কাজ একই, তবু সুন্দরবন রক্ষায় ভিন্ন নামে একাধিক প্রকল্প

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ এএম, ১২ মার্চ ২০২০

ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা সহায়তা’ প্রকল্প। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে ‘সুন্দরবনে পরিবেশবান্ধব (ইকোট্যুরিজম) সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ নামে আরেকটি প্রকল্পের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। আবার ‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ নামের একটি প্রকল্পেরও দ্বিতীয় পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ তিন প্রকল্পেই সুন্দরবনে ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের জন্য টাকা বরাদ্দ নেয়া হয়েছে বা চাওয়া হয়েছে।

ওই তিন প্রকল্পের নাম ভিন্ন হলেও কাজের ক্ষেত্র প্রায় এক। সংরক্ষিত সুন্দরবন এলাকায় একই কাজ করার জন্য আলাদা আলাদা অর্থ বরাদ্দ নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন পরিসরে।

তিন প্রকল্পে একই ধরনের কাজের মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, সচেতনতা কার্যক্রম, আবাসিক ভবন মেরামত, অফিস ভবন মেরামত, বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশলীতা হ্রাস ইত্যাদি।

‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পিইসি সভার কার্যপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। কার্যপত্র অনুসারে, ‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ প্রকল্পটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বন অধিদফতরের বাস্তবায়নের কথা। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ৪৫৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে।

দ্বৈততার বিস্তর চিত্র

সূত্র জানায়, ‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আসার পর দ্বৈততা নিয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। এমনকি সুন্দরবন এলাকায় গত ১৫ বছরে কয়টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন অধিদফতরের কাছে জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একইসঙ্গে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় কী কী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল এবং কী সুফল পাওয়া গেছে, তা-ও পিইসি সভাকে অবহিত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে কমিশন।

সূত্র আরও জানায়, ‘সুন্দরবনে পরিবেশবান্ধব (ইকোট্যুরিজম) সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পিইসি সভায় সুন্দরবনের জন্য সাতটি জলযান কেনার সুপারিশ করা হয়। ‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ প্রকল্পেও জলযান কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেজন্য দ্বিতীয়োক্ত প্রকল্প থেকে জলযান বাদ দিয়ে পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের প্রস্তাব করে পরিকল্পনা কমিশন।

আরেকটি দ্বৈততার প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ইকোলজিক্যাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা প্রণয়ন ও ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান আগামী ১০ বছরের জন্য হালনাগাদকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ‘স্ট্র্যাটেজিক এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট অব সাউথ-ওয়েস্ট রিজিওন অব বাংলাদেশ ফর কনসার্ভিং আউটস্ট্যান্ডিং ইউনিভার্সাল ভ্যালু অব দ্য সুন্দরবন’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ওই অঞ্চলের জন্য একটি এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (ইএমপি) প্রস্তুত করা হবে। আলোচ্য প্রকল্পে প্রস্তাবিত ইকোলজিক্যাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা প্রণয়ন/ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান হালনাগাদকরণ ওই প্রকল্পের সাথে ওভারল্যাপিং করবে কি-না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য প্রকৃতি ও পর্যটননির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। ইতোপূর্বে সম্পাদিত প্রকল্পসমূহের মাধ্যমে কতগুলো পরিবারের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, তার তথ্য বা ডাটাবেজ সংরক্ষিত আছে কি-না এবং বিকল্প কর্মসংস্থান করা সেসব পরিবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানে নিয়োজিত আছে কি-না, তাও নিশ্চিত হওয়া দরকার বলে জানিয়েছে কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পে নির্মাণ ও পূর্ত খাতে খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্পের ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে মূলত সুন্দরবনে অফিস ভবন নির্মাণসহ ইকোট্যুরিজম বা পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণ কার্যক্রমের প্রস্তাব রয়েছে। এত অধিক পরিমাণ নির্মাণকাজের যৌক্তিকতা সম্পর্কে পিইসি সভাকে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে অবহিত করতে হবে। এছাড়া ইতোপূর্বে কয়েকটি প্রকল্পে ইকোট্যুরিজমের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

প্রকল্পের কাজে দ্বৈততার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. জাকির হোসেন আকন্দ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দু-বছর আগে যে প্রকল্পটা এসেছিল, সেটা একসময় তারা নিজেরাই উইথড্র (স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার) করে নিয়ে গেছে। মানে, ওখানে অন্য প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছিল। ওই প্রকল্পের কাজ এই প্রকল্পে নেয়া হয়েছিল। ডুপ্লিকেশন হবে বিধায় তারা এটা নিয়ে গেছে। এখন তারা এটা রিভাইস (পুনরায়) করে আবার পাঠিয়েছে। আমি এখনও দেখি নাই এর মধ্যে কী আছে।’

তবে দ্বিতীয় পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, দ্বৈততার এ সমস্যা রয়েই গেছে।

জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, ‘আমার কাছে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পেপার্স, ডকুমেন্ট সব আসবে, আমি দেখতে পারব। আপনার বলার দরকার হবে না। সেখানে যদি ভুলভ্রান্তি থাকে, সেগুলো আমি সভায় দেখব। আর সভায় তো আমার একার চোখ দেখে না, আরও ৮-১০ জন আছে, সবাই মিলেই দেখি।’

তিনি বলেন, ‘গত যে সাইক্লোন গেল, তাতে সুন্দরবন কী করেছে, তা সবাই জানে। সুতরাং আমাদের এখানে বিনিয়োগ তো রাখতেই হবে। আমাদের যেটা করা দরকার, বনটাকে সুরক্ষার জন্য যা কিছু দরকার, তা-ই করা।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বন অধিদফতরের উপ-প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যেটা দিয়েছিলাম, সেটা আমাদের দৃষ্টিতে ঠিকই দিয়েছিলাম। কারণ আমরা দিয়েছিলাম মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাইয়ের পর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন লেখলেই কি সবকিছু ভুলেভরা হয়ে যাবে?’

সূত্র জানায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে ২০১৭ সালে পাঠায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদফতর। প্রকল্পটির প্রথম প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার পরই নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এরপর প্রকল্পটি ফিরে যায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে। গত বছরের শেষের দিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের হাত থেকে দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করে সুন্দরবন। এ অবস্থায় দুই বছর পর ফের সেই প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে তারা। তবে এখনও ওভারল্যাপিংসহ নানা অসঙ্গতি রয়ে গেছে প্রকল্পে।

পিডি/এইচএ/এমএআর/এমকেএইচ