যাত্রীছাউনি-স্ট্যান্ডে থামে না বাস

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

যত্রতত্র বাসে ওঠা-নামা বন্ধে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দুই শতাধিক যাত্রীছাউনি ও বাস স্টপেজ বা বাস বে নির্মাণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু অধিকাংশ যাত্রীছাউনি এবং বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ায় না বাস। যাত্রীরাও এসব ছাউনি ব্যবহার করেন না। ফলে যে লক্ষ্যে এসব যাত্রীছাউনি স্থাপন করা হয়েছিল তার সুফল মিলছে না।

যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত স্থানে বাস থামান না চালকেরা। আইন মানতে পুলিশও চালকদের বাধ্য করে না। ফলে আগের মতোই যত্রতত্র বাস থামছে। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করছেন যাত্রীরা। এতে সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনা। অবিলম্বে সড়কে এই বিশৃঙ্খলা বন্ধে নগর কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মত দেন যাত্রীরা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিটি যাত্রীছাউনি এবং বাস স্ট্যান্ডে ট্রাফিক সাইন স্থাপন করেছে সিটি করপোরেশন। সে অনুযায়ী এসব স্থানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা নিশ্চিত করতে কাজ করছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। তবে করোনার কারণে এই কার্যক্রম অনেকটা ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। শিগগির আবার জোরালোভাবে কার্যক্রম চালানো হবে।

ডিএসসিসি
বর্তমানে ডিএসসিসি এলাকায় ৯৪টি যাত্রীছাউনি রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে নিজ অর্থায়নে আজিমপুর চৌরাস্তা, আজিমপুর এতিমখানার সামনে, আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে, মুক্তাঙ্গন পার্কের সামনে, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের দক্ষিণ পাশে, বাহাদুর শাহ পার্কের পশ্চিম পাশে, মতিঝিল জনতা ব্যাংকের সামনে, টিকাটুলি, জনপথ মোড়, বাসাবো, মৌচাক, ইত্তেফাক মোড়, গুলিস্তান স্টেডিয়াম কর্নার, মতিঝিল (জীবন বীমা ভবনের সামনে), যাত্রাবাড়ী, বলধা গার্ডেন সংলগ্ন, রায়েরবাগ উত্তর, রায়েরবাগ দক্ষিণ, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা রোড, বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির, শাহজাহানপুর, শনির আখড়া, শাহবাগ, নটরডেম কলেজের সামনে, চানখাঁরপুলসহ ৪৮টি স্থানে নতুন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়।

jagonews24

ফাঁকা মুক্তাঙ্গন পার্কের সামনের যাত্রীছাউনি

এছাড়া নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেস) প্রকল্পের আওতায় পান্থকুঞ্জ পার্ক, মতিঝিল শাপলা চত্বরের পশ্চিম পাশে, গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, বাংলামোটরে রূপায়ন টাওয়ারের সামনে, শাহবাগের ঢাকা ক্লাবের সামনে, পল্টনে আজাদ প্রোডাক্টসের সামনে, মালিবাগ বাজারের পূর্ব পাশে রোড সাইডে, খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি এবং এই পুলিশ ফাঁড়ির উল্টোপাশে, মালিবাগ রেলগেট, টিটিপাড়া অতীশ দীপঙ্কর রোডে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি যাত্রীছাউনি নির্মাণে ১৭ লাখ টাকা করে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ।

সম্প্রতি এসব যাত্রীছাউনি ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ছাউনির সামনে ২০০ ফুট করে সড়কে হলুদ রঙ দিয়ে মার্ক করা রয়েছে। সেখানে বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখা ‘বাস স্টপেজ, থামুন’। কিন্তু এর কোনোটিতেই বাস থামতে দেখা যায়নি। ছাউনিতে যাত্রীদেরও দেখা মেলেনি। যে যার মতো যত্রতত্র গণপরিবহনে ওঠানামা করছেন।

এর মধ্যে পান্থকুঞ্জ পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে থাকা যাত্রীছাউনির বেঞ্চগুলো ভেঙে পড়ে রয়েছে। এর ভেতর মলমূত্র ত্যাগ করছে ভাসমান লোকজন। আজিমপুর এতিমখানার সামনের যাত্রীছাউনিতে বেঞ্চ থাকলেও সেখানে কোনো যাত্রীকে বসতে দেখা যায়নি। বেঞ্চের ওপর কয়েকস্তর ধুলোবালি পড়ে রয়েছে। এই ছাউনির সামনে মানিকগঞ্জ-সাভার থেকে নারায়ণগঞ্জ চিটাগাং রোড বা সাইনবোর্ডগামী কোনো বাস দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

আজিমপুর এতিমখানা মোড় থেকে নিয়মিত যাত্রাবাড়ীর কাজলায় গিয়ে অফিস করেন কামাল হোসেন। তিনি বলেন, যেখানেই হাত দিয়ে ইশারা করা হয়, সেখানেই বাস থামে। যাত্রী ছাউনিতে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। আবার যাত্রী ছাউনিতে গিয়ে অপেক্ষা করলে অনেক সময় সেখানে বাস দাঁড়ায় না।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে এই রুটে বাস চালান মৌমিতা পরিবহনের চালক সাফায়েত। তিনি বলেন, অনেক যাত্রীছাউনি যথাযথ স্থানে স্থাপন করা হয়নি। আবার যাত্রীরাও সেই ছাউনিতে দাঁড়ান না। ফলে সব জায়গা থেকেই যাত্রী ওঠাতে হয়।

গুলিস্তানে শহীদ মতিউর পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ফুটপাতের ওপর রয়েছে প্রায় ৪০ ফুট লম্বা একটি যাত্রীছাউনি। এর ওপর লেখা ‘গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্স যাত্রীছাউনি; বাস্তবায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন’। কিন্তু যাত্রীছাউনির সামনের রাস্তায় ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রায় ১০ ফুট গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। ফলে কাউকে এই যাত্রীছাউনি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। ছাউনির ভেতর পৃথক দুটি টিকিট কাউন্টারের জানালার কাঁচ ভেঙে রয়েছে। ছাউনির স্টিলের দেয়াল পোস্টারে ছেয়ে গেছে। অথচ এই স্ট্যান্ড থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনে লক্ষাধিক লোক যাতায়াত করে করে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।

jagonews24

যাত্রীছাউনিতে গড়ে উঠেছে দোকান

যাত্রীছাউনি ব্যবহার না করা এবং অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউর রহমান কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের জাগো নিউজকে বলেন, নিরাপদে গণপরিবহনে ওঠানামার ব্যবস্থা করতেই এসব যাত্রীছাউনি এবং স্ট্যান্ড নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এসব ছাউনি এবং স্ট্যান্ড ব্যবহার নিশ্চিত করবে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ করবে ডিএসসিসি।

ডিএনসিসি
ডিএনসিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও শতাধিক যাত্রীছাউনি রয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই যাত্রী এবং চালককে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে অধিকাংশ যাত্রীছাউনি ভেঙে রয়েছে। কিন্তু সেগুলো সংস্কার করছে না ডিএনসিসি।

নাগরিকদের অভিযোগ, দায়সারাভাবে এসব ছাউনি নির্মাণ করেছে ডিএনসিসি। এখন এগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। কিছু ছাউনির ভেতর গড়ে উঠেছে দোকানপাট। কিন্তু ডিএনসিসির কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ে কেন্দ্রীয় ঔষধালয়ের বিপরীত পাশে ফুটপাতের ওপর রয়েছে কংক্রিটের একটি যাত্রীছাউনি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন এই ছাউনিটি নব্বইয়ের দশকে নির্মাণ করেছিল। এখন জরাজীর্ণ এই যাত্রীছাউনিতে বসা বা দাঁড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ছাউনির ভেতর দিয়েই চলাচল করেন পথচারীরা। এরমধ্যে ছাউনির দক্ষিণ কোণে গড়ে উঠেছে একটি দোকান। সেখানে সংবাদপত্রসহ মুদি মালামাল বেচাকেনা করতে দেখা গেছে।

জানতে চাইলে দোকানী জহিরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়েই এই ছাউনিতে দোকান বসিয়েছেন। বিনিময়ে সিটি করপোরেশনকে প্রতি মাসে ভাড়া দেন।

তবে এই পথে চলাচলকারী যাত্রীদের অভিযোগ, ছাউনিতে দোকান বরাদ্দের কারণে স্থানীয় লোকজনের আড্ডাবাজি হয়। ফলে যাত্রীরা কেউ ছাউনির নিচে দাঁড়ান না।

jagonews24

গুলিস্তানের আহাদ পুলিশ বক্স যাত্রীছাউনি ফাঁকা

এদিকে ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মিরপুর-১, মহাখালী যাত্রীছাউনিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। তবে বনানী থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত তিনটি আধুনিক যাত্রীছাউনি রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) তত্ত্বাবধানে এসব ছাউনি নির্মাণ করেছে ভিনাইল ওয়ার্ল্ড গ্রুপ। কিন্তু যাত্রীছাউনিগুলো ব্যবহারে যাত্রী এবং চালকদের আগ্রহ নেই। ফলে যাত্রীছাউনির সামনে কোনো বাস দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

আধুনিক এসব যাত্রী ছাউনি ব্যবহার না করার বিষয়ে সওজের ঢাকা সার্কেলের এক কর্মকর্তা বলেন, যে উদ্দেশ্যে যাত্রীছাউনিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল তার সুফল মিলছে না। পুলিশ-প্রশাসনের কোনো তদারকি নেই। ফলে চালকরা যে যার মত যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করছেন।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, বিদ্যমান যাত্রীছাউনিগুলো সংস্কারে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। ক্রমান্বয়ে সেগুলো সংস্কার করা হবে। এছাড়া যাত্রীছাউনি এবং বাস স্টপেজ যেন চালক এবং যাত্রীরা ব্যবহার করেন সে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হবে।

এমএমএ/এইচএ/এমকেএইচ

নিরাপদে গণপরিবহনে ওঠানামার ব্যবস্থা করতেই এসব যাত্রীছাউনি এবং স্ট্যান্ড নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এসব ছাউনি এবং স্ট্যান্ড ব্যবহার নিশ্চিত করবে

যে উদ্দেশ্যে যাত্রীছাউনিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল তার সুফল মিলছে না

যাত্রীছাউনি এবং বাস স্টপেজ যেন চালক এবং যাত্রীরা ব্যবহার করেন সে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]