ক্রসফায়ার ধর্ষণের মতোই আরেকটি অপরাধ, যার কেন্দ্রে ক্ষমতা

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫০ পিএম, ০৬ অক্টোবর ২০২০

অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ইমেরিটাস অধ্যাপক, লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে বলছেন-লিখছেন দীর্ঘকাল ধরে।

ধর্ষণ এবং সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। এ বিশ্লেষক সমাজ-রাষ্ট্রের চলমান সংকটের জন্য পুঁজিবাদকেই দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, যে তরুণরা বিভ্রান্তির পথে, আমূল সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাদের সুপথে আনতে হবে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমশই বাড়ছে। পাহাড় থেকে সমতল, সর্বত্রই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী। সমাজের এই পরিস্থিতি নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ জানতে চাই।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : পুরুষ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকছে। তার সামাজিক এবং রাজনৈতিক জোর নারীর চেয়ে অনেক বেশি। পুরুষ মনে করে অপরাধ করে ধরা পড়বে না। তার ক্ষমতা আছে।

সম্প্রতি ধর্ষণ এবং দুর্নীতির ঘটনাগুলো যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এর পেছনের শক্তি-ই হচ্ছে ক্ষমতা। এই ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত গোটা সমাজব্যবস্থা। গোটা ব্যবস্থাই চরম জায়গায় পৌঁছেছে, যাকে আমরা বলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।

Rape-4.jpg

পুঁজির সর্বনাশ সবখানেই। আপনি যদি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন, দেখবেন এখানেও পুঁজির হাত রয়েছে। করোনাভাইরাস দেখিয়ে দিল, মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্রুতা, মানুষ থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সমাজের মানবিক যে গঠন, তা ভেঙে খান খান করে দিয়েছে।

জাগো নিউজ : পুঁজির বিকাশ অন্যত্রও। কিন্তু এমন সামাজিক অস্থিরতার কারণ...

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, বিকাশ বিশ্বজুড়েই। কিন্তু বাংলাদেশে অপরাধ বাড়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে এখানে কোনো জবাবদিহি নেই, আইনের সুব্যবস্থা নেই। পুঁজিবাদী অন্য দেশে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে। আইনের শাসন আছে। এখানে মানুষ মনে করে চুরি বা ধর্ষণ করলে কিছুই হবে না। জবাবদিহি না থাকার কারণেই এমনটি ঘটছে।

জাগো নিউজ : করোনা পরিস্থিতি তো মানবিক হওয়ার শিক্ষাও দিল। এরপরও ধর্ষণের মতো ঘটনা দেখতে হচ্ছে!

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : করোনায় মানুষ আটকে গেছে। সমাজ এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে ভর করে মানুষ বাঁচতে পারে।

Rape-4.jpg

মানুষের কাজ, বিনোদন কমে এসেছে। আনন্দ কমে গেছে সাধারণ মানুষের। যার ক্ষমতা আছে, সেই আনন্দ ভোগ করবে এবং জোর করে হলেও বা অন্যের অধিকার হরণ করে হলেও। একদিকে কিছু মানুষ আনন্দের নামে যা ইচ্ছা তা-ই করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হতাশায় ভুগছে।

পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ ক্ষমতা ধারণ করছে অন্যের ওপর অত্যাচার করার জন্য। এই সমাজে মানুষ উৎসাহিত হবে না কোনো সৃষ্টিশীল কাজে। কারণ সৃষ্টিশীল কাজের যে পরিবেশ তা ক্রমশই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। মানবিকতা নেই, আদর্শ নেই অথচ তারাই আজ সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই চিত্রেই গোটা সমাজের অধঃপতন হচ্ছে।

জাগো নিউজ : মুক্তির উপায় কী? মানুষ ধর্ষকের ক্রসফায়ারও চাইছে...

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : কথিত সংস্কার বা কয়েকজন ধর্ষককে ফাঁসি দিলেই মুক্তি আসবে না। আমূল পরিবর্তনে আসতে হবে। সংকট তো দুনিয়াজুড়েই। বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার করে কোনো কাজে আসবে না। ক্রসফায়ার ধর্ষণের মতোই আরেকটি অপরাধ, যার কেন্দ্রে ক্ষমতা।

Rape-4.jpg

মূলত সম্পদের ওপর ব্যক্তির মালিকানা থাকলে কোনো সমাধান আসবে না। সমাধান আসবে সম্পদের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা পেলে। আমরা দেখছি, সমাজের চরম বিপর্যয়। পুঁজিবাদ মুখ থুবড়ে পড়ছে।

জাগো নিউজ : বিপর্যয় চরমে বলছেন। এরপরও মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। তার মানে দেয়ালে পিঠ ঠেকতে এখনও বাকি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। মানুষ বুঝতে পারছে না। জলবায়ু নিয়ে জাতিসংঘ ক্যাম্পেইন করছে। ফান্ড তৈরি করছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হচ্ছে। অথচ তারা মূলে যাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কারা? পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোই তো জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।

এ কারণে আমি মনে করি, সংস্কারটা দুনিয়াজুড়েই হওয়া জরুরি। অঞ্চলভেদে পরিবর্তন এনে কোনো লাভ হবে না। করোনা মহামারি যেমন বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে, পুঁজিও তেমন একটি সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে আর কোনো পথ নেই, সম্পদের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা ছাড়া। কোনো আলোচনা বা আন্দোলনে কাজ হবে না।

জাগো নিউজ : সহিংসতার চলমান যে রূপ, এ পরিস্থিতি দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : চলমান পরিস্থিতি খুবই পীড়াদায়ক। তবু বলব, দেশের অবস্থা আরও ভয়ানক হবে।

jagonews24

করোনা পরিস্থিতি সমাজের কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার হচ্ছে। তরুণরা চাকরিহারা। দিন আনে দিন খায় গোছের মানুষগুলো আরও বিপদে। তারা দিশেহারা। নতুন কাঠামোয় ভর না করলে পরিস্থিতি সামলানো যাবে না। আন্দোলন বা প্রতিবাদের যে রূপ, তা থেকে নতুন কাঠামো প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এখানকার গণমানুষের মধ্যে একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয়নি। মানুষকে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে।

জাগো নিউজ : কাদের ওপর ভরসা রাখছেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : তরুণ-যুবকরা মুক্তির পথ দেখাবে। আমি আশাবাদী। এই ঘোর কেটে যাবেই। আমরা হয়তো সচেতন করে তুলতে পারি। গণমাধ্যমও একদিন তার ঘোর কাটিয়ে উঠবে।

আজকে যে কিশোর বা তরুণরা বিপথগামী হচ্ছে, তাদের নিয়েই পরিবর্তনের পথ দেখতে হবে। অন্ধকার ঘিরে ধরলে কেউ রক্ষা পাবে না, আর এটি উপলব্ধি করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এএসএস/এইচএ/এমএস

ধর্ষণ-দুর্নীতির ঘটনাগুলো যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এর পেছনের শক্তিই হচ্ছে ক্ষমতা

দেশে অপরাধ বাড়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে এখানে কোনো জবাবদিহি নেই, আইনের সুব্যবস্থা নেই

কয়েকজন ধর্ষককে ফাঁসি দিলেই মুক্তি আসবে না, আমূল পরিবর্তন আনতে হবে

লাখ লাখ মানুষ বেকার হচ্ছে, তরুণরা চাকরিহারা, দিন আনে দিন খায় গোছের মানুষগুলো আরও বিপদে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]