ফ্লাইটের প্রতিটি মুহূর্তই চ্যালেঞ্জিং

আদনান রহমান
আদনান রহমান আদনান রহমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪০ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২০

গাঁয়ের বাড়ি বরিশাল হলেও জন্ম পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। শৈশবও কেটেছে এখানে। পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা মেয়েকে পরিবার ‘ব্যারিস্টার’ বানানোর স্বপ্ন দেখলেও সেদিকে তেমন আগ্রহ ছিল না তার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা পাইলট হওয়ার স্বপ্নও ছিল না। তার কেবল একটাই চাওয়া ছিল, ‘নিজেকে সাকসেসফুল নারী হিসেবে গড়ে তোলা’। আজ সাফল্যের ফুল বিছানো পথে হাঁটছেন ফাতেমা তুজ জোহরা একা। ২০১২ সালে কেবিন ক্রু হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে আট বছর ধরে উড়ছেন আকাশে। এখন সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস (৮ মার্চ) উপলক্ষে একার এ সাফল্যযাত্রার গল্প শুনেছে জাগো নিউজ। আলাপচারিতায় একা তার ‘সাকসেসফুল’ হয়ে ওঠার পাশাপাশি পথ বাতলেছেন স্বপ্নবাজ তরুণীদের জন্যও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক আদনান রহমান

জাগো নিউজ : আকাশে ওড়ার শুরুর গল্পটা…

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় এসএসসি এবং ২০০৯ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। পরিবারের চাওয়া ছিল, ব্যারিস্টার বানাবে। সেজন্য যেন আইনে পড়াশোনা করি। ২০০৯ সালে এইচএসসি দেয়ার পরপর পারিবারিক সমস্যার কারণে আমার পড়াশোনায় একটা বছর গ্যাপ হয়। আইনটা আর পড়া হয় না। তখন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে অনার্সে ভর্তি হই। পাশাপাশি আমি মিডিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম, নাচ করতাম।

২০১২ সালে আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। সিদ্ধেশ্বরীর এক বন্ধুর বোনের (দেশের বাইরে থাকেন) মাধ্যমে আমার একটি অফার আসে। তার মোটিভেশনেই আমি প্রথমে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের জন্য সিভি দেই। তারা আমাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকে। আমার হাইট-ওয়েটসহ (উচ্চতা-ওজন) অনেকগুলা এক্সাম হয়। আমি সবগুলোই পাস করি। আমাকে কোথাও স্ট্রাগল করতে হয়নি, সামহাউ আমি সিলেক্ট হয়ে যাই।

Eka-top.jpg

কেবিন ক্রু হিসেবে প্রথম ফ্লাইটটি ছিল ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের, এয়ারবাস-৩১০ এ। এর আগে ক্রু হিসেবে তো দূরের কথা, বরিশালের বাইরে কখনো প্লেন ভ্রমণই করিনি। কর্মজীবনের প্রথম দিকে স্বজনদের সাপোর্টও খুব বেশি ছিল না। এখন বাবার বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি, সবার গর্বের পাত্রী হিসেবে নিজেকে দেখতে পাই। একসময় যেই মেয়েটির সব দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত তার মা-বাবার কাঁধে ছিল, সেই মেয়েটি এখন প্রতিদিন ১৬৪ জনকে মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা সন্তান ভেবে তাদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছেন।

জাগো নিউজ: প্রথম ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা: ভয়াবহ। নার্ভাসনেস ছিল, ভয় ছিল। যদিও প্রথম ফ্লাইট থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, তবে অভিজ্ঞতাটা এককথায় ভয়াবহ ছিল। আমার কখনো আন্তর্জাতিক বা লং রুটে প্লেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল না। ক্রু হওয়ার আগে ঢাকা থেকে বরিশালের একটি ফ্লাইটে ফ্লাই করেছিলাম। সেটা ছিল অল্প সময়ের ফ্লাইট। একা ট্রাভেলিংয়ের অভিজ্ঞতা তো ছিলই না। একা প্রথমবার দেশের বাইরে যাচ্ছি, অন্যরকম একটা ফিলিংস ছিল।

সেই ফ্লাইটে আমার পাইলট যিনি ছিলেন, তিনি আমাকে ককপিটে ডেকে নিয়ে টেকঅফ ও ল্যান্ডিং দুটোই দেখালেন। সেটা অসাধারণ একটা অনুভূতি ছিল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল তখন। মনে হচ্ছিল, ‘আই ওয়াজ বর্ন টু ফ্লাই’। আমার জন্মই যেন হয়েছিল ফ্লাই করার জন্য। উপলব্ধি হচ্ছিল, আমি জীবনের রাইট ট্র্যাকে আছি, সঠিক পেশাটিই বেছে নিয়েছি।

জাগো নিউজ : আকাশে উড়ে চলার এতো দিনে এসে কী মনে হয়?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : একের পর এক ফ্লাইটে ফ্লাই করতে করতে এ পেশার প্রতি একটা মোহ তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে যোগ দিই। এখানে প্রথমে এক বছর ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে ছিলাম। এরপর ডোমেস্টিক ফ্লাইটেও যাওয়া শুরু করি। ডোমেস্টিকের ছোট প্লেনের ফ্লাইটগুলো একাই একজন ক্রুকে ম্যানেজ করতে হয়। ফ্লাইটে শুধু খাবার সার্ভ করাই নয়, একজন ক্রুকে সব যাত্রীর দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে হয়। তাই যখন আমি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সিনিয়র হয়ে যাই, তখন আমাকে ডোমেস্টিকে দেয়া হয়। আমি এখন এখানে কেবিন ইনচার্জ। অর্থাৎ যাত্রীদের পাশাপাশি ফ্লাইটের সবার দায়িত্ব আমার কাঁধে।

Eka-top.jpg

জাগো নিউজ : এতো যাত্রীর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ফ্লাইটে কেমন অনুভূতি হয়?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : এই অনুভূতিটা বলে বোঝানোর মতো নয়। এমন দায়িত্ব যার কাঁধে পড়ে সে-ই জানে এই অনুভূতি। আমরা যখন বোয়িং ৭৩৭-এ ফ্লাই করি, তখন কেবিন ইনচার্জ হিসেবে পাইলট ও অন্যান্য ক্রু ছাড়াও ১৬৪ জনের সবকিছুর দায়িত্ব আমার কাঁধে থাকে।

যখন ফ্লাইটে খারাপ কোনো কিছু হয়, ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন হয়, তখন আমাকে ওই ১৬৪ জন, আমার অন্যান্য ক্রুদের সহিসালামতে বের করতে হবে- এ ব্যাপারে আমাদের ট্রেইনড করা হয়। প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি প্রতিদিন এমন প্রস্তুতি নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।

জাগো নিউজ : পেশাটা কেমন চ্যালেঞ্জিং?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : আমার জন্য প্রতিটা ফ্লাইটই একেকটা চ্যালেঞ্জ। বর্ষাকালের তিন মাস আবহাওয়া অনেক বাম্পি থাকে। এ কারণে প্লেনে অনেক ঝাঁকুনি হয়। সে সময় যাত্রীরা অনেক ভয় পেয়ে যান, বমি করেন, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের সামাল দেয়া, ‘আমরা সুন্দরভাবে ল্যান্ড করবো’ বলে সাহস ও আশ্বাস দেয়া- এ কাজগুলো করতে হয়। প্রতিটা দিন, ফ্লাইটের প্রতিটি মুহুর্তই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়।

jagonews24

জাগো নিউজ : মেয়ে হিসেবে এ পেশায় কোনো বৈষম্যের শিকার হয়েছেন?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : এই পেশায় আমি এখনো নেগেটিভ কিছু ফেস করিনি। এই পেশায় ফ্রি এনভায়রনমেন্টে কাজ করা যায়। অন্য অফিসের মতো কাজ হয় না এখানে। আমরা একটা বদ্ধ ফ্লাইটে জব করি। এখানে আপনাকে ফ্রেন্ডলি হতে হবে, ওপেনমাইন্ডেড হতে হবে, চার্মিং থাকতে হবে। কারও মধ্যে যদি এসব গুণ না থাকে তাহলে সে এই পেশায় বোরড হয়ে যাবে, একঘেয়েমি কাজ করবে। আপনি যদি সবকিছু সহজভাবে নিতে পারেন তাহলে সহজ, আর যদি আপনি সহজভাবে না নিতে পারেন তাহলে এখানে আপনি সার্ভাইব করতে পারবেন না।’

Eka-top.jpg

এছাড়া মেয়েদের চলার ক্ষেত্রে অনেক সময় অনেকরকম প্রবলেম আসে, সেটাকে ট্যাকেল দেয়ার প্রিপারেশন মেয়েদেরই নিতে হবে। কেউ আপনাকে জায়গা করে দেবে না। আপনাকে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে।

জাগো নিউজ : কর্মজীবনের প্রথম দিকে পরিবারের সাপোর্ট পাননি। এরপর কী ঘটেছিল?

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভে এটা স্বাভাবিক ছিল। একটা মেয়ে একা একা প্রতিদিন যাবে, ফ্লাই করবে, এটা সবাই আসলে ভালো চোখে দেখে না। পরে ধীরে ধীরে পরিবারের পার্সপেক্টিভ বদলাতে থাকে। আমি যখন সাজগোজ করে জবে যাই, তখন অনেকেই দেখে, বাবাকে জিজ্ঞেস করে যে মেয়ে কী করে। বাবা যখন বলে যে মেয়ে প্লেনে চাকরি করে, তখন তারা খুব অবাক হয়। কারণ প্লেনে চাকরি পাওয়া ও করা অত সহজ নয়। তখন তারা বাবাকে বলে যে, আপনার মেয়ে খুব ভালো, ভালো চাকরি করে, হ্যান্ডসাম স্যালারিও পায় ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব শোনার পর পরিবার খুব ভালো সাপোর্ট করে।

জাগো নিউজ : দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে...

ফাতেমা তুজ জোহরা একা : ওর (স্বামী) সঙ্গে পরিচয়টা ২০১২ থেকে। সেই সূত্রে ২০১৮ সালে বিয়ে করি। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে থেকেও কাজে বিন্দুমাত্র সমস্যা হচ্ছে না। বাবার বাড়ি, স্বামী-শ্বশুরবাড়ি, সবার সাপোর্টের কারণেই আজ আমি এখানে।

এআর/এইচএ/এমএস