ভাষাসৈনিকদের নামে সড়কের নামকরণ হলো যেভাবে

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৮:২৭ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীর ১১টি সড়কের নামকরণ হয়েছে ভাষাসৈনিকদের নামে। এসব সড়কের নামকরণ করেছে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ধানমন্ডিতেই ভাষাসৈনিকদের নামে সড়ক রয়েছে ১০টি। এছাড়া মিরপুর-১ নম্বরে রয়েছে একটি সড়ক। কিন্তু কীর্তিমান এসব ভাষাসৈনিকদের সড়কের নামফলক এখন জরাজীর্ণ। সাদা মার্বেলের ওপর ছবি এবং জীবনবৃত্তান্ত লেখা মুছে গেছে। তার ওপর সাঁটানো হয়েছে ব্যানার, ফেস্টু, পোস্টার।

ধানমন্ডি এবং মিরপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই সড়কগুলোর নামকরণের ১৪ বছর পরও নামফলক সংস্কার করা হয়নি। সিটি করপোরেশনের সঠিক তদারকির অভাবে এবং অবহেলায় এসব নামফলক এখন জরাজীর্ণ। ফলে ভাষা আন্দোলনের বীর এবং বীরত্বের ইতিহাস মানুষ জানতে পারছে না। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ভাষাসৈনিকদের নামে করা এসব সড়কের নামই জানে না। এ ছাড়া বাসাবাড়ি এবং অফিসের ঠিকানায় এসব সড়কের নাম ব্যবহার হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে একসময় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলে যাবে তরুণ প্রজন্ম। এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে (ডিএনসিসি) এসব সড়কের নামফলক সংস্কার, সংরক্ষণ এবং ঠিকানায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ভাষাসৈনিকদের নামে করা এসব সড়ক, নামফলক, কোথায়, কী অবস্থায় রয়েছে তা ডিএসসিসি এবং ডিএনসিসির অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী জানেন না। এ বিষয়ে সংস্থা দুটির সংশ্লিষ্টদের তেমন কোনো আগ্রহও দেখা যায়নি। ফলে যে মহৎ উদ্দেশ্যে ভাষাসৈনিকদের নামে সড়কের নামকরণ হয়েছে তা অনেকটাই আবেদন তৈরি করতে পারেনি বলে মনে করেন ভাষা গবেষক ও ইতিহাসবিদরা।

ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘নামফলকগুলো সংরক্ষণ না করায় ভাষাসৈনিকদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। সিটি করপোরেশনকে এই কাজগুলো করতে হবে। সংস্থাগুলোকে সৃজনশীল হতে হবে। যদিও তারা চাপে অথবা কোনো দাবি সোচ্চার হয়ে উঠলে কিছু কাজ করে, নয়তো রুটিনকাজ করে। এমন মানসিকতা পরিহার করতে হবে।’

ডিএসসিসির সচিবের দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীর কিছু সড়ক ভাষাসৈনিকদের নামে করতে একটি উপ-কমিটি গঠন করেছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। এই উপ-কমিটির পুরো নাম ‘ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন রাস্তা, অবকাঠামো এবং স্থাপনার নামকরণ উপ-কমিটি।’ তখন এই কমিটি ধানমন্ডির ৯ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক কাজী গোলাম মাহবুব সড়ক, ৮ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়ক, ৭ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন সড়ক, ৬ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সড়ক, ৫ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন সড়ক, ৪ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক, ৩ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক, ১ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়ক, ১৫ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী সড়ক, ৯/এ নম্বর সড়ককে ভাষাসৈনিক তোয়াহা সড়ক ও মিরপুর টেকনিক্যাল কলেজের মোড় থেকে মিরপুর-১ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত সড়ককে ভাষাসৈনিক প্রিন্সিপাল আবুল কালাম সড়ক হিসেবে নামকরণের প্রস্তাব দেয়। পরে ওই বছরের ২৫ জুলাই ঢাকা সিটি করপোরেশনের ১১তম সাধারণ সভায় এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ হয়ে ডিএসসিসি এবং ডিএনসিসি নামে পৃথক দুটি সংস্থা হয়। তখন ডিএনসিসির অধীনে চলে যায় প্রিন্সিপাল আবুল কালাম সড়ক। বাকি সড়কগুলো ডিএসসিসির অধীনে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়কে নামফলকের সামনে গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান। এ কারণে সড়ক থেকে ফলকটি দেখা যায় না। রঙিন দেয়ালের সঙ্গে লাগানো সাদা মার্বেল পাথরে লেখা ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক। কিন্তু দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটা নামফলক। শেখ জামাল ক্লাবের সামনে থেকে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর যেতে সেতুতে ওঠার আগে রয়েছে আরেকটি নামফলক। কিন্তু এ ফলকের ওপর পোস্টার সাঁটানো। ফলে সড়কটি কার নামে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। শুধু নিচের অংশে লেখে সড়কটির উদ্বোধন করেছেন প্রয়াত মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। অন্যান্য সড়কের ফলকগুলোতেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

ধানমন্ডির ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়কের (৮ নম্বর সড়ক) প্রবীণ বাসিন্দা সৈয়দ সাহাবুদ্দিন। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডি একটি অভিজাত আবাসিক এলাকা। এখানে বাস করা গড়ে ৯৯ ভাগ মানুষ শিক্ষিত। কিন্তু তাদের কেউ ভাষাসৈনিকদের নামে সড়কগুলো চেনেন না। কারণ, সড়কে নামফলক বসানো হলেও সেগুলো প্রচার এবং ব্যবহারে কোনো ভূমিকা রাখেনি সিটি করপোরেশন। এখন অনেক ফলকের লেখা উঠে গেছে। ফলকের ওপর পোস্টার লাগান রাজনৈতিক নেতারা। ফলে সবাই নম্বর হিসেবে ধানমন্ডিকে চেনেন এবং জানেন। এতে ভাষাসৈনিকদের বীরত্বের ইতিহাস তেমন কেউ জানতে পারছেন না।’

বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট কৃষি ও উদ্যান সংশ্লিষ্ট ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ওই জমি সমতল করে জনগণের মধ্যে প্লট বরাদ্দ করে। পরে ডিআইটি জনসাধারণের সংশ্লিষ্ট সুবিধাদি, রাস্তা ও অন্যান্য ভৌত কাঠামো নির্মাণকাজ হাতে নেয়। তখন এলাকাটি কয়েকটি ব্লকে (নম্বর) বিভক্ত করা হয়। এরপর থেকেই ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকা নম্বর হিসেবে পরিচিতি পায়। যেমন : ধানমন্ডি-১, ধানমন্ডি-৩ ইত্যাদি।

ধানমন্ডির এই সড়কগুলো ডিএসসিসির ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। জানতে চাইলে এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম বাবলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাষাসৈনিকদের নামে করা এসব সড়ক ধানমন্ডিবাসীর জন্য গৌরবের। কিন্তু অজানা কারণে এসব সড়কের নামফলকগুলো অযত্নে পড়ে রয়েছে। অনেকেই না জেনে নামফলকে পোস্টার লাগাচ্ছেন। বিষয়টি চোখে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজ উদ্যোগে এসব সড়কের নামফলক সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্য বাড়াতে উদ্যোগ নেব। প্রতিটি বাড়ি এবং অফিসের ঠিকানায় ভাষাসৈনিকদের নামে করা সড়কগুলো ব্যবহার করতে সবাইকে বলবো। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন করেছেন, ধানমন্ডিতে এমন কারও খোঁজ পেলে তাদের নামে নতুন সড়কের নামকরণ করতে ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে প্রস্তাব দেব।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাই এখনো আগের মতো ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকা সড়কের নম্বর অনুযায়ী চিনি বা ব্যবহার করি। আমাদের বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম ভাষাসৈনিকদের নামেই সড়কগুলো জানবেন এবং চিনবেন। বাড়ি কিংবা অফিসের ঠিকানায় যথাযথ নামই ব্যবহার করবেন। এ বিষয়ে ডিএসসিসি উদ্যোগ নেবে।’

ভাষাসৈনিক প্রিন্সিপাল আবুল কালাম সড়ক : ডিএনসিসির মিরপুর টেকনিক্যাল কলেজ মোড় থেকে মিরপুর-১ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত ভাষাসৈনিক প্রিন্সিপাল আবুল কালাম সড়কে মাত্র একটি নামফলক রয়েছে। এই ফলকের ওপরও বিভিন্ন পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। ফলে সড়কের নামটি তেমন কারও চোখে পড়ে না। এ ছাড়া এই এলাকার কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া ওই সড়কের নাম-ঠিকানায় ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।

সড়কের নামকরণ এবং নামফলক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ তদারকি করে ডিএনসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগ। এই বিভাগের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাসেম বলেন, ‘ওই সড়কের নামফলকের ওপর পোস্টার সাঁটানো এবং ঠিকানায় সড়কের নাম ব্যবহার না করার বিষয়টি তার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

এমএমএ/ইএ/এসএইচএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]