এক হাজার গজারিসহ কাটা পড়বে ১৮ হাজার গাছ

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

>> ধনুয়া-এলেঙ্গা-নলকা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্প
>> বনের ভেতরের ১৫ কি.মি. অংশে লাইন স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা
>> এক হাজার গজারিসহ কাটা পড়বে সখীপুরের ১৮ হাজার গাছ
>> ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি, বিকল্প কোনো উপায়ও নেই: জিটিসিএল

ধনুয়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড় হতে নকলা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার; অর্থাৎ মোট ৬৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫২ কিলোমিটার পাইপলাইনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে ধনুয়া-এলেঙ্গা সেকশনে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ।

ওই ১৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলে কাটতে হবে প্রায় ১৮ হাজার গাছ। এর মধ্যে প্রাকৃতিক বনায়নের প্রায় এক হাজার গজারি গাছ রয়েছে। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালমেঘা, কালীদাস, গজারিয়া, প্রতিমা বংকী, ছিলিমপুরসহ সাত থেকে আটটি মৌজার ১৮ হাজার গাছ কাটা হবে। বনের ভেতর দিয়ে না নিয়ে কিংবা গাছ না কেটে বিকল্প উপায়ে গ্যাস সঞ্চালন লাইনটি নেয়ারও উপায় নেই বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে এখন দেন-দরবার চলছে সরকারের বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়/সংস্থার সঙ্গে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়/বন অধিদফতরের। ‘ধনুয়া-এলেঙ্গা ও বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়– নকলা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন (বিডি-পি ৭৮ : ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট) (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় এসব গাছ কাটা পড়বে। প্রকল্পটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়/জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উদ্যোগে বাস্তবায়ন করছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।

গত জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পে স্থাপিত ভালভ স্টেশনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভালভ স্টেশনসহ কিছু অবকাঠামো অরক্ষিত থাকায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

Cut-down-trees-07

এছাড়া প্রকল্পের মোট ৬৭ দশমিক ২ কিলোমিটার পাইপলাইনের ৭৫ শতাংশের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে ৯০ শতাংশ এবং ভূমি রিকুইজিশন হয়েছে ৯০ শতাংশ। বাকি আছে বনের ভেতরের ১৫ কিলোমিটার অংশে পাইপলাইন স্থাপন। এই ১৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পের ‘সম্পূর্ণ বিনিয়োগ ঝুঁকিতে’ পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয় নিবিড় পরিবীক্ষণে। অর্থাৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের ৮২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকার সম্পূর্ণ অর্থই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেদনটির এমন মতের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন প্রকল্পটির পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সামছুর রহমানও। তার মতে, ২০১৮ সালে যে প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সময় মতো অনুমোদন না মেলায় প্রকল্পটি এখনও চলমান।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ধীরগতি ও নানা অসঙ্গতি নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নেয়ার জন্য চলতি বছরের জুলাইয়ে সখীপুরের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয় বন অধিদফতর। তবে এখনও বনের গাছ কাটার অনুমতি মেলেনি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে গাছ কাটার অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব দেবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা/উদ্যোগী মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সামছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের ১৫ কিলোমিটারের পথস্বত্ব আছে। এখানে বনটা ঠিক নিবিড় নয়। কিছু বন, কিছু পাবলিক এলাকা। সবমিলিয়ে বনের যে জমি, সেখানে পাইপলাইনের জন্য ৫৩ একর জমি ব্যবহার হবে। মূল পাইপলাইন বসবে ৮ একর জমিতে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, ৮ একর জমির মধ্যে পুরো গাছ আমরা কাটব। আর ৫৩ একর জমি আমরা ব্যবহার করব। তারা আমাদের একটা তালিকা দিয়েছে যে, বিভিন্ন প্রজাতির চারা গাছসহ সামাজিক ও প্রাকৃতিক বনায়ন মিলে প্রায় ১৮ হাজার গাছ এখানে আছে। প্রাকৃতিক বনায়নের গাছ কাটা পড়বে এক হাজারের বেশি, আর সামাজিক বনায়নের আওতায় বাকি গাছগুলো কাটা পড়বে। ১৮ হাজারের মধ্যে সাড়ে ১৩ হাজার হলো বুনো গাছ। মূল উদ্বেগ হলো, প্রাকৃতিক বনায়নের এক হাজার গজারি গাছ। মূলত ওইটার (এক হাজার গজারি গাছ কাটা) জন্যই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমাদের যেতে হবে। গাছগুলো মূলত কাটা হবে যমুনা সেতুর এপাড়ে, টাঙ্গাইলের পাশে।’

তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে আমাদের আরেকটা ২৪ ইঞ্চি পাইপলাইন ১৯৮৫ সাল থেকে অপারেশনে আছে। এই লাইন দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপাড়ে এবং রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে গ্যাস সীমিত পরিসরে দেয়া হচ্ছে। আমাদের ৩০ ইঞ্চির নির্মাণাধীন পাইপলাইনটা হচ্ছে ওইটারই (বিদ্যমান ২৪ ইঞ্চির) লুপ পাইপলাইন। লুপ পাইপলাইন মানে ওইটারই ক্যাপাসিটি বিল্ডিং করা। ভবিষ্যতে যদি এলএনজি আসে, খুলনা পর্যন্ত তো আমরা পাইপলাইন করেছি, সংযোগ দিতে পারছি না গ্যাস সঙ্কটের কারণে। এজন্য যে এলএনজিটা আসবে ভবিষ্যতে, সেই এলএনজিটা ট্রান্সমিট (প্রেরণ করা) করে নিয়ে যাওয়া হবে খুলনা-রাজশাহী পর্যন্ত। সেজন্য ওইটার প্যারালালে (সমান্তরাল) আমাদের এই পাইপলাইন। যেহেতু ওই পাইপলাইনটা আমাদের বন বিভাগের মধ্য দিয়েই গেছে, সেজন্য এটাও বন বিভাগের মধ্য দিয়ে নিতে হচ্ছে। আর টাঙ্গাইল জেলার প্রায় সব দিকেই বন। এজন্য আমরা যে অঞ্চলটা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সেটা বনের মধ্যে সংক্ষিপ্ততম জায়গা। আগের একটা পাইপলাইন এদিকে আছে, ওইটার পথ দিয়েই যাচ্ছি। যেহেতু বন পাচ্ছি, বনের কিছু গাছ কাটা পড়বে, এটা সত্য। সেই গাছ কাটার জন্য আমরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে লিখেছি। এখন তারা আমাদের বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এটার অনুমতি আসে। এখন গাছ কাটার বিষয়টি নতুন সমস্যা। সেজন্য আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আরেকটা সারসংক্ষেপ দেব। গাছ কাটার অনুমোদন নিয়েই আমরা গাছ কাটব।

Cut-down-trees-07

‘গাছ কাটার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছি’ জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক সামছুর রহমান আরও বলেন, ‘২০১৬ সালে আমরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম যে, আমরা এদিকে পাইপলাইন করব, অনুমোদিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) আছে, সেই ডিপিপিতে আমাদের অবকাঠামো এবং লাইনের রাইটও এদিকে দেখানো আছে। কিন্তু নানা জটিলতায় আমাদের সেই অনুমোদন পেতে অনেক দেরি হয়েছে। ২০১৮ সালে এই প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। যেহেতু আমি বনের অনুমতি পাইনি, বহুবার এটা নিয়ে বন অধিদফতরের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছে। তারা ছোট ছোট ইনকুয়ারি (জিজ্ঞাসা) দিয়েছে একাধিকবার। এগুলো কমপ্লাই (সম্মতি জ্ঞাপন) করতে করতে চলতি বছরের জুলাইয়ে ওই বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি পেলাম। এখন নতুন জটিলতা হচ্ছে গাছ কাটা। তারা (বন অধিদফতর) বলছে, আবার প্রস্তাব দেন গাছ কাটার অনুমোদনের জন্য। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও আবার প্রস্তাব দিতে হবে। ওটা নিয়েই আমরা এখন কাজ করছি। আমরা বলেছি যে, আমাদের মূল প্রস্তাবেই তো আছে বনভূমি ব্যবহার ও গাছ কর্তন। ১৮ হাজার গাছ কাটা হবে, সেটার জন্য ক্ষতিপূরণের একটা এস্টিমেটও (হিসাব) দিয়েছে। তিন কোটি ৬৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েছে তারা। আমরা সেটাও দিচ্ছি। পুনর্বনায়নের পরিকল্পনা আমাদের আছে, একটা গাছের বদলে তিনটা গাছ। তাহলে আপনারা এটা দিতে গড়িমসি করছেন কেন? যেহেতু প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন, সুতরাং গাছ কাটার ব্যাপারে গড়িমসি না করে আমাদের দয়া করে অনুমোদন দেন। না হলে আরও দেরি হয়ে যাবে। ২০১৮ সালে যেটা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে ২০২০ সালের শেষ প্রান্তে এসেও শেষ করতে পারলাম না।’

বনের ক্ষতি না করে বিকল্প কোনো উপায়ে পাইপলাইন স্থাপনের সুযোগ আছে কি-না, জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘না, অন্য কোনো উপায়ে বন অতিক্রমের সুযোগ নাই। এর দুইটা বিশেষ কারণ আছে। এক, আমি যদি অন্যদিকে যাই, তাহলে পাইপের লেন্থ (দৈর্ঘ্য) অনেক বেড়ে যাবে। আমরা একবার হিসাব করেছিলাম, তাতে বন ঠিকই পড়বে, হয়তো কম পড়বে। কিন্তু পাইপলাইন বেড়ে যাবে হয়তো ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার। এটার জন্য অনেক খরচ হয়ে যাবে। আমরা তো সেই মেটেরিয়াল কিনি নাই। আরেকটা বিষয় হলো, পথস্বত্ব দিয়ে পাইপলাইনটা করব, সেখানে আমাদের ছয়টা নদী আছে। সেই ছয়টা নদীই আমাদের ক্রসিং করা আছে। তাহলে আমি অন্যদিকে যদি যাই, আবার অন্য জায়গায় ছয়টা নদীকে বাইপাস করতে হবে। এতে দ্বিগুণ খরচ হবে। এই দুইটা বিষয় বিবেচনায় সম্ভব হচ্ছে না।’

Cut-down-trees-07

‘আমি তো ২৪ ইঞ্চির লাইনের সমান্তরালে এটা করব। আমার উদ্দেশ্যই হলো, এই ২৪ ইঞ্চিতে যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে আমি ৩০ ইঞ্চি দিয়ে লাইন অপারেট করতে পারব বা গ্যাস বেশি নিতে পারব। আমি যদি অন্যদিকে চলে যাই, তাহলে অপারেটিং কস্ট (পরিচালন ব্যয়) বেড়ে যাবে। সিকিউরিটি কস্টও (নিরাপত্তা ব্যয়) বেড়ে যাবে। এসব বিবেচনায় গাছ কাটা ছাড়া কোনো উপায় নেই’— যোগ করেন সামছুর রহমান।

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে তো শেষ করা সম্ভব হলো না। এখন আমরা ২০২১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করতে পারব বলে আশা করছি। যদি আমরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে গাছ কাটার অনুমোদন শিগগিরই পেয়ে যায়, যদি এক বা দেড় মাসের মধ্যে মাঠে নেমে যেতে পারি, তা হলেই সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী আমাদের অনুমোদন দিয়েছেন। আশা করি, খুব একটা দেরি হবে না।’

প্রকল্প সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় ওই সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় জিটিসিএল। পরবর্তীতে প্রথম সংশোধন এনে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। খরচ কমিয়ে ধরা হয় ৮২৫ কোটি ৫১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার ৩৯৭ কোটি এক লাখ ছয় হাজার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ৪২৪ কোটি ১১ লাখ আট হাজার এবং জিটিসিএলের নিজস্ব অর্থায়ন ৭৩ কোটি নয় লাখ ২৪ হাজার টাকা। চলতি বছরের জুন পেরিয়ে সেপ্টেম্বরেও প্রকল্পটি শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পিডি/এমএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]