যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৯ পিএম, ০৭ জানুয়ারি ২০২১

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাপানের ইয়োকোহামা সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন। এখন অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং টেরোরিজম ইন সাউথ এশিয়া : বিয়ন্ড স্ট্যাটিস্ট ডিসকোর্সেস’ নামক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।

গতকাল বুধবার (৬ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবনে (ক্যাপিটল বিল্ডিং) রিপাবলিকান প্রার্থী ও বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের প্রাণঘাতী হামলার প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। তার মতে, এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত আরও বাড়াবে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলার ঘটনা কতটুকু অবাক করেছে?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: এমন হামলার ঘটনায় আমি মোটেও অবাক হইনি। আমি প্রথম থেকেই বলে এসেছি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র আসলে কোনো মডেল নয়। ১৯৬৮ সালের পর থেকেই মূলত সেখানকার গণতন্ত্রের যাত্রা। এর আগে তো বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর ভোট দেয়ারই স্বীকৃতিই ছিল না। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মার্টিন লুথার কিংকে হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হতে হয়েছে।

এরপরও আমরা যুক্তরাষ্ট্রের যেভাবে যুদ্ধবাজ নীতি দেখে আসছি, তাতে সেখানকার মানুষের মেজাজ এভাবে প্রকাশ পেলে অবাক হওয়ার নয়। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। এরপরও বছরের পর বছর সেখানে বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিয়েতনাম কোনো নিয়মের মধ্যে ছিল না। ইরাক, আফগানিস্তান বা সিরিয়া যুদ্ধেও তাই ঘটেছে। একতরফা এবং এসব যুদ্ধে কংগ্রেসের সর্বসম্মতিও ছিল না। এমন পরিস্থিতির পরও যুক্তরাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করে আমরাই অন্যায় করেছি।jagonews24যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে হামলা-সংঘাতে এখন পর্যন্ত চারজনের প্রাণহানির খবর মিলেছে

মূলত যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে হাইজ্যাক (ছিনতাই) করে ফেলেছিল। যেমন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন একসময় সমাজতন্ত্রকে হাইজ্যাক করে ফেলেছিল। যে কারণে সমাজতন্ত্রকে খারাপতন্ত্র মনে করা হয়।

জাগো নিউজ: তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের করণীয় কী?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: বলার সময় আসেনি। নয়া প্রেসিডেন্ট (জো বাইডেন) উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আমি মনে করি, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তিনি তো অনবরত বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। এ অভিযোগে তার টুইট অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে প্রমাণ হয় যে, এই সহিংসতায় ট্রাম্প প্রভাব রেখেছেন। এ ঘটনায় চারজন মারাও গেছে। এ কারণে তার শাস্তি হতেই পারে।

কিন্তু ট্রাম্পকে শাস্তির আওতায় আনা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তার সমর্থকরা আরও উগ্রতা ছড়াবে। আবার বিচার না হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারহীনতার আরেকটি দৃষ্টান্ত রয়ে গেল। এ কারণেই বলছি, যুক্তরাষ্ট্রে উগ্রতা-বর্ণবাদ সহিংসতা আরও বাড়বে।

জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তো শান্তিও চায়?jagonews24যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবনে এই সংঘাতে স্তব্ধ দেশটির সুধীসমাজ

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: অবশ্যই। অধিকাংশ মানুষই শান্তির পক্ষে। আমি আশা করব, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নিজেরাই ঠিক করবে সমাধান কোথায়। এর জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে।

জাগো নিউজ: আজকের ঘটনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ যে নীতি, তাতে সভ্য-অসভ্যতার প্রশ্নে কী বলবেন?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: সভ্য-অসভ্য প্রশ্নের চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কখনো আইনের তোয়াক্কা করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচুর্যের কাছে মানুষ বুঁদ হয়েছিল। অর্থনীতি-সামরিক ক্ষেত্রে বিশাল ভাণ্ডারের কারণেই মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে ছোটে। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রাচুর্য দিয়ে অন্যায়গুলো আড়াল করে রেখেছে।

আপনি যদি চলতি শতকের যুদ্ধগুলো দেখেন, তাহলে দেখবেন সব আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র মানুষ হত্যা করেছে, বোমা ফেলেছে। এ রাষ্ট্র তো কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনার মধ্য দিয়ে অনেকের স্বপ্ন ভেঙে দিল।

জাগো নিউজ: কাদের স্বপ্নভঙ্গ হলো?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: যারা এতো দিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে বিশ্বাস রেখেছে, উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছে, তাদের কথা বলছি। এমন যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র কখনো গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

jagonews24

হামলাকারীদের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর হয় নিরাপত্তা বাহিনী

জাগো নিউজ: সংঘাত বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করলেন। আর এটি হলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিমত্তায় ভাটা পড়তে পারে কি-না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: এটি হবে বটে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থানে নেই। যদিও সামরিক শক্তিতে এখনো একক অবস্থানে আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সামরিক শক্তি মানুষের ভাতের জোগান দেয় না। যুদ্ধনীতি উন্নয়নবিরোধী নীতি, যা চীন প্রমাণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আর অস্ত্র বিক্রি করে অর্থনীতি চাঙ্গা রেখেছে বছরের পর বছর। কিন্তু এ পরিস্থিতির মধ্যে অনেক রাষ্ট্রই যুদ্ধকে এড়িয়ে অনেক উপরে উঠেছে। এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ভাবনার বিষয়।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বুঁদ হয়ে আছেন প্রাচুর্যের কারণে। আমরা অবাক হই, মানবতাবিরোধী অবস্থানের বিপক্ষে সে দেশের ছাত্র-শিক্ষকরা রাস্তায় নামেন না। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করে। এ গবেষণার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম, দ্বিতীয় হয়। এ প্রশ্নগুলো তো সময়োপযোগী। অস্ত্র দিয়ে কীভাবে মানুষ মারা যাবে, তা নিয়ে গবেষণা হয়। মানুষের ঘুম ভাঙবে বলে আশা করি। যুক্তরাষ্ট্র যে গণতন্ত্র হাইজ্যাক করেছিল সেই ঘোর কেটে যাবে দ্রুত।

জাগো নিউজ: শেষবেলায় জো বাইডেনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রলম্বিত হতে পারে কি-না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: আমার মনে হয় না তা হবে। কারণ ইতোমধ্যে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা শেষবেলা অর্থাৎ ২০ জানুয়ারিও ঝামেলা করতে পারেন। যদি ট্রাম্পকে বিচারের মুখোমুখি করা না যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে সংঘাত ভয়ানক রূপও নিতে পারে!

jagonews24পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে দাঙ্গাবাজদের নিবৃত্ত করতে অ্যাকশনে নিরাপত্তা বাহিনী

মোট কথা, ২০ জানুয়ারির পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, তা বলা যেতেই পারে।

জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এ সংঘাত ইরানের জন্য আপাতত স্বস্তির কি-না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: কিছুটা তো বটেই। তবে এর ভিন্ন আলোচনাও আছে। যখন এমন কোনো পরাশক্তির অভ্যন্তরে সঙ্কট দেখা দেয়, তখন আলোচনা ভিন্নখাতে নিতে অন্যের ওপর হামলা করা হয়। জনগণের সাপোর্ট বাড়ানোর জন্যই মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।

আমি মনে করি, এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলা করা হবে পাগলামিরও বাইরে। কারণ মহামারির দিনে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের জায়গায় নেই। দ্বিতীয় ধাক্কায় আরও বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই মনে করছি, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলা করা চিন্তার বাইরে।

নিজেদের সংকট নিরসনে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। যেমন ঘটিয়েছিল হিটলারের উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মহামারি পরিস্থিতি কী হতে পারে, তার প্রমাণও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে এই আক্রমণ। মানুষ যদি শান্তির পক্ষে থাকে, তাহলে কেউই অশান্তি সৃষ্টি করে সুবিধা নিতে পারবে না।

এএসএস/এইচএ/জেআইএম

আমি মনে করি, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত

সকল আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র মানুষ হত্যা করেছে, বোমা ফেলেছে

যুক্তরাষ্ট্র তার প্রাচুর্য দিয়ে অন্যায়গুলো আড়াল করে রেখেছে

যখন কোনো পরাশক্তির অভ্যন্তরে সংকট দেখা দেয়, তখন আলোচনা ভিন্নখাতে নিতে অন্যের ওপর হামলা করা হয়

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষই ঠিক করবে সমাধান কোথায়

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]