শাস্তি বাড়ালে কমবে লঞ্চ দুর্ঘটনা

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ০১ জুলাই ২০২০

দেশে দিন দিন বেড়েই চলছে লঞ্চ দুর্ঘটনা। মৃত্যুর সারিও দীর্ঘ হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর অবহেলাজনিত মৃত্যু এবং বেপরোয়া জাহাজ চালানোর অভিযোগে মামলা হয়। অধিকাংশ মামলায় দণ্ডবিধি ২৮০, ৩০৪ (ক) ও ৪৩৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এই ধারাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধারা ৩০৪ (ক)-এর প্রয়োগ বেশি হয়। সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া লঞ্চ দুর্ঘটনার আসামিরা দুষ্টুপ্রকৃতির, একই সঙ্গে শাস্তি কম হওয়ায় এ ধরনের অপরাধ বারবার সংঘটিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লঞ্চ দুর্ঘটনায় দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা গেলে অপরাধ কিছুটা হলেও কমবে।

jagonews24

সর্বশেষ গত সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দোতলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাট কাঠপট্টি ঘাটে ভেড়ানোর আগ মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চডুবির ওই ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পর জীবিত উদ্ধার করা হয় সুমন নামের এক ব্যক্তিকে। বর্তমানে তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

লঞ্চডুবির ওই ঘটনায় মঙ্গলবার ভোরে নৌ-পুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। মামলায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদসহ সাতজন আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন আদালত।

মামলায় বেপরোয়া লঞ্চ চালিয়ে মানুষ হত্যা ও ধাক্কা দিয়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধি ২৮০, ৩০৪ (ক), ৪৩৭ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ধারাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে ৪৩৭ ধারায়। কিন্তু আদালত কর্তৃক সর্বোচ্চ প্রয়োগ হয় ৩০৪ (ক) ধারার শাস্তি। সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের মামলায় তিন-চারটি ধারা সংযোজিত করে আসামির বিরুদ্ধে ৮-৯ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তবে অধিকাংশ সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজাই বহাল থাকে।

jagonews24

দেশের একমাত্র নৌ-আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) পারভীন সুলতানা এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলার শাস্তি কম। সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। আমরা তিন-চারটি ধারা মিলিয়ে অপরাধীদের ৮-৯ বছর শাস্তি দিতে সক্ষম হই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একই সঙ্গে সাজা কার্যকর হওয়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজাই ভোগ করতে হয় আসামিকে। লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলাগুলোর শাস্তি বাড়োনো উচিত। তাহলে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে দুর্ঘটনার ১৮টি মামলা নৌ-আদালতে চলমান। আসামিপক্ষ অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দুষ্টুপ্রকৃতির হওয়ায় মামলার কার্যক্রম পরিচালনা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আসামিরা দু-এক বছর জেলে থাকার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে আসেন। এছাড়া সাক্ষীদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। মূলত এ দুই কারণে মামলার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।

jagonews24

নৌ-আদালতে সবচেয়ে বেশি আসামিপক্ষের মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলার শাস্তি খুবই কম। শাস্তির মাত্রা না বাড়ার কারণে এ ধরনের অপরাধ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের উচিত আইন সংশোধন করে শাস্তি বাড়ানো। তাহলে অপরাধের প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে।

ধারা অনুযায়ী শাস্তি

ধারা : ৩০৪ (ক), অবহেলার ফলে ঘটিত মৃত্যু : কোনো ব্যক্তি যদি বেপরোয়াভাবে বা অবহেলাজনিতভাবে কার্য করে কারও মৃত্যু ঘটায় এবং তা শাস্তিযোগ্য নরহত্যা না হয়, তবে সে ব্যক্তি পাঁচ বৎসর পর্যন্ত মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।

jagonews24

ধারা : ২৮০, বেপরোয়া জাহাজ চালানো : কোনো ব্যক্তি যদি এমন বেপরোয়াভাবে বা অবেহলার সাথে কোনো নৌযান চালনা করে, যার কারণে কোনো মানুষের জীবন বিপদাপন্ন হয় অথবা অপর কোনো ব্যক্তির আঘাত লাগার বা জখম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণের অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।

ধারা : ৪৩৭, পাটাতনবিশিষ্ট জাহাজ বা বিশ টন পরিমাণ ভারবাহ: কোনো জাহাজ ধ্বংস করা বা বিপজ্জনকরূপে পরিণত করিবার অভিপ্রায়ে অনিষ্টসাধন করা কোনো ব্যক্তি যদি পাটাতনবিশিষ্ট জলযান অথবা কুড়ি টন বা তদূর্ধ্ব ওজনের বোঝাবিশিষ্ট কোনো জলযান ধ্বংস করার বা উহাকে বিপজ্জনক করে দেয়ার অভিপ্রায়ে বা সে তদ্বারা উহাকে ধ্বংস করতে বা বিপদজনক করে দিতে পারে বলে জানা সত্ত্বেও অনুরূপ পাটাতনবিশিষ্ট জলযানের অথবা কুড়ি টন বা তদূর্ধ্ব ওজনের কোনো জলযানের অনিষ্টসাধন করে, তবে উক্ত ব্যক্তি ১০ বৎসর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থ দণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

জেএ/এমএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]