ভার্চুয়াল আদালতে ম্যানুয়াল কার্যক্রম

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ১৪ জুন ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ও আইন পেশার সবার সুরক্ষা নিশ্চিতে আদালত চলছে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে। বর্তমানে ভার্চুয়াল আদালতে চলছে জামিন শুনানি ও চেক ডিজঅনার মামলার ফাইলিং। তবে এই পদ্ধতিতে জামিন শুনানি করা গেলেও আবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া আগের মতো ম্যানুয়ালই থেকে গেছে।

জামিনের আবেদন করতে গেলে বেশকিছু বিষয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হচ্ছে। প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে পুরো পদ্ধতি আর ভার্চুয়াল থাকছে না। বিশেষ করে ওকালতনামা, বেইল বন্ড ও কোর্ট ফি সংগ্রহ করতে হচ্ছে আগের নিয়মেই। ঢাকার আদালতে আইনজীবী সমিতির নির্দিষ্ট বুথ থেকে সংগ্রহ করতে হয় ওকালতনামা ও বেইল বন্ড। তাই জামিন আবেদন করতে ওকালতনামা সংগ্রহ ও হাজত থেকে তা স্বাক্ষর করিয়ে আনতে আদালতে যেতেই হচ্ছে। আর নির্দিষ্ট কোর্ট ফি’র জন্য দ্বারস্থ হতে হচ্ছে নির্দিষ্ট কাউন্টারের।

ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা করে আইনজীবীরা যতটা না সন্তুষ্ট, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত আদালতের পেশকার পিয়নের দৌরাত্ম্যে। মামলা ফাইলিং করার পর অনেক সময় মামলার শুনানির জন্য তারিখ পাওয়া যায় না। অনেক আইনজীবী ভার্চুয়াল আদালত বোঝেন না। এতে আইনজীবীরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন।

এ বিষয় ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু জাগো নিউজকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে বর্তমানে ভার্চুয়াল আদালতে জামিন শুনানি হচ্ছে। এসময় ওকালতনামা ও বেইলবন্ড নেওয়ার জন্য আইনজীবীদের আদালতে হাজির হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাময়িক অসুবিধার জন্য আইনজীবীদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সাময়িক অসুবিধা হলেও অনেকে ভার্চুয়াল আদালতে উপকার পাচ্ছে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইকবাল হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালতে জামিন শুনানি হচ্ছে। এছাড়াও ই-মেইলের মাধ্যমে চেক ডিজনারের মামলার ফাইলিং হচ্ছে। ভার্চুয়াল আদালতে সাময়িক জামিন শুনানি হলেও অনেকে এর উপকার পাচ্ছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অফিস-আদালত ছুটি থাকায় স্বাভাবিক কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি না থাকায় ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা করে আইনজীবীরা যতটা না সন্তুষ্ট, তার চেয়ে বিরক্ত আদালতের পেশকার পিয়নের দৌরাত্ম্যে।

তিনি বলেন, প্রথমত ভার্চুয়াল আদালতে আবেদন করা যায় দু’টি উপায়- এক আমার আদালত অ্যাপ আর দুই ই-মেইলের মাধ্যমে। অ্যাপের মাধ্যমে করা হলে ট্র্যাকিং নম্বর নিয়ে দিন গুনতে হয় আর ই-মেইলে করা যায়। দুটো ক্ষেত্রেই আবেদন করার পর শুনানির তারিখ পেতে আদালতের দ্বার পর্যন্ত আইনজীবীকে যেতে হয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকার সিএমএম ও সিজেএম কোর্টে এই সমস্যা নেই। কিন্তু জেলা জজ ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ ধরনের ভোগান্তি আইনজীবীদের ভার্চুয়াল আদালতের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তুলছে। বিতর্কিত করে ফেলা হচ্ছে। যে কারণে আইনজীবীরা আদালত খুলে দেওয়ার পক্ষে জোরালো দাবি তুলছেন। যদিও আদালত খুলে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, কীভাবে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা আদালতে যাওয়া-আসা করবেন! তার কোনো প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা নেই।

সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যবিধির কথা বলেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপর সমিতির সদস্যদের জন্য সমিতি’র কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। এ বিষয়ে কেউ কিছু বলছে না। ডিজিটাল ওকালতনামা যে কেউ সমিতি’র সদস্য নম্বর দিয়ে তুলে নিচ্ছেন। আর এর মাধ্যমে একশ্রেণির টাউট ভার্চুয়াল আদালতে মামলা করছেন। ওকালতনামা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত। ওকালতনামা যদি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজে জানানো যায়। তবে টাউটদের দৌরাত্ম্য কমবে। সেই সঙ্গে পেশার মান বাড়বে।

আইনজীবী ইমরুল হাসান বলেন, মামলার জামিনের দরখাস্ত দাখিল ও শুনানি এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমে হচ্ছে। তবে আমরা আউট অব রেকর্ড সকল পেপার্স এর কপি ম্যানুয়ালি দেই। সেই হিসেবে সবকিছু ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে। আদালতের কার্য ভার্চুয়ালি হলেও বিড়ম্বনার শেষ নাই। অনেক সময় নেট লাইন পায় না। অনেক কোর্ট আছে আমাদের পিটিশন শুনে না।

তিনি আরো বলেন, আবার অনেক কোর্ট আছে জামিনের আবেদন করার অনেক পরে তারিখ দিচ্ছে। ১ জুন আমার এক মামলায় ঢাকার একটি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে দরখাস্ত করেছি। কিন্তু এখনো শুনানির জন্য কোনো তারিখ দেননি আদালত। এতে আইনজীবীরা বিপাকে পড়ছেন, হতাশ হচ্ছেন। সবমিলে ভার্চুয়ালে ভুক্তভোগী এবং আইনজীবীরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

আইনজীবী মনিরুজ্জামান বলেন, করোনার কারণে পুরো দেশ যখন আক্রান্ত। তখন অন্যান্য পেশার মতো বিচার বিভাগও বন্ধ ঘোষণা করা হলো। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর যখন কয়েকজন আইনজীবীর রিটের কারণে প্রধান বিচারপতি মহোদয় ভার্চুয়াল কোর্টে জামিন শুনানির অনুমতি দেন। আমরা তরুণ আইনজীবীরা এটাকে স্বাগত জানিয়েছিলাম কিন্তু অধিকাংশ আইনজীবী এটার বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ অনেক আইনজীবী তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত নন। এবং এই ভার্চুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে দেখা গেল আইনজীবীরা মোটেও নিরাপদ নন। কারণ তাদের পিটিশন ও বেলবন্ড কিনতে কোর্টে আসতে হচ্ছে। অর্থাৎ সব কাজ তাদের আগের মতোই করতে হচ্ছে এবং এনআই অ্যাক্ট-১৩৮ ধারা মামলার ফাইলিং মেইল করেও কোর্টে গিয়ে জমা দিতে হচ্ছে? অথচ বলা হচ্ছে ভার্চুয়াল? মামলা সংক্রান্ত অন্যান্য কাজও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। মোটকথা জামিন শুনানিসহ আদালতের সব কাজ ভর্চুয়াল নামে হলেও আমাদের ম্যানুয়ালিই করতে হয়।

জেএ/এসএইচএস/জেআইএম

ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা করে আইনজীবীরা যতটা না সন্তুষ্ট, তার চেয়ে বিরক্ত আদালতের পেশকার পিয়নের দৌরাত্ম্যে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]