চাকরিতে প্রবেশে এগিয়ে, নীতিনির্ধারণী পদে পিছিয়ে নারী

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০০ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২০

 

আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশিসংখ্যক নারী সরকারি চাকরিতে আসছেন। তবে নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে তারা পিছিয়ে রয়েছেন— এমনটি মনে করছেন নারী কর্মকর্তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে আরও বেশিসংখ্যক নারী দেখা যাবে।

প্রশাসনে ২৮টি ক্যাডার সার্ভিস ছাড়াও সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া দফতর ও সংস্থা পর্যায়ে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। উপসচিব থেকে উপরের পদগুলোকে সরকারের পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের সাবেক মহাসচিব নাসরিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এন্ট্রি লেভেলে নারীর অবস্থান ঠিক আছে। কিন্তু ডিসিশন মেকিংয়ে নারীর সংখ্যা এখনও অনেকটাই কম। নারী যারা সচিব রয়েছেন তাদের একটা অংশ মূল ধারার সচিব নন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, ভূমি আপিল বোর্ডের সদস্য। সচিবালয়ের সচিব হিসেবে নারীদের সংখ্যা খুবই কম।

‘আমাদের একটা দাবি ছিল, ডিসিশন মেকিংয়ে নারীদের সংখ্যা একটু বাড়ুক। কিন্তু সেই সংখ্যাটা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি।’

top11.jpg

‘তবে ১০ বছরের আগের পরিস্থিতি চিন্তা করলে প্রশাসনে এখন নারীদের অবস্থা অনেক ভালো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো নারীদের ব্যাপারে পজেটিভ, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রশাসনের নারীরা অনেক কিছু পেয়েছেন’- বলেন সরকারের সাবেক এ সচিব।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম-সচিব সায়লা ফারজানা বলেন, ‘প্রশাসনে আগের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেড়েছে। যোগ্যতার বিচারে নারীকে সিলেক্ট করা হচ্ছে। কোটার কথা শুনে আসছি, এখন আর কোটার জন্য নারীকে অপেক্ষা করতে হয় না। মেয়েরা এখন এত ভালো করছে যে, তাদের পারফরম্যান্স বেইজ পদোন্নতি, পদায়ন হচ্ছে।’

‘তবে নীতিনির্ধারণী পদে নারীরা সেভাবে উঠে আসছে না’ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নারীদের সচিব করলে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর দিতে হবে বা কমিশনে রাখতে হবে, তা না করে মিনিস্ট্রিতে দেয়া যেতে পারে। সরকারের কাছে এ দাবি আমাদের আছে। নীতিনির্ধারণী লেভেলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব আরও বেশি চাই।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনে বর্তমানে সচিব ৭৫ জন। এর মধ্যে নারী সচিব নয়জন। এ হার ১২ শতাংশ। অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৫১০ জন, এর মধ্যে নারী ৮৩ জন। হার ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।

৬৩৫ জন যুগ্ম-সচিবের মধ্যে নারী ৮১ জন। হার ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মোট উপসচিবের সংখ্যা এক হাজার ৬৯৪ জন। নারী ৩৪৯ জন। এক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর হার ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

সিনিয়র সহকারী সচিব পদে মোট নারী ৪৫৪ জন। প্রশাসনে মোট সিনিয়র সহকারী সচিব রয়েছেন এক হাজার ৫৪৮ জন। এক্ষেত্রে হার ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। সহকারী সচিব মোট এক হাজার ৫২৭ জন, এর মধ্যে নারী ৪৭২ জন। হার ৩০ দশমিক ৯১ শতাংশ।

top11.jpg

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কর্মরত ক্যাডারভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৮টি ক্যাডারে মোট মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৮৩৫টি। এর মধ্যে পুরুষ কর্মকর্তার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৭৮ এবং নারী আট হাজার ১৬২ জন। নারীর হার ১৭ শতাংশ।

নারী কর্মকর্তাদের হার সবচেয়ে বেশি প্রশাসন ক্যাডারে, ২১ শতাংশ। সবচেয়ে কম বাণিজ্য ক্যাডারে। এখানে নারীর হার মাত্র ১ শতাংশ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৩ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মোট নারীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের মতো।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে মেয়েরা এখন প্রশাসনে অনেক এগিয়ে। সচিব, ডিসি, ইউএনও- সব পদেই তারা রয়েছেন। প্রশাসনে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য যা যা করা দরকার আমরা করছি। যারা চাকরিতে আছেন, তারা ভালো করছেন। বিসিএস ছাড়া অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায়ও মেয়েরা ভালো করছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুপাতে মেয়েরা চাকরিতে আসছেন।’

তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ যে ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ডাক্তার নেয়া হলো, এর ৬০ শতাংশই নারী। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় যারা পাস করেছেন তাদের ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী।’

‘জনসংখ্যায় নারী হয়তো অর্ধেক, কিন্তু সচিবদের অর্ধেক নারী নন। কিন্তু প্রশাসনে নারীদের অবস্থান আগের চেয়ে ভালো, তারা নীতিনির্ধারণী পদে কাজ করছেন। এ পদ বলতে যুগ্ম-সচিব থেকে এর ওপরের পদগুলোকে বোঝায়। যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব পদে তো বিপুলসংখ্যক নারী রয়েছেন’- বলেন জনপ্রশাসন সচিব।

সচিব আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমরা পুরুষ কর্মকর্তাদের চেয়ে নারী কর্মকর্তাদের ওপর বেশি নির্ভর করি। কারণ তারা সৎ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার সপক্ষে অনেক নির্মল। নারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত কম হয়। কাজেকর্মে তারা বেশি সিনসিয়ার।’

আরএমএম/এমএআর/এমএস