ভারত নয়, ক্ষমতায় টিকে থাকাই বিজেপির চিন্তা

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৪৯ পিএম, ১১ মার্চ ২০২০

তানজিম উদ্দিন খান। বিশিষ্ট কূটনীতিক বিশ্লেষক। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। যুক্তরাষ্ট্র-তালেবানের মধ্যকার চুক্তি এবং দিল্লি সহিংসতা নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। চুক্তির মধ্য দিয়ে তালেবান শক্তিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হলো, যা আফগানিস্তানে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

দিল্লি সহিংসতা প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবেই ভারতের সমাজকে হিন্দুত্ববাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : ভারত প্রসঙ্গ। দিল্লির দাঙ্গায় লাশের গন্ধ মিলছে এখনও। কী বলবেন ভারত পরিস্থিতি নিয়ে?

তানজিম উদ্দিন খান : দিল্লির ঘটনাকে কোনোভাবেই দাঙ্গা বলা যায় না। দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদীরা পরিকল্পিতভাবে একতরফা হামলা চালিয়েছে।

bjp

ভারতে যা ঘটছে, সেজন্য সমাজে একধরনের প্রস্তুতি ছিল। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া হিন্দুত্ববাদের জন্য সমাজ প্রস্তুত হয়েছে বলেই বিজেপির মতো দল ক্ষমতায় রয়েছে।

জাগো নিউজ : কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মনিরপেক্ষরাই বেশি সময় ভারত শাসন করেছে…

তানজিম উদ্দিন খান : কংগ্রেস অধিক সময় ভারতে ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয়ভাবে, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ব্রাহ্মণরাই কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিচু বর্ণের হিন্দু বা মুসলমানরা কংগ্রেসে ঠিক গুরুত্ব পায়নি।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থেকেও তা-ই করেছে। বামপন্থীদের নেতৃত্বেও ব্রাহ্মণ্যবাদের চর্চা হয়েছে তীব্রভাবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে ধারণ করতে ধর্ম দূরে রাখা হয়নি। উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করেছে। এভাবেই সমাজ তৈরি করা হয়েছে, যা ঘটেছে দিল্লিতে। আমি অবাক হইনি।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। পাকিস্তান ও বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নিয়ে ভারতের মূলধারার রাজনীতিবিদরা মুসলিম পরিচয়টি সামনে এনেছেন, তাদের শত্রু বানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা চর্চা শক্তিশালী হয়েছে। আশির দশক থেকে এটি তীব্র হয়েছে। এ সময় কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। এ চর্চার মধ্য দিয়েই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে।

bjp

জাগো নিউজ : তার মানে বিজেপিনীতির বিরোধিতা করার ক্ষমতা কংগ্রেস রাখে না…

তানজিম উদ্দিন খান : এনআরসি বা সিএএ নিয়ে কংগ্রেস কোনো সংগঠিত প্রতিবাদ করেনি। বামপন্থীরাও আন্দোলন গড়ে তুলতে শক্তি ব্যয় করেনি। পশ্চিমবঙ্গে যা হয়েছে, তা তৃণমূলের একেবারে স্বার্থের রাজনীতি। এখন এটিই ভারতের সামাজিক চিত্র।

আপনি টেলিভিশনে ভারতের সিরিয়ালগুলো দেখেন। দেখবেন, সেখানে মুসলিম চরিত্রগুলো নিচু মানের বা অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়। তাদের সিরিয়ালে বা সিনেমায় ইসলাম ও সন্ত্রাসকে সমর্থক দেখানো হয়। এ ইসলামোফোবিয়া পুঁজি করেই খুব শক্তিশালী হয়েছে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি।

ভারতকে আপাতভাবে যতটা প্রগতিশীল বলে প্রচার করা হয়, সমাজের ভেতরে আসলে তা নেই। রাজনীতিতেও নেই। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০১১ সালে ভারতের হায়দরাবাদে একটি কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। হায়দরাবাদ শহর থেকে ৭৭ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে কথা বলছিলাম। ৭০-৭৫ বয়সী এক কৃষক আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি ব্রাহ্মণ?’ বললাম, ‘ব্রাহ্মণ হবো কেন? চামড়া কাটলে তোমারও যে রক্ত, আমারও সেই রক্ত’। এ কথা শুনেই সে আমার পায়ে পড়ে সালাম করতে চাইল। আমি তাকে সামলিয়ে নিলাম। তার মানে, ভারতে এমন কথা শুনে একজন মানুষ অবাক হতে পারেন। এটিই ভারতের সামাজিক বাস্তবতা।

জাগো নিউজ : কিন্তু এর বাইরেও আলোর গল্প আছে। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে…

তানজিম উদ্দিন খান : এ গল্পের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে এ শ্রেণি ক্রমশই সংকোচিত হয়ে পড়ছে। এ অসাম্প্রদায়িক মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে কোনো দলই ভূমিকা রাখছে না।

এই অসাম্প্রদায়িক শ্রেণির মানুষকে মানুষের পাশে নিয়ে যেতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গের খোদ বামপন্থীরাও। তৃণমূল মানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদের রাজনীতি হয়েছে। এটিই আজ উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিকাশ ঘটিয়েছে।

bjp

জাগো নিউজ : দিল্লির সহিংসতা থেকে বিজেপি সরকার আসলে কী বার্তা দিল?

তানজিম উদ্দিন খান : এখানে বার্তা খুব পরিষ্কার। ভারত নিয়ে ভাবার চেয়ে ক্ষমতায় থাকাই বিজেপি বেশি চিন্তিত।

জাগো নিউজ : এমন সহিংসতা ঘটিয়ে ক্ষমতা পোক্ত করা যায় কি?

তানজিম উদ্দিন খান : হ্যাঁ, ভারতে এখন তা-ই হবে। ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা পরের কথা। কিন্তু বিজেপি জেনেবুঝেই এমন সহিংসতা ছড়াচ্ছে। তারা মনে করছে, এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ভোট আরও টানতে পারবে বিজেপি। সামনে নয়, ভারতের সমাজ পেছনের দিকে হাঁটছে।

জাগো নিউজ : এর পরের আঘাতটা বিজেপি কোথায় করতে পারে?

তানজিম উদ্দিন খান : দক্ষিণ ভারতের বিষয় আলাদা। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বামপন্থীরা ক্ষমতায়। মানবিক দিক দিয়েও কেরালা, তামিলনাড়ু অনেক বেশি অগ্রগামী। সেখানে বিজেপি এখনই খুব সুবিধা করে উঠতে পারবে না। কিন্তু উত্তর ভারতজুড়ে বিজেপি আরও শক্তিশালী হবে এবং তা সহিংসতার মধ্য দিয়েই। পশ্চিমবঙ্গেও সেই ঝুঁকি রয়েছে।

bjp

জাগো নিউজ : বিজেপি যে সংকট তৈরি করছে, তা তো রাষ্ট্র ভারতেরও…

তানজিম উদ্দিন খান : ভারতের রাজনীতি এখন কর্পোরেটদের হাতে। মোদি ক্ষমতায় এসেছেন তাদের আশীর্বাদ হয়েই। যে কারণে বিজেপি বার বার ক্ষমতায় আসলেও তারা নিপীড়িত মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। ভারতে হাজার হাজার কৃষক ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে আত্মহত্যা করছেন। সমাজ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বলেই বিজেপি ধর্ম ব্যবহার করছে। কারণ ধর্ম হচ্ছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে। ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র উপাদান হচ্ছে ধর্ম। এ চিত্র কিন্তু শুধু ভারতের নয়, বিশ্বব্যাপী। রাষ্ট্র যত বেশি বাজারমুখী ও ব্যবসায়ীবান্ধব হচ্ছে, তত বেশি ধর্মের ওপর নির্ভর করছে।

জাগো নিউজ : ভারতের এ রাজনীতির শেষ কোথায়?

তানজিম উদ্দিন খান : সাম্প্রদায়িক এ রাজনীতি ভারতকে আরও অস্থির করে তুলবে। অর্থনীতিতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেও এ রাজনীতি দেশটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শাইনিং ইন্ডিয়া এখন ডার্ক ইন্ডিয়াতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ : নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটতে পারে কি-না?

তানজিম উদ্দিন খান : আশার আলো এই যে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এসব ঘটনা নিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নতুন এক ধারার বিকাশ ঘটে চলেছে। শাহিনবাগসহ ভারতের অন্যান্য অংশে যে সামাজিক আন্দোলন তা সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এ রাজনৈতিক রূপ নেয়ার ওপরই নির্ভর করবে ভারতের ভবিষ্যৎ।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম