হালদার ডিম নিয়ে ‘রেকর্ডবাজি’, জেলেরা বলছেন ভিন্ন কথা

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৬:৫৫ পিএম, ২৪ মে ২০২০
শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহে নেমেছিল কয়েকশ জেলে। সারি সারি নৌকায় ডিম সংগ্রহের নৈসর্গিক এ ছবি আবারও প্রমাণ করেছে হালদার শ্রেষ্ঠত্ব

দেশের একমাত্র কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীতে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউশ মা–মাছ পুরোদমে ডিম ছাড়তে শুরু করে। বিকেল ৩টার কিছু পরই চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, গত ১৪ বছরের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ ডিম সংগ্রহ হয়েছে। যদিও সেদিন এর পরও প্রায় আরও তিন ঘণ্টা ধরে নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করেন জেলেরা।

গত শুক্রবার বিকেলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী স্বাক্ষরিত সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডিম পাওয়া গেছে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি। ২৮০টি নৌকা নিয়ে ৬১৬ সংগ্রহকারী এ ডিম সংগ্রহ করেন। যেখানে গত বছর ডিম সংগ্রহ হয়েছিল মাত্র সাত হাজার ৮০০ কেজি।’

বছরের ব্যবধানে হঠাৎ কোন জাদুতে হালদা নদীতে তিনগুণেরও বেশি ডিম মিলল— সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে জাগো নিউজ। সেই খোঁজে অনেকটা কেঁচো খুঁড়তে সাপ দেখতে পাওয়ার মতোই চমকে দেয়া তথ্য আসে এ প্রতিবেদকের হাতে।

haor12.jpg

শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহে নেমেছিল কয়েকশ জেলে। সারি সারি নৌকায় ডিম সংগ্রহের নৈসর্গিক এ ছবি আবারও প্রমাণ করে হালদার শ্রেষ্ঠত্ব

শুক্রবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিচার্স ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিফতর এবং ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) যৌথভাবে হালদা থেকে প্রাপ্ত ডিমের যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছে তার সঙ্গে বিস্তার ফাঁরাক মাঠের তথ্যের। ডিম আহরণকারী জেলেরাও বলছেন ভিন্ন কথা। আয়নাবাজির আয়নাতে যেমন সবকিছু উল্টো উল্টো দেখায় তেমনি এবার হালদার ডিমের পরিমাণ নির্ধারণে সোজা হিসাব উল্টে দিয়ে ঘটানো হয়েছে ‘রেকর্ডবাজি’!

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার হালদা নদীতে ৬১৬ জন সংগ্রহকারী ২৮০টি নৌকা নিয়ে এ ডিম সংগ্রহ করেন। ডিমের পরিমাণ ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি। অংকের হিসাবে এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি নৌকাকে গড়ে সংগ্রহ করতে হয়েছে ৯১ দশমিক ২ শতাংশ কেজি ডিম।

অথচ মাঠ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহকারী জেলেরা গড়ে ৫ থেকে ৬ বালতির (এক বালতি = ১০ কেজি ডিম) বেশি ডিম সংগ্রহ করতে পারেননি পুরোদিনে। এ অবস্থায় বিকেল ৩টার মধ্যেই জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ১৪ বছরের রেকর্ড ভাঙা ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিমের হিসাব মিলছে না কোনোভাবেই।

haor12.jpg

শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহে নেমেছিল কয়েকশ জেলে। সারি সারি নৌকায় ডিম সংগ্রহের নৈসর্গিক এ ছবি আবারও প্রমাণ করেছে হালদার শ্রেষ্ঠত্ব

শুক্রবার হালদা নদীতে ডিম সংগ্রহ করেছেন এমন ১৪০টি নৌকার ডিম সংগ্রহের তথ্য এসেছে জাগো নিউজের হাতে। এর মধ্যে হাটহাজারী এলাকার শাহ মাদারি হ্যাচারি, মাছুয়া ঘোনা হ্যাচারি ও মদুনাঘাট প্রাকৃতিক রেনু উৎপাদন কেন্দ্রের ৬৬ জন জেলে তাদের সহযোগীদের নিয়ে ১৪০টি নৌকায় দিনভর ডিম সংগ্রহ করেছেন। তাদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই ১৪০টি নৌকা মোট সংগ্রহ করেছে পাঁচ হাজার ২২০ কেজি ডিম।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, জেলা মৎস্য বিভাগের দেয়া ২৮০টি নৌকার অর্ধেক অর্থাৎ ১৪০টি নৌকা যদি সারাদিনে পাঁচ হাজার ২২০ কেজি ডিম সংগ্রহ করে, বাকি ১৪০টি নৌকা ২০ হাজার ৩১৬ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছে— এমন তথ্য অনেকটাই শুভঙ্করের ফাঁকি।

পুরো বিষয়টি নিখুঁতভাবে জানার জন্য একমাত্র হ্যাচারি থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে চায়নি জাগো নিউজ। সরাসরি কথা বলেছে ডিম সংগ্রহকারী জেলে এবং শুক্রবার সরেজমিন হালদায় পরিদর্শন করা বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গেও।

haor12.jpg

শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহে নেমেছিল কয়েকশ জেলে। সারি সারি নৌকায় ডিম সংগ্রহের নৈসর্গিক এ ছবি আবারও প্রমাণ করেছে হালদার শ্রেষ্ঠত্ব

হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা এলাকার বাবুল জলদাশ হালদায় ডিম সংগ্রহ করছেন গত ৪০ বছর ধরে। তিনি জানান, শুক্রবার মোটামুটি উল্লেখ করার মতো ডিম সংগ্রহ করেছেন তিনি। তবে মোট হিসাবে যা বলা হচ্ছে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমি পাঁচটি নৌকায় ১০ জন লোক খাটিয়ে সারাদিনে ২০ বালতি ডিম সংগ্রহ করেছি। আমার দেখা এটাই সর্বোচ্চ। আজিমের ঘাট থেকে পোড়াকোয়াইল্লা এলাকা পর্যন্ত প্রচুর ডিম পাওয়া গেছে।

তবে উত্তর মাদার্শা এলাকার জেলে সাহাবউদ্দিন বলেন, ‘তিনটি নৌকায় সাতজনের পরিশ্রমে মোট আট বালতি অর্থাৎ ৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন।’ এ সময় তিনি চ্যালেঞ্চ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘কেউ যদি বলেন, তিনি ২০ বালতি ডিম পেয়েছেন, আমি তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ ওইদিন চলে গেছে আরও ৪০ বছর আগে, আমাদের বাপ-দাদার সময়।’

haor12.jpg

শুক্রবার হালদায় ডিম সংগ্রহে নেমেছিল কয়েকশ জেলে। সারি সারি নৌকায় ডিম সংগ্রহের নৈসর্গিক এ ছবি আবারও প্রমাণ করেছে হালদার শ্রেষ্ঠত্ব

আঙ্কুরিঘোনার জেলে সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘তিনি দুই নৌকা ব্যবহার করে পাঁচ বালতি অর্থাৎ ৫০ কেজি ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন।’

শাহ মাদারী হ্যাচারিতে ডিম দিয়েছেন রামদাশহাটের ইলিয়াস। এবার রেকর্ড ডিমপ্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সত্যটা বললে অনেকে নারাজ হবেন। এসব কথা কীভাবে বলি? সত্য বলার লোক কোথায়? আমি দুটি নৌকা নিয়ে ৬০ কেজির মতো ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছি। এছাড়া আমাদের হ্যাচারির ৪০টি নৌকায় ৮০ জন মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে ১২০০ কেজির কাছাকাছি (প্রকৃত সংখ্যায় ১১৩০ কেজি) ডিম সংগ্রহ করেছেন।’

তবে জেলেদের এসব পরিসংখ্যান মানতে রাজি নন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী। তার দাবি, মোট হিসাবে ডিম সংগ্রহের সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ নদীতে মাছ সংগ্রহকারী ২৮০ নৌকার হিসাব দেয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে নৌকার উপস্থিতি ছিল ৩০০-এর বেশি। যদিও জেলা মৎস্য বিভাগ নিজেদের পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন মাত্র ৬০টি নৌকার।

haor12.jpg

হালদাপাড়ের সরকারি হ্যাচারিগুলোতে কার্প জাতীয় মাছের ডিম ফুটিয়ে রেনু উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ চলছে

ফারহানা লাভলী বলেন, আমরা সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত যৌথভাবে তিনটি দলে ভাগ হয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যে জেলা মৎস্য অফিস ৬০টি নৌকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। অনেকের কাছে বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, অনেক জেলে এ সময় বিরক্ত হন। পাওয়া তথ্য থেকে আমরা কম-ই বলেছি।’

জেলেদের দেয়া তথ্য এ সময় জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন?’

শুক্রবার হালদা নদীতে ডিম সংগ্রহের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে বেড়িয়েছেন বেসরকারি টেলিভিশন সময় টিভির স্টাফ রিপোর্টার পার্থ প্রতিম বিশ্বাস। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য একেবারে সকাল থেকেই হালদায় অবস্থান করছিলাম। বেলা ১২টা পর্যন্ত নদীতে ডিম পাওয়ার পরিমাণ ছিল কম। দুপুরের দিকে পরিমাণ বাড়তে থাকে। সে সময় জেলেরা ভালোই ডিম পান। তবে বিকেলে ডিম সংগ্রহের যে হিসাব দেয়া হলো সেটা কেমন যেন মেলে না। এ হিসাবটা বড়জোর ১৫ হাজার কেজি হতে পারে। এছাড়া তাদের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল পুরোটাই মৌখিক। কোনো নৌকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল কত বালতি? জবাবে কেউ পাঁচ আবার কেউ সাত বালতি বলছিল।’

সাংবাদিক পার্থ প্রতিমের দেয়া তথ্যের আরও জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যায় হালদা গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাস থেকে। শুক্রবার (২২ মে) দুপুর ১টা ২২ মিনিটে দেয়া সেই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘বহু প্রতীক্ষার পর ২১ মে ২০২০ দিবাগত রাত ২টার দিকে আজিমের ঘাট এলাকায় মা মাছ হালদায় ডিম ছেড়েছে। সকাল ৯টা পর্যন্ত ডিম সংগ্রহকারীরা নমুনার চেয়ে কিছু বেশি পরিমাণ ডিম ধরতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে। ভাটার শেষে জোয়ার শুরু হয়, মাঝ জোয়ারেও ডিম সংগ্রহ হয়। ২৫০-৩০০ মতো নৌকা ডিম সংগ্রহে থাকলেও সব এলাকার সব নৌকা ভালো পরিমাণে ডিম পায়নি। তবে এখনও সময় আছে। বেলা শেষে বোঝা যাবে ডিমের প্রাপ্তির পরিমাণ।’

haor12.jpg

হালদাপাড়ের সরকারি হ্যাচারিগুলোতে কার্প জাতীয় মাছের ডিম ফুটিয়ে রেনু উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ চলছে

বিষয়টি সামনে এনে নিজেদের দেয়া তথ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তথ্য সংগ্রহকারীর দলের সঙ্গে থাকা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) কর্মকর্তা রাশেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে কী বলব, বুঝতে পারছি না। আইডিএফ ৮০টি নৌকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। আমাদের তথ্যের সঙ্গে হালদা রিভার রিচার্স ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদফতরের তথ্য মিলে যাওয়ায় আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই তথ্য দিয়েছি।’

তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়ার দাবি, তার নিজস্ব উদ্ভাবিত ম্যাথডলজি’ ১৪ বছরের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম সংগ্রহের বিষয়টিকে সমর্থন করে। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য জেলেদের সঙ্গে কথা বলেই সংগ্রহ করেছেন। এ সংক্রান্ত সকল ডাটা তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

উল্লেখ্য, মাত্র দুই বছর আগেও মৎস্য বিভাগের তথ্যের সঙ্গে হালদায় ডিম সংগ্রহ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা যেত। বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনাও হতো নিয়ম মাফিক।

haor12.jpg

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার পাঠানো সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তি, যেখানে শুক্রবার হালদা নদী থেকে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম পাওয়ার দাবি করা হয়

হঠাৎ কেন তিনটি প্রতিষ্ঠান একই ধরনের তথ্য পেল, জেলেরা-ইবা কেন ভিন্ন কথা বলছে— এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল এই হালদা গবেষকের কাছে। জবাবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘হ্যাঁ একসময় এ নিয়ে মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের তথ্যের ফাঁরাক থাকত। ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর ডিম সংগ্রহের পর আমি আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে হিসাব করে একটি তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করতাম। অন্যদিকে মৎস্য বিভাগ নিজেরাই একটি হিসাব করত ডিমের, যা কোথাও প্রকাশ হতো না। আমাদের প্রাপ্ত তথ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য থাকত, এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তর্কও হতো।’

তিনি বলেন, ‘মৎস্য কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল ত্রুটিযুক্ত। এমনকি ২০১৬ সালে হালদায় মা মাছ ডিম না ছাড়লেও ওই বছর মৎস্য বিভাগ তাদের নথিতে ২০১৫ ও ২০১৭ সালের চাইতে বেশি ডিম সংগ্রহের তথ্য লিপিবদ্ধ করে। পরে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এ নিয়ে কথা ওঠার পর তারা আমার পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং গত বছর একযোগে সার্ভে করার সিদ্ধান্ত নেয়।’

এই হালদা গবেষক বলেন, ‘তিনটা দলের ১৫ জন তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং তথ্য সমন্বয় করে এই রেজুলেশনে সাইন করেছি আমরা। নিশ্চিত হয়েই এমনটা করা হয়েছে।’

তবে অধ্যাপক কিবরিয়ার নিজের দেয়া তথ্য সামনে এনে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালে ডিমপ্রাপ্তির শূন্য হিসাবকে সর্বোচ্চ দেখাতে পারে, আজ সেই প্রতিষ্ঠানের দেয়া ১৪ বছরের রেকর্ড ভাঙা হিসাব কেন মেনে নেবে জাতি? এছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠান বেলা ৩টা পর্যন্ত যে তথ্য সংগ্রহ করল, সেসব জটিল তথ্য আধাঘণ্টার ব্যবধানে সমন্বয় করে গণ্যমাধ্যমে কীভাবে পাঠান সম্ভব হলো?

haor12.jpg

এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক কিবরিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমনটা কেন হচ্ছে জানি না।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী, নিভৃতচারী এক গবেষক। ১৯৭৭ সাল থেকে হালদা নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্র হালদায় মা মাছের ডিম ছাড়া নিয়ে তার পূর্বাভাসই প্রতি বছর সত্য প্রমাণিত হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত ৪ এপ্রিল একটি দৈনিকে লেখা কলামে তিনি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এপ্রিল ও মে মাসের মোট চারটি সময়ে ডিম ছাড়ার সম্ভাব্য পূর্বাভাস দেন। এর মধ্যে মে মাসের ২১-২৬ তারিখের মধ্যে ডিম ছাড়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন সেই পূর্বাভাস সঠিকভাবে মিলে গেছে। অর্থাৎ ২১ মে দিবাগত রাতে ডিম ছেড়েছে এবং ২২ মে দিনেও ডিম ধরা চলছে। তার সুপারিশের ভিত্তিতেই ২০০৭ সালে হালদাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছিল সরকার।

হালদায় ডিম পাওয়া নিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরিসংখ্যান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মৎস্য বিভাগ বলছে হালদায় ডিম সংগ্রহ করেছেন ৬১৬ জন জেলে। ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম পেতে হলে প্রতি নৌকাকে ডিম সংগ্রহ করতে হবে ৯১ দশমিক ১২ শতাংশ বা ৯ বালতি করে। কিন্তু প্রতি নৌকায় যদি আমরা দুজন করে জেলে ধরে নেই তাহলে নৌকা-পিছু সংগৃহীত ডিমের পরিমাণ হতে হবে ৪১ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’

নিজের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, শুক্রবারের যে হিসাব আমার হাতে, সে অনুযায়ী ওইদিন ২৫০টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে। এছাড়া নদীতে থাকা সব নৌকা ডিম সংগ্রহ করে না। নৌকায় থাকা সব মানুষও ডিম সংগ্রহ করেন না। পুরো চিত্রটা বিশ্লেষণ করে ১২ থেকে ১৫ হাজারের বেশি ডিমপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই।

হালদার ডিম নিয়ে ‘রেকর্ডবাজি’

হালদার দূষণ ঠেকাতে এশিয়ান পেপার মিল- হাটহাজারী পিকিং পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করা, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, হালদার উজানে মানিকছড়ি পাহাড়ে তামাকচাষ বন্ধ করা, বছরব্যাপী চোরাশিকারী ও বালু উত্তোলনকারীদের তৎপরতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া এবং কোভিড-১৯ এর কারণে লকডাউনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকায় হালদায় এ বছর অপেক্ষাকৃত বেশি ডিম পাওয়ার ইঙ্গিত শুরু থেকেই পাওয়া গিয়েছিল।

haor12.jpg

তবে প্রশ্ন উঠছে, আধাঘণ্টার হিসাবে তিনটি সংস্থার সম্মিলিত রিপোর্টে ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিমপ্রাপ্তির রেকর্ডের দাবি নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তড়িঘড়ি করে মৎস্য বিভাগের দেয়া ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিমপ্রাপ্তির হিসাব মূলত ক্রেডিট ছিনতাইয়ের কৌশল। সারাবছর জেলা ও হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা প্রশাসন হালদায় মা মাছ রক্ষায় অভিযানসহ নানা তৎপরতা চালালেও শুক্রবার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী এ বিষয়ে জেলা, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত না করেই গণমাধ্যম, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ বিভাগে ‘১৪ বছরের রেকর্ড ভাঙা হিসাব’ পাঠিয়ে দেন।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে হাটহাজারী থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেদিন বিকেলেই নিজের ফেসবুক ওয়ালে লেখেন, ‘হালদায় গত এক বছরের সব কাজের সফলতা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলি মহোদয়ের। উনি চার মাস আগে যোগদান করেছেন। উনি উনার সফলতার গল্পের অনুলিপি জেলা কিংবা উপজেলা প্রশাসনকে দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি, কারণ জেলা আর উপজেলা প্রশাসন শুধু বছরের ৩৬৪ দিন কাজ করবেন আর কিছু তাদের জানার দরকার নাই। এমনকি হালদা নিয়ে দুটা কমিটির সভাপতি মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়কেও এই সফলতার কপি দেন নাই। অভিনন্দন তাকে।’

হালদাপাড়ের ছেলে ও চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর ফটো করেসপন্ডেন্ট আমিন মুন্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতি বছরই হালদায় পাওয়া ডিমের হিসাব নিয়ে মতপার্থক্য থাকে। আমরা চোখে যা দেখি আর পরে যে হিসাব হয়, সেই পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিভিন্ন পদ্ধতির কথা সামনে আনা হয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯ সালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হালদায় ১০ হাজার কেজি ডিমপ্রাপ্তির কথা বলা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। সেবার তার দাবি ছিল, হালদায় সাত হাজার কেজির কিছু বেশি ডিম মিলেছে। তবে এবার হালদা রিভার রিচার্স ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদফতর ও ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) যৌথভাবে তথ্য প্রকাশের ক্রেডিট নিতে গিয়ে তড়িঘড়ি করে এই ‘রেকর্ডবাজি’ ঘটিয়েছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়ার কাছে জাগো নিউজের প্রশ্ন ছিল, প্রতি বছর জেলেরা ডিম পাওয়ার পর রাতে বা পরের দিন সুচিন্তিতভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হতো, কিন্তু এবার জেলেরা নদীতে থাকতেই কেন ফলাফল ঘোষণা করা হলো?

জবাবে মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘তাড়াহুড়া নয়, আমরা বেলা ৩টায় মাঠের কাজ শেষ করে বিকেল ৪টায় এ তথ্য প্রকাশ করেছি।’

haor12.jpg

কিন্তু এ সময় জাগো নিউজের পক্ষ থেকে ৪টা নয়, বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যেই মৎস্য বিভাগ প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছে বলে জানানো হলে, সঙ্গে সঙ্গে মত পাল্টে এই অধ্যাপক বলেন ‘হ্যাঁ বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। আসলে সবাই হয়তো তথ্য জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করছিল, তাই দ্রুত তা প্রকাশ করা হয়েছে।’

তবে তাড়াহুড়া করে জাতীয় এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। হালদা গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, ‘হালদা থেকে পাওয়া ডিমের হিসাব কিন্তু আমাদের সম্পদপ্রাপ্তির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। কারণ সংগৃহীত সব ডিম নিষিক্ত নয়। ফাঙাসের আক্রমণে অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ডিমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। জেলেদের হিসাবে এক বালতি ডিম সংগ্রহ করা গেলে হিসাব করা হয় ১০ কেজি ডিমের। আর ৪০ কেজি ডিম নিষিক্ত করা গেলে রেনু মেলে এক কেজির। তাই রেনুর হিসাবটাই এখানে প্রধান। কিন্তু একটি অসাধু গোষ্ঠী পুরো বিষয়টাকে অংকে বেশি দেখানোর জন্য কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

আসলেই কি এবার ১৪ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে

হালদা থেকে গত বছর ১০ হাজার ২০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল (অনেকের মতে ৭ হাজার)। এর আগে ২০১৮ সালে ২২ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৭ সালে ১ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭৩৫ (নমুনা ডিম) কেজি, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮০০ কেজি এবং ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়।

এ বছর মৎস্য বিভাগ ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিমপ্রাপ্তির হিসাব দিয়ে গত ১৪ বছরের রেকর্ড ভঙের দাবি করছে। কিন্তু এ নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী। তিনি বলেন, একে তো ২৫ হাজারের বেশি ডিম পাওয়ার তথ্য সঠিক নয়। তার ওপর ১৪ বছরের রেকর্ডের যে দাবি করা হচ্ছে তাও ভুল।

তিনি বলেন, ‘এর আগে হালদা থেকে পাওয়া ডিম নয়, বরং একেবারে চূড়ান্তভাবে প্রাপ্ত রেনুর হিসাব প্রকাশ করা হতো। ২০১২ সালে হালদা থেকে পাওয়া ডিম হতে ১ হাজার ৫৬৮ কেজি রেনু উৎপাদন হয়েছিল। সে হিসাবে সেবার প্রাপ্ত ডিমের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৭২০ কেজি (১৫৬৮ গুণন ৪০)। এমন পরিসংখ্যান সামনে থাকার পরও ১৪ বছরের রেকর্ড ভঙের দাবি চালবাজি ছাড়া কিছু নয়।’

‘ভুল’ তথ্য পৌঁছাবে ভিন্ন বার্তা, ‘ঐতিহ্য’ হারাবে হালদা

হালদা নদীপাড়ের সন্তান ও দৈনিক আজাদীর ফটো করেসপন্ডেন্ট আমিন মুন্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি অসাধুচক্র হালদায় পাওয়া ডিমের প্রকৃত সংখ্যার চাইতে বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করে। মূলত গোষ্ঠীটি হালদার পোনার সঙ্গে স্থানীয় হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা মিশিয়ে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এমনটা করে থাকে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হালদার পোনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হালদার পোনার ঐতিহ্য সংকটে পড়ছে।’

জেলেরা বলছেন, এবার মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার ডিমপ্রাপ্তির যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে তাতে প্রতি কেজি পোনার দাম হওয়ার কথা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অত ডিম তো নেই, তাই দামও হবে বেশি। এ কারণে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ক্ষতির শিকার হতে পারেন।

আবু আজাদ/এমএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]