বাংলাদেশে সন্ত্রাস চালানোর ষড়যন্ত্রে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৩ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২১
উ শি মং আরাকান লিবারেশন পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে

বাংলাদেশে বসবাসরত প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনদের সংগঠিত করে তাদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি)। বাংলাদেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামকে কল্পিত আরাকান রাজ্যের অংশ বলে মনে করা এএলপি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করলেও সীমান্তের এপারে থামেনি তাদের অপতৎপরতা। এই অপতৎরতায় জড়িত থাকায় এএলপির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মিয়ানমারের নাগরিক উ শি মং (৬৭) এবং তার স্থানীয় সহযোগী আইয়ুব রানা গ্রেফতার হয়েছেন। এছাড়া উ শি মংয়ের স্ত্রী সুম্রারাজ লিন প্রকাশ ম্যাম্যাও (৫৮) এই অপতৎপরতায় জড়িত। তবে তিনি এখন পর্যন্ত পলাতক।

সম্প্রতি তিন আসামির বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। ওই অভিযোগপত্রে এএলপির এমন অপতৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন উ শি মং। পরে গ্রেফতার হন আইয়ুব রানা।

উ শি মংকে গ্রেফতারের পর দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৮ অক্টোবর র‌্যাব-১ এর নায়েব সুবেদার গিয়াস উদ্দিন বিমানবন্দর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে গোপন সংবাদ পান যে, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এএলপির একজন সদস্য শাহজালাল বিমানবন্দরের বহির্গমন গেটের সামনে অবস্থান করছেন। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশে উ শি মংকে গ্রেফতার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে উ শি জানান, তিনি মিয়ানমারে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন। গ্রেফতারের পর তার ল্যাপটপ থেকে নিজের ও স্ত্রী সুম্রারাজ লিনের মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ছবি ও ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়।

র‌্যাব প্রাথমিক তদন্তে জানতে পারে, উ শি মংয়ের স্ত্রী সুম্রারাজও মিয়ানমারের এএলপির একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় সদস্য। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে যাওয়া ওই সংগঠন বাংলাদেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামকে তাদের কল্পিত আরাকান রাজ্যের অংশ বলে দাবি ও প্রচার করে। তারা বাংলাদেশে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে তাদের মাধ্যমে এ ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। উ শি মংয়ের তথ্য মোতাবেক, আইয়ুব রানাকেও গ্রেফতার করে র‌্যাব। তারা ঘটনার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

অভিযোগপত্রের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১ এর সহকারী পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টি। তাদের হয়ে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার অপচেষ্টা করছিলেন সংগঠনটির দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উ শি মং ও তার স্ত্রী সুম্রারাজ লিন প্রকাশ ম্যাম্যা। তাদের সহযোগিতা করছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক আইয়ুব রানা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ (সংশাধনী/২০১৩) এর ৬ (২)এর (ঈ)৭(৩)/১০/১২/১৩ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেছি।

উ শি মং ও সুম্রারাজ লিনের বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, আসামি উ শি মং একজন কৃষিবিদ হলেও বাংলাদেশের সংহতি বিনষ্টের অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। সুম্রারাজ লিন এএলপির সশস্ত্র যোদ্ধা, যার সম্পর্কে ল্যাপটপে স্থিরচিত্র পাওয়া যায়। ওই সংগঠন বাংলাদেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামকে কল্পিত আরাকান রাজ্যের অংশ বলে দাবি করে। বাংলাদেশে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে তাদের মাধ্যমে এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ সন্ত্রাস চালানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সংগঠনটি। উ শি মং নিয়মিত মিয়ানমারে যাতায়াত করছিলেন। তিনি এবং তার স্ত্রী মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় তথ্য প্রকাশের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন দুজনে। উ শি মংয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ল্যাপটপে মিয়ানমারের সেনা অফিসারের সঙ্গে তার এবং তার স্ত্রীর ছবি পাওয়া যায়। উ শি মং ও তার স্ত্রী রোহিঙ্গা এবং মুসলিমবিদ্বেষী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে এএলপির সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির ষড়যন্ত্র ও প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন দুজন।

বাংলাদেশের নাগরিক আইয়ুব রানার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, আইয়ুব রানা পেশায় একজন সাংবাদিক। ২০০৬/২০০৭ সালের দিকে ক্ষৃদ্র নৃগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা পত্রিকায় লিখতে গিয়ে অপর আসামি উ শি মংয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি উ শি মং ও তার স্ত্রীকে নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি করেন। এরই এক পর্যায়ে উ শি মংয়ের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে ফেসবুক, ইউটিউব ও অনলাইন টিভি খোলার প্রস্তাব দেন। যেন তারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করতে পারেন। তাছাড়া তারা পরিকল্পনা করছিলেন যে, তারা ২০-৩০ জন মিলে মিয়ানমারে গিয়ে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবেন, যেন তারা বোঝাতে পারেন যে বাংলাদেশে বাংলাদেশিরাই নিরাপদ নন। সেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদ থাকে কী করে! এভাবে তিন আসামি পরস্পর যোগসাজশে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছিলেন।

সহকারী পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান বলেন, এ তিনজন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র, সাহায্য ও সহায়তা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও প্ররোচনা চালিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ করেছেন মর্মে প্রাথমিক তদন্তে এবং সাক্ষ্যপ্রমাণে সত্য প্রতীয়মান হয়েছে বলে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। উ শি মংয়ের স্ত্রী সুম্রারাজ লিন শুরু থেকে পলাতক বিধায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।

জেএ/এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]