যেভাবে উত্থান দুর্নীতিবাজ এই চিকিৎসক কর্মকর্তার

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৫১ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডিসি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) প্রোগ্রাম ম্যানেজার (পিএম) হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পান ডা. আবদুল আলীম। চিকিৎসক এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি বিধিবিধান অনুসারে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা ব্যতীত কারও পিএম পদে নিয়োগ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ডা. আবদুল আলীম ষষ্ঠ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হলেও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের একশ্রেণির শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশীর্বাদে সম্প্রতি পিএম পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে অধিদফতরের অসংখ্য কর্মকর্তার বদলি ও পদায়ন হলেও তাকে বদলি তো করা হয়নি বরং এনসিডিসি প্রকল্পের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার-১ থাকাকালে বিভিন্ন কেনাকাটায় সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সুকৌশলে তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (কনভেনশনাল এনসিডি) ডা. শেখ জাহিদ হাসানকে সরিয়ে সেখানে ডা. আবদুল আলীমকে পদায়ন করা হয়।

এনসিডিসি প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার-১ হিসেবে যোগদানের পর তিনি প্রিন্টিং এবং পাবলিসিটি কাজে সরাসরি ঠিকাদারি দালালের মাধ্যেমে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি বাণিজ্যধর্মী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করেন। ফারহান জামান নামক এক ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনসিডিসি প্রোগ্রামের সব কাজ সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করেন এবং বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত টাকা লাইন ডিরেক্টর ও সংশ্লিষ্ট সবার অগোচরে আত্মসাৎ করেন। প্রতি বছর তিনি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রিন্টিং বাবদ প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। সরকারি মালিকানাধীন অন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একইভাবে প্রায় চার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ডা. আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এনসিডি প্রোগ্রামে এক হাজার ১১৮ কোটি ২৭ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা মেজর এনসিডি কম্পোনেন্টভু্ক্ত। এখানে ওই চিকিৎসক কর্মকর্তা ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার জন্য তিনি ক্রয় ও সংগ্রহ শাখায় মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার অনুমোদন নিয়ে আসেন। অনুমোদন আনার পর ফারহান জামান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ শেষে চেক প্রদানের সময় অবৈধ অর্থের লেনদেন সম্পন্ন করেন।

সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার নিয়মনীতি না মেনে তিনি বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাজ লাইন ডিরেক্টদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে সম্পন্ন করেন। এক্ষেত্রে লাইন ডিরেক্টরদের উন্মুক্ত দর পদ্ধতিতে নিরুৎসাহিত করে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত করেন ডা. আবদুল আলীম। পরে গোপনে ফারহান নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে নিজের ভাগের টাকা বুঝে নেন। মালামাল মূল্যায়ন কমিটি/সার্ভে কমিটিতে না থেকেও অধিদফতরের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার না ভাঙেয়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিতেন তিনি।

অবৈধ এসব কাজের মাধ্যমে ডা. আবদুল আলীম নামে-বেনামে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়, বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারসহ সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থের এফডিআর করেন। নিজ বাসভবনে নগদ টাকা জমা রাখেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, মেজর এনসিডি হিসেবে যোগদান করলেও তিনি প্রোগ্রামের কোনো কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি। শুধু ট্রেনিং/সেমিনার করা এবং প্রিন্টিং ও পাবলিসিটিতেই তার কাজ সীমাবদ্ধ থেকেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেনিং ও সেমিনারের জন্য বরাদ্দ থাকা অর্থের নির্দিষ্ট একটি অংশ কৌশলে হাতিয়ে নিতে তিনি বেশ সিদ্ধহস্ত। অধিদফতরের কর্মকর্তারা মনে করেন, মূল কাজ বাদ দিয়ে এই কর্মকর্তা অন্য সব কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন, ভালো সখ্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। এ কারণে অনিয়ম করতে তাকে তেমন বেগ পেতে হয় না।

ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও তিনি কীভাবে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত ‘প্রোগ্রাম ম্যানেজার’ পদে নিয়োগ পেলেন— এ নিয়ে অধিদফতরের ভেতরে ও বাইরে বেশ আলোচনা আছে। এ প্রসঙ্গে ডা. আবদুল আলীমের বক্তব্য হলো, ‘ব্যক্তিগতভাবে সুপারিশ বা তদবির করে নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পিএম (প্রোগ্রাম ম্যানেজার) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় সরকারি সিদ্ধান্তেই কোনো কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরে বিভিন্ন ওপি’র ডিপিএম পদ ষষ্ঠ গ্রেডের হলেও অষ্টম ও নবম গ্রেডের চিকিৎসক কর্মকর্তাও এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন।’

বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. আবদুল আলীম বলেন, ‘একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

এমইউ/এমএআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]