‘সাজানো মামলায়’ সাজার মুখে কাঁদছেন হাসান

আদনান রহমান
আদনান রহমান আদনান রহমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১৬ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পল্টনের হোটেল বন্ধু আবাসিকের ম্যানেজার হাসান মজুমদার ও বাবুর্চি সোহেল রানা। এ দু’জনের বিরুদ্ধে জাল টাকা কারবারের অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালের ৭ নভেম্বর মামলা করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৬ নভেম্বর বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে মতিঝিলের ফকিরাপুলের মাছবাজার এলাকা থেকে জাল টাকা বেচা-কেনার সময় গ্রেফতার করা হয় তাদের। দুজনের কাছ থেকে একটি শপিং ব্যাগে এক হাজার টাকার জাল নোটের সর্বমোট ২৫ লাখ টাকা উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করা হয় এজাহারে।

অথচ হোটেল বন্ধু আবাসিকের ৬ নভেম্বরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, ৬ নভেম্বর দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশের একটি দল হোটেল থেকে হাসান মজুমদার ও সোহেল রানাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে ডিবির এক কর্মকর্তা হোটেলের কর্মচারীকে দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেন। ক্যামেরা বন্ধ করলেও তার আগের ফুটেজগুলো থেকে যায়। তুলে নেয়ার সময় ‘অসাবধানতাবশত’ মার্কেটের একটি ক্যামেরা চোখে পড়েনি ডিবি কর্মকর্তাদের। সেই ক্যামেরায়ই ধরা পড়ে দুজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। হাতকড়া পরা দুজনের হাত তখন একেবারেই খালি ছিল।

স্বভাবতই এজাহারের সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজের বর্ণনার মিল না থাকলেও ওই মামলায় দুজনকে আদালতে পাঠানোর পর দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। পরে দুই আসামিকে কারাগারে পাঠান আদালত।

পাঁচ মাস ১৭ দিন পর কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন হাসান মজুমদার। একের পর এক অভিযোগ দেন পুলিশের দফতরে। কাজতো হলোই না, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমঝোতার প্রস্তাবে রাজি হয়ে হাসান শিকার হলেন আরও অভিনব প্রতারণার। এ মামলায় এখন সাজার মুখোমুখি হয়ে কাঁদছেন হাসান ও সোহেল।

CCTV

ক্যামেরায় ধরা পড়ে দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

৬ নভেম্বরের সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা যায়

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ৬ নভেম্বর দুপুর ২টার পর একদল সাদা পোশাকধারী পল্টনের হোটেলটিতে ঢুকে কাউন্টারে কয়েকজনের সাথে কথা বলছেন। এরপর তারা একজন কর্মচারীকে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধের নির্দেশ দেন এবং সব ক্যামেরার ফুটেজ মুছে দিতে বলেন। এরপর দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলে দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে চলে যান।

মামলার এজাহারে যা উল্লেখ আছে

হাসান ও সোহেলের বিরুদ্ধে ডিবির মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল মতিঝিল থানার ফকিরাপুলের মাছ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন জাল টাকার ব্যবসায়ীকে ধাওয়া করে। অন্যরা পালিয়ে গেলে হাসান ও সোহেলকে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ। এ সময় হাসানের কাছে থাকা একটি শপিং ব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার ২০টি বান্ডিল অর্থাৎ ২০ লাখ জাল টাকা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া নোটগুলো ‘কঢ ৫৬৩৭৫৭৪২’ এবং ‘কঢ ৫৬৩৭৫৭৪৩’ সিরিজের। সোহেলের হাতে থাকা একটি শপিং ব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার পাঁচটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্ত

মতিঝিল থানায় দায়ের হওয়া মামলাটির বাদী হয়েছিলেন কথিত অভিযানের নেতৃত্বদাতা অফিসার ডিবির ইন্সপেক্টর তপন কুমার ঢালী। মামলার তদন্তের ভার পান অভিযানে উপস্থিত আরেক কর্মকর্তা ডিবির এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল।

সেদিন যা ঘটেছিল

জামিনে মুক্ত হয়ে আইনি লড়াইরত মামলার প্রধান আসামি হাসান মজুমদার ঘটনার বর্ণনায় জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর দুপুরে পুরোনা পল্টনের হোটেল বন্ধু আবাসিকের রিসিপশনে বসেছিলাম আমি। হোটেলের গেস্টদের খাবারের জন্য বাজারে কেনাকাটা করতে যাচ্ছিল বাবুর্চি সোহেল রানা।

আমি রিসিপশনে ডিউটিরত অবস্থায় পাঁচজন লোক কাউন্টারে ‘হোটেলের ম্যানেজারকে’ খুঁজতে থাকে। আমি তাদের পরিচয় জানতে চাই। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে বলেন, তারা আমার ক্যাশ চেক করবেন। আমি না বললেও তারা জোর করে আমার ক্যাশ দেখেন। আমি খুলে দেখাই। এরপর ডিবির কনস্টেবল নয়ন কুমার আমাকে বলেন, ‘আমাদের অফিসে (মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়) চল’। আমি জিজ্ঞাসা করি, অফিসে যাব কেন? কনস্টেবল নয়ন বলেন, ‘অফিসে চল। সেখানে আমাদের স্যার (তৎকালীন ডিবির সহকারী কমিশনার- এসি জুয়েল রানা) আছেন, স্যারের সাথে দেখা করে আবার এখানে নিয়ে আসব। গাড়িতে দিয়ে যাব।’

হাসান বলেন, আমরা না যেতে চাইলেও তারা জোরাজুরি শুরু করল, আমার ও বাবুর্চির হাতে হাতকড়া পরাল। আমাদের হোটেলটা একটা মার্কেটের ভেতর। হোটেল ও নিচের মার্কেটের কয়েকজন তাদের কাছে হাতকড়া পরানোর কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, ‘আপনাদের কাজ আপনারা করেন। এগুলো পরে বুঝবেন।’

cctv-2

‘একপর্যায়ে নয়ন কুমার আমাকে একটা থাপ্পড় দিয়ে ফেলল। তখন আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। আমি যেতে না চাইলেও একপর্যায়ে তারা আমাকে জোরাজুরি করল নেয়ার জন্য। একসময় তারা দেখল একটা সিসি ক্যামেরা। জিজ্ঞাসা করল, ‘সিসি ক্যামেরা চালু আছে? মনিটর কোথায়? এটা ভাইঙা ফালামু।’ আমি বললাম, ‘রুমের চাবি মালিকের কাছে। মালিক ইন্ডিয়া গেছে চিকিৎসার জন্য।’ পরে আমাদের সহকারী ম্যানেজার ফরহাদ মিয়াকে দিয়ে সিসি ক্যামেরা অফ করতে বলে, তখন ও চেয়ারের ওপরে দাঁড়াইয়া ক্যামেরা অফ করে। নিচতলায় একটা ক্যামেরা ছিল ওটা ওরা দেখে নাই।’

হাসান বলেন, ক্যামেরা খোলার পর আমাদের দুজনকে নিচে নামিয়ে একটি সাদা মাইক্রো গাড়িতে তুললো। মাইক্রোতে তুলে আমাদের মিন্টো রোডে (ডিবি কার্যালয়) নিয়ে যাচ্ছিল। মিন্টো রোডে নেয়ার সময় তারা (ডিবি অফিসার) ৮-৯ জন মিলে কথা বলতেছে, ‘একটা ধান্দা খুঁইজ্যা পাওয়া গেছে’।

Part-4

ডিবি কর্মকর্তার নির্দেশে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করার দৃশ্য

পরে মিন্টো রোডে নিয়ে ডিবির এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল হোসেনের সামনে আমাকে বসালো। বসে কিছুক্ষণ পরে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমাদের এখানে আনছেন কেন?’ উনি উত্তর দিলেন, ‘স্যার (তৎকালীন ডিবি পূর্ব বিভাগের সহকারী কমিশনার- এসি জুয়েল রানা, বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে ডিএমপির এডিসি) আসুক। উনি ৫টা বাজে আসবেন। তার সাথে কথা বলে আপনাদের ছেড়ে দেব।’

‘অনেকক্ষণ বসে থাকার পর (এডিসি) জুয়েল রানা এলেন। তিনি এসে আমাদের সাথে কথা বলে ৬-৭ জনকে নিয়ে তার রুমের ভেতর কী যেন আলাপ করছিলেন। অফিসাররা কিছুক্ষণ পর বের হয়ে আমার ও সোহেলের চোখে গামছা বেঁধে ফেললেন। আমার পকেটে ৮-৯ হাজার টাকা ছিল, সোহেলের কাছে ৭০০-৮০০ টাকা ছিল। দুজনের পকেট থেকে টাকা নিয়ে গামছাটা খুলে দেয়া হলো। আমার সামনেই তারা হাসছিলেন এবং ৫০০-১০০০ টাকা করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।’

হাসান বলেন, পরে কনস্টেবল নয়ন কুমার আমাকে সাইডে ডেকে বললেন, ‘আপনার মালিকতো বিদেশে, আপনার ক্যাশ থেকে আমাদের তিন লাখ টাকা দিয়ে দেন। টাকা দিলে আপনার কিছু হবে না, আমরা আপনাকে দিয়ে আসব। আর টাকা না দিলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা হবে।’ আমি জিজ্ঞাসা করি, ‘কী মামলা হবে?’ উত্তরে নয়ন কুমার বলেন, ‘জাল টাকার মামলা হবে।’ আমি প্রশ্ন করি, ‘আপনারা কি আমার কাছে কোনো জাল টাকা পেয়েছেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘এগুলা আমাদের কাছে আছে, আমরা এগুলা সিস্টেম করতে পারি। ওপরের নির্দেশে আপনার নামে মামলা হয়ে যাবে। যদি টাকা দেন তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।’ এরপর আমাদের দুজনকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ৭ নভেম্বর এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল আমাকে বলেন, ‘ভাই মনে কিছু কইরেন না, আমরা আপনাকে ছোটখাট একটি মামলা দিয়েছি। টাকাটা দিলে আর কিছু হতো না’। পরদিন আমাদের আদালতে তুলে দুদিন করে রিমান্ডে নেয়া হয়।

দফতরে ‘অভিযোগ’এবং ডিবির নানা রঙ

হাসান মজুমদার জেলে থাকা অবস্থায় তার জমজ ভাই হোসেন মজুমদার সিসিটিভি ক্যামেরার সেই ফুটেজ নিয়ে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর পুলিশ সদরদফতরের আইজিপি কমপ্লেইন সেলে একটি অভিযোগ করেন। সেখানে ডিবির নয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তরা হলেন- মতিঝিলে সংঘটিত কথিত অভিযানের দলনেতা ইন্সপেক্টর (ডিবি-পূর্ব) তপন কুমার ঢালী, জাল টাকার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই মো. সোহেল মাহমুদ, এএসআই আবুল বাশার, এএসআই মো. মমিনুল হক, এএসআই মো. নাজমুল হক প্রধান, কনস্টেবল নয়ন কুমার ও কনস্টেবল গোলাম সারোয়ার।

সেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পান পুলিশ সদরদফতরের এএসপি ওমর ফারুক। প্রাথমিক তদন্ত ও ডিবি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন তিনি। এরপর এএসপি ফারুকের মাধ্যমে ডিবির কর্মকর্তারা হাসানকে সমঝোতার প্রস্তাব দেন এবং অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বলেন।

হাসান বলেন, অভিযুক্ত ডিবি কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে বলেন, তারা মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেবেন। চার্জশিট দেবেন না। চার্জশিট দিলেও সেখান থেকে আমার নাম বাদ দেবেন এবং আমাকে পাঁচদিনের মধ্যে জামিন করাবেন। মামলার যাবতীয় খরচ বহন করবেন তারা। একদিকে পুলিশের মাধ্যমে সমঝোতা প্রস্তাব, আরেকদিকে আমার পরিবারের অনেককে অনুরোধ এবং একইসঙ্গে চাপ দেয়া হতে থাকে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য। এই প্রেক্ষাপটে এএসপি ওমর ফারুকের মধ্যস্থতায় আমার হোটেলের মালিক হুমায়ুন কবিরের পরামর্শে আমার ভাই অভিযোগ প্রত্যাহার করেন। তবে প্রত্যাহারের পর তারা আমাদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ করেননি। আমাদের ফোন ধরেননি। কোনো যোগাযোগ করেননি।

২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংস্থা বদলির আবেদন করে হাসানের পরিবার। এবার নতুনভাবে তদন্তের ভার দেয়া হয় ডিবি কার্যালয়ের এডিসি কাজী শফিকুল আলমকে। সেই মামলার তদন্তে হাসানের ভাই হোসেন ও অভিযুক্ত ডিবি কর্মকর্তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই হোসেনকে নতুন প্রস্তাব দেন ডিবি কর্মকর্তারা। তারা বলেন যে, চার্জশিট থেকে হাসানের নাম বাদ দেয়া হবে। তারা আবারও মামলার খরচ চালানোর ‘ফিগার’ চান এবং জামিন করানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এবার আর তাদের প্রস্তাবে অভিযোগ প্রত্যাহার করেনি হাসানের পরিবার।

দীর্ঘ পাঁচ মাস ১৭ দিন কারাবাসের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ফেরেন হাসান মজুমদার।

হাসান বলেন, জামিনে মুক্তির পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল হোসেন আমাকে ডিবিতে ডেকে পাঠান। সেখানে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে চুমা দিয়ে বলেন, ‘ভাই আমরা ভুল করে ফেলেছি। আপনি অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিন।’

‘এরপর আমি তদন্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ও ডিবি কর্মকর্তাদের আশ্বাসে অভিযোগ প্রত্যাহার করি। কিন্তু এর কয়েকদিন পরেই দেখি আমার নামে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। বিষয়টি আমি মধ্যস্থতাকারী ও ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা কাজী শফিকুলকে জানাই। পরে তিনি তৎকালীন এসি জুয়েল রানা ও দেওয়ান উজ্জ্বলকে ডেকে পাঠান।’

এডিসি কাজী শফিকুলের রুমে ওই দুজন হাসানকে আশ্বাস দেন যে, তারা আদালতে এমনভাবে সাক্ষী দেবেন যাতে হাসান ও পুলিশের কারও যেন কোনো সমস্যা না হয় এবং এই মামলায় হাসান খালাস পাবেন বলে জানান তারা।

হাসান বলেন, অভিযোগ প্রত্যাহারের পরে ডিবি কর্মকর্তারা আমার সাথে আবারও প্রতারণা করেন। তারা আমার বিরুদ্ধে ফকিরাপুলের মাছবাজার এলাকার তিনজন সাক্ষী দাঁড় করান এবং তারা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেন। সাক্ষীরা নিজ চোখে আমাকে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালাতে দেখেন বলে আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দেন। অথচ সেদিন সোয়া ৪টায় আমরা ডিবি অফিসেই ছিলাম। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজেও সব স্পষ্ট দেখা যাবে। তাছাড়া আমাদের খালি হাতে তুলে নেয়ার প্রমাণও আছে সিসিটিভি ফুটেজে।

cctv-1

ডিবির এমন আচরণে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে আবারও আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ দেন হাসান।

ডিএমপির কাছে দেয়া তদন্তের দায়িত্ব পান সিনিয়র এএসপি (বর্তমান অতিরিক্ত এসপি) শরীফ। তিনি দুপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রিপোর্ট জমা দেন। ২০১৮ সালে একই অভিযোগ পুনঃতদন্তের ভার দেয়া হয় ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট এডিসি শাহেদ মিয়াকে। তিনি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে ৩৪ কার্যদিবসে প্রতিবেদন দেন।

অন্যদিকে হাসানের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারকার্য চলতেই থাকে। আবার হাসানকে চাপ ও হুমকি দিয়ে বিভাগীয় অভিযোগ তুলে নিতে বলতে থাকেন তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়ান উজ্জ্বলসহ অন্যরা। এ কারণে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন হাসান।

হাসান বলেন, ২০১৯ সালের দিকে তানভীর নামে এসি জুয়েল রানার বড় ভাই পরিচয়ে একজন আমার হোটেলে গিয়ে আমাকে খানা বাসমতি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে তিনি বলেন যে, আপনার অভিযোগের কারণে তাদের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। আর তাদের ক্ষতি হলে আপনাকে আর ছাড়বে না।

পরে তৎকালীন ডিমএপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াকে আমি সরাসরি ফোন করি। তখন তিনি আমাকে ডেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন তৎকালীন ডিবি প্রধান দেবদাস ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে। তবে তারা কী রিপোর্ট দিয়েছেন এখনও জানা নেই।

আবেগাপ্লুত হাসান বলেন, চার বছর ধরে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছি। প্রতি হাজিরায় ৭-৮ হাজার টাকা উকিলকে দিতে হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমি পরিবারের বড়। আমার ওপর গোটা পরিবার নির্ভর করে। এত বড় বিপদে আমার পরিবার কী অবস্থায় আছে বলেন! মে মাসে মামলার শুনানি আছে। এরপর যে কোনোদিন রায় হতে পারে। এই মিথ্যা মামলায় আমার যদি সাজা হয়, তাহলে আমার পরিবার পথে বসে যাবে। তাই ন্যায়বিচার চেয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

হাসান ও সোহেলের বিরুদ্ধে আদালতে ডিবি-পূর্বের টিম মোট ১৩ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করে। ১৩ জনের মধ্যে নয়জনই পুলিশ কর্মকর্তা। বাকি চারজনকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মামলার প্রধান সাক্ষী কথিত ওই অভিযানের নেতৃত্বদাতা অফিসার ইন্সপেক্টর তপন কুমার ঢালী। তিনি বর্তমানে পিবিআইয়ে কর্মরত। বাদীর অভিযোগ ও প্রকৃত ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এজাহারে যা লেখা আছে তাই সত্য। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলতে পারব না। আপনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন, ডিবি-পূর্ব বিভাগের সাথে কথা বলেন।’

মামলার আরেক সাক্ষী ফকিরাপুল মাছ বাজারের ব্যবসায়ী মিন্টু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি যেটা দেখেছি, সেটাই আদালতে বলেছি। আমি সত্য বলেছি। আমি দেখেছি, পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ধরেছে।’

সূত্র জানায়, পুলিশের বিভাগীয় তদন্তেও মিন্টুকে ডাকা হয়েছিল। সেখানে তিনি জানান, মিন্টুকে অভিযানে সাক্ষী দেয়ার জন্য পুলিশ যেভাবে বলেছে, তিনি সেভাবেই আদালতের সামনে বলেছেন।

আদালত ও পুলিশের বিভাগীয় তদন্তে দুই ধরনের বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে মিন্টুকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি যেখানে যা বলেছি সত্য বলেছি।’

সাক্ষীদের সবার জবানবন্দি দাড়ি-কমায় হুবহু মিল

আদালতে জমা দেয়া মামলার চার্জশিটটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এতে সাক্ষী হিসেবে মিন্টু ও রাজু পুলিশের কাছে হুবহু একই জবানবন্দি দিয়েছেন। শুধু তাদের নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা ভিন্ন। ঘটনার বিবরণ দুজনই একই দিয়েছেন, যা এজাহারের ঘটনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। দাড়ি-কমারও কোনো পরিবর্তন নেই।

পাশাপাশি বাকি দুজন সাক্ষী শরিফুল ইসলাম আকাশ ও কামরুজ্জামান রুচি পুলিশের কাছে হুবহু একই জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাদের ঘটনার বিবরণের আকার একটু ছোট।

চার্জশিটে বর্ণিত অন্য সাক্ষীদের জবানবন্দির মধ্যে ডিবি পূর্বের এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সোহেল মাহমুদ, এএসআই মোমিনুল হক, এএসআই নাজমুল হক প্রধান, এএসআই আবুল বাশার, কনস্টেবল নয়ন কুমার, কনস্টেবল গোলাম সারোয়ারও আদালতের কাছে চার্জশিটে হুবহু একই জবানবন্দি দিয়েছেন। সাতজনের মধ্যে জবানবন্দিতে বিন্দুমাত্র এদিক-সেদিক নেই।

মামলার অসঙ্গতি ও জোর করে মামলা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি বিচারাধীন বিষয়। এই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। প্লিজ, এ বিষয়ে আমি আর কোনো কথা বলব না।’

তখন প্রতিবেদকের তরফ থেকে বলা হয়, ‘আপনার বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার আগে আসামির কাছে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে...’ পুরো কথা শেষ না হতেই দেওয়ান উজ্জ্বল ‘প্লিজ আমি কিছু বলব না’ বলে ফোন কেটে দেন।

মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও পুলিশের অভিযোগের সত্যতার বিষয়ে জানতে চাইলে একটি তদন্তের দায়িত্ব পালন করা ডিবি কার্যালয়ের এডিসি কাজী শফিকুল আলম ‘অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়ে’ জাগো নিউজের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।

ঘটনার আরেকটি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডিএমপির বর্তমান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এডিসি শরীফও জাগো নিউজের সাথে এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘পুলিশের হাতে মানুষের হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট বাড়ছে।’

এআর/এইচএ/এমএআর/পিআর