তেল চুরির টাকায় পোষেন চালক, হাঁকান দামি গাড়ি

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:০৪ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

অর্ধকোটি টাকা দামের গাড়িতে চড়েন তিনি। গাড়ির জ্বালানি বাবদ প্রতি মাসে সরকারি খাত থেকে বরাদ্দ পান ৪২০ লিটার অকটেন। কিন্তু দামি গাড়ি বরাদ্দ পেলে কী হবে, সেটি চালানোর জন্য একজন চালক তো দরকার। চালক নিয়োগ দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও রহস্যজনক কারণে বিগত তিন বছরেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাই বলে এত দামি গাড়ি কি বসিয়ে রাখা যায়? না, এ কারণে ব্যক্তিগতভাবে একজন চালকও নিয়োগ দেয়া হয়।

সরকারি নিয়মনীতি না মেনে যার জন্য এই চালক নিয়োগ দেয়া তিনি আর কেউ নন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীম।

মূলত তিনি একজন মেডিকেল অফিসার। সম্প্রতি তাকে এনসিডির ওপির প্রোগ্রাম ম্যানেজার (পিএম-১) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সিনিয়র কয়েকজনকে টপকে তাকে এ নিয়োগ দেয়া হয়। এই কর্মকর্তা একাই এখন সব পিএম (প্রোগ্রাম ম্যানেজার) এবং ছয়জন ডিপিএমের (ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার) কাজ তদারকি করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বছর দেড়েক আগে প্রশিক্ষণে জাপান গেলেও সরকারি গাড়িটি মাসজুড়ে তার পারিবারিক কাজে ব্যবহার হয়। অন্যরা এ নিয়ে কথা তুললে অন্যত্র বদলির হুমকি দেন ডা. আবদুল আলীম।

 

health-01

মূলত সরকারি গাড়ি নিয়োগপ্রাপ্ত বৈধ চালক ছাড়া অন্য কারও চালানোর সুযোগ নেই। এরপরও স্বাস্থ্য অধিদফতরের এনসিডি ওপি’র একজন ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডিপিএম) ব্যক্তিগতভাবে গাড়িটির চালক নিয়োগ দেন। যিনি পিএম’র খুবই আস্থাভাজন। পাঁচ বছর ধরে গাড়িটি ব্যবহৃত হচ্ছে। গাড়িচালকের মাসিক বেতন সরকারি গাড়ির জন্য বরাদ্দকৃত তেল চুরির টাকায় পরিশোধ করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি আইন লঙ্ঘন করে গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডা. আবদুল আলীম ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেয়া গাড়িচালকের বেতন পরিশোধ করছেন। এ অর্থ আসছে সরকারিভাবে গাড়ির জন্য বরাদ্দকৃত তেল চুরির টাকায়!

ডা. আলীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত মাসিক ৪৮০ লিটার তেলের (অকটেন) সিংহভাগই চোরাইভাবে বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছেন তিনি। তেল বিক্রির ওই অর্থে পরিশোধ হচ্ছে চালকের মাসিক বেতন। এছাড়া ওপি’র বিভিন্ন খাত থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী আলাপকালে জানান, ডা. আবদুল আলীম ব্যক্তিগত চালককে দিয়ে সরকারি তেল বিক্রি করান, এটা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কম-বেশি সবারই জানা। সপ্তাহের দু-তিনদিন অফিসের গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি, আবার দু-তিনদিন দাফতরিক কাজে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে সরকারি গাড়ি অধিদফতরে রেখে ভাড়া গাড়িতে চলাফেরা করেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওপিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে গাড়িচালক নিয়োগ এবং চালকের বেতন-ভাতা পরিশোধের কথা বলা হলেও ডা. আবদুল আলীম অবৈধভাবে ব্যক্তিগত চালক নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, সরকারি তেল চুরি করে তা বিক্রির সুযোগ দিয়ে চরম অন্যায় করছেন। গত পাঁচ বছরে কত হাজার লিটার তেল চুরি হয়েছে, তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে খতিয়ে দেখারও দাবি করেন তারা।

এমন অনিয়মের বিষয়ে জানতে ডা. আবদুল আলীমের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরে তার কক্ষে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে গাড়িচালক নিয়োগের সত্যতা স্বীকার করেন। বলেন, ‘ওপিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়ার নির্দেশনা আছে। এ বিষয়ে লাইন ডিরেক্টরদের বিভিন্ন সময় বলা হলেও তারা নিয়োগ দেননি। ডিপিএম (পরবর্তীতে পিএম) হিসেবে সার্বক্ষণিক অফিসের কাজে বাইরে ছোটাছুটি করতে হয় বলে একজন চালক নিয়োগ দেয়া।’

চালকের মাসিক বেতন কোন খাত থেকে আসে এবং গাড়ির তেল বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিব্রত বোধ করেন। বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং অন্যভাবে ম্যানেজ করে গাড়িচালকের বেতন দেই।’

‘অন্যভাবে ম্যানেজ’ মানে তেল বিক্রির সুযোগ করে দেয়া কি-না, এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি ডা. আবদুল আলীম। এ ব্যবস্থায় তিনি একা নন, ওপি’র একাধিক ডিপিএম গাড়ি চালাচ্ছেন বলে জানান।

এনসিডি ওপি’তে কর্মরত একাধিক গাড়িচালকের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। স্যাররা তাদের নিয়োগের আশা দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বেতন দিচ্ছেন।

সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি তেল বাইরে বিক্রি করে সেই অর্থে বেতন হচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্ন করা হয় তাদের কাছে। জবাবে কেউ বিষয়টি স্বীকার করেন, আবার কেউ দাবি করেন, তিন কিলোমিটার পথ চলতে এক লিটার অকটেনের প্রয়োজন হয়। দিনভর ছোটাছুটিতে যে পরিমাণ অকটেন খরচ হয়, সেই হিসাবে মাসিক বরাদ্দকৃত তেলে কুলায় না। স্যাররা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পকেটের অর্থে বেতন দেন।

jagonews24

কিন্তু তাদের এমন যুক্তি ধোপে টেকে না। কারণ সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবস হিসাবে মাসে মোট কার্যদিবস পড়ে ২০টি। মাসে বরাদ্দ দেয়া হয় ৪২০ লিটার অকটেন। সেই হিসাবে প্রতি কার্যদিবসের জন্য বরাদ্দ থাকে ২১ লিটার। এক লিটার জ্বালানি তেল দিয়ে যদি পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া যায়, সেক্ষেত্রে মাসে প্রায় দুই হাজার ৫২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার কথা। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১২৫ কিলোমিটার পথ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ এতটা পথ পাড়ি দেয় কোনো গাড়ি?

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব গাড়ির লগ বইয়ের কোনো বালাই নেই। এমনকি করোনাকালে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ছোটাছুটিরও কোনো প্রমাণ নেই।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) তিন-চতুর্থাংশ কাজ ডা. আবদুল আলীমের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। কাজ বাবদ যাবতীয় ব্যয় তিনি একাই খরচ করেন। অথচ পুরো বছর অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কাজ পরিদর্শনে তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না। দাতাদের অর্থে হয় উড়োজাহাজে, নয়তো ভাড়া গাড়িতে যাতায়াত করেন। অপারেশন প্ল্যানের কোটি টাকা খরচ হলেও এনসিডি মডেল উপজেলাগুলোর (৬৬) মধ্যে চার-পাঁচটি ছাড়া কখনও কোথাও মূল্যায়ন বা পরিবীক্ষণে যাননি এই কর্মকর্তা। অথচ জ্বালানি খরচ তো বটেই, গাড়ি মেইনটেইন খরচেও সবাইকে হার মানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডা. আবদুল আলীমের এমন দুষ্কর্মের প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন পার-২ এর একজন উপসচিব। সম্প্রতি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আদ্যোপান্ত পরিবর্তন হলেও ওই উপসচিব এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। গত অর্থবছর এনসিডি অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) বরাদ্দ দিয়ে প্রগতি থেকে একটি নতুন ক্যারিবয় (ডাবল ক্যাবিন গাড়ি) কেনা হয়। ডা. আলীম মেজর এনসিডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার হয়েই গাড়িটি পার-২ এর ওই উপসচিবকে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। অথচ গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন এখনও করা হয়নি এবং এর কাগজপত্রও হস্তান্তর হয়নি।

পার-২ এর উপসচিবকে ডা. আলীম কখনও সম্মানী, কখনও গাড়ি, কখনও বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন দিয়ে তুষ্ট রেখেছেন। তাকে তুষ্টের মাধ্যমে নিজের মনের মতো কর্মকর্তাদের এনসিডিসিতে পদায়ন করে একচ্ছত্রভাবে পুরো অপারেশন প্ল্যানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন এই প্রোগ্রাম ম্যানেজার।

এমইউ/এমএআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]