ সীমান্তে মানুষ মারছে। রোহিঙ্গা ইস্যু সামনে। সঙ্গত কারণে তরুণদের মধ্যে প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব বিকাশ ঘটতেই পারে। নিজে হুমকির মুখে থাকলে ধর্মাশ্রিত হয়ে মুক্তির পথ খোঁজে।

আন্তর্জাতিক নানা পক্ষও আছে। তারাও সুযোগ নেয়। তরুণরা শূন্যতা পছন্দ করে না। আপনি যখন সব পথ বন্ধ করে দেবেন, তখন অন্য পথের সন্ধান করতেই পারে তারা। সমাজে উন্নয়নের যে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে, সেখানে আদর্শের বিশাল এক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চোখ দেন। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর ঢাবিতেও নির্যাতন দেখতে হলো। এসবের মধ্য দিয়ে তরুণরা বিভ্রান্ত। আদর্শের শূন্যতা রেখে আপনি নিয়ন্ত্রণমূলক কায়দায় তরুণদের পথ দেখাতে পারবেন না।

তবে ইসলামি ভাবধারায় তরুণরা আকৃষ্ট হলেই তাকে চরমপন্থা বলতে পারি না। শূন্যতা সব জায়গাতেই। যারা ওয়াজ-মাহফিলে বক্তব্য দিচ্ছেন, তারাও যে আদর্শমান নিয়ে কথা বলছেন, তা বলা মুশকিল। সেখানেও তো ধর্মীয় গোঁড়ামির চর্চা হচ্ছে। অথচ, ইসলামি আদর্শের ইতিহাস-ঐতিহ্যেরও কথা সমাজে আছে। এ আদর্শকে ইতিবাচকভাবে দেখতেই অভ্যস্ত মানুষ।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

যারা ওয়াজ-মাহফিলে বক্তব্য দিচ্ছেন, তারাও যে আদর্শমান নিয়ে কথা বলছেন, তা বলা মুশকিল

আমি শঙ্কিত থাকি, আমাদের অবস্থা অনেকটা ফিলিপাইনের মতো হচ্ছে কি-না

রোজ সীমান্তে মানুষ মারছে। রোহিঙ্গা ইস্যু সামনে। সঙ্গত কারণে তরুণদের মধ্যে প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব বিকাশ ঘটতেই পারে

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলের কাছে ভিড়ছে। ব্যক্তিস্বার্থে নির্লজ্জভাবে রাজনীতির পিছে দৌড়াচ্ছে

বিরোধী শক্তি তার দায়িত্ব কি পালন করতে পারছে? শাসক দলের মতো তারাও দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেনি, এমনকি নেতৃত্ব নির্বাচনেও

বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখতে পারছে ঠিক, কিন্তু নিজ দলের মধ্যেও যোগ্যদের ঠাঁই দেয়া হচ্ছে না। অদক্ষ, অযোগ্যরা দল ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছে