‘ভাষা-সংস্কৃতির চর্চার প্রশ্নে আমরা বেশি কিছু করতে পারিনি’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৯ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

‘লিখিত ভাষা এক প্রকার বিকৃত ভাষা। কারণ মানুষ ঠিক ওভাবে বলে না। অথচ আমাদের ভাষাকেন্দ্রিক যে সাহিত্য, তা মূলত লিখিত রূপেই। যেখানে কথ্য ভাষার মিলন ঘটানো হয়নি সঠিকভাবে। তবে এখন কিছুটা হচ্ছে বটে।’

বলছিলেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে বাঙালির অর্জন নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার পত্তন। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে কোথায় যাওয়ার কথা ছিল-কোথায় যেতে পারলাম?

হাসান আজিজুল হক : ভাষা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের জবাব সহজে দেয়া যায় না। ভাষার ইতিহাস বিচিত্র তো। বহুদিন চলতে চলতে ভাষার একটি রূপ দাঁড়ায়। কথিত, লিখিত এবং পঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আজকের ভাষাগুলো একটি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার জন্ম। বহুকাল আমরা উপনিবেশিক শাসনে ছিলাম। এর আগে ভাবগত যোগাযোগ ব্যবস্থাও শক্তিশালী ছিল না। এ কারণে এক ভাষার সঙ্গে আরেক ভাষার যোগাযোগও সহজ ছিল না। কথিত রূপের মধ্য থেকেই একটু একটু করে ভাবনার উদয় হলো যে, ভাষারও সর্বজনীনতা আছে।

ব্রিটিশ শাসন যখন ‘ভারতবর্ষ’ তৈরি করে রিপাবলিক ব্যবস্থা জারি করল, তখন আলাদা আলাদা অঞ্চল তৈরি করেই রাজসভা চালাত। কিন্তু কোনো ভাষাকেই আঘাত করেনি ব্রিটিশরা। যদিও সর্বজনীন ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে চালু করা হলো। তবে হিন্দিরও গুরুত্ব থাকলো।

কিন্তু এ অঞ্চলে ইংরেজি ভাষার বহু আগেই বাংলা ভাষার জন্ম। এরপরেও বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে সঠিক কাঠামো দাঁড় করানো যায়নি। যেমন বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া সম্ভব হয়নি বাংলাকে। ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক আছে, আমরা তা দিতে পারিনি। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এই সম্পর্ক ঠিকমত নির্ধারণ করতে না পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ভাষার মাধ্যমে সে সম্পর্ক প্রকাশ করা যাবে না।

কবিতা এখনও অনেক দুর্বোধ্য। আজকাল গদ্যও দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে। বিচিত্র এক পরিক্রমার মধ্য দিয়ে ভাষার রূপ পরিবর্তিত হয়। এ কারণে ভাষার নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো দাঁড়া করানোও মুশকিল। এই ভাবনাগুলো অনেকেই প্রকাশ করতে পারেন না।

জাগো নিউজ : কিন্তু মানুষ যখন ভাষাকে নিজের বলে দাবি করে, তখন তো একটি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই করে।

হাসান আজিজুল হক : আমি বলেই দিলাম যে, বাংলা আমার নিজের ভাষা। আরেকটা মানুষ এসে বলে দিলো, বাংলা তার নিজের ভাষা। কিন্তু ফারাক তো আছেই। এই ফারাক ভাষার নয়, এটি বাস্তবের। পথের পাঁচালীকে আমরা বাংলা ভাষার একটি অপূর্ব নিদর্শন বলে মনে করি। কিংবা অপরাজিত। মনে করা হয়, এগুলো চিরস্থায়ী এবং বাঙালি মনন থেকে কখনই যাবে না। কিন্তু এক সময় চলেও যেতে পারে। এটি অতিবাস্তব। বাস্তব এবং অতিবাস্তবের কারণেই ভাষার বৈচিত্র্য।

লিখিত ভাষার চেয়ে কথিত ভাষাগুলো বেশি শক্তিশালী। লিখিত ভাষা দিয়ে সবাইকে যুক্ত করা সম্ভব না। এ কারণে আমি মনে করি, যারা কথাসাহিত্যিক তারা আঞ্চলিক ভাষার ওপর ভর করে যদি চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তাহলে আরও স্পষ্ট হয়। আমিও তাই করার চেষ্টা করি।

এ কারণেই বলি, ভাষাকে ডলাডলি, মোচড়া-মোচড়ি না করে প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত। আমার ভাষা বাংলা, এটুকু মনে রাখলেই চলবে। এটির ধার করা ভাষা নয়। অনেক পুরনো একটি ভাষা। এই ভাষায় আদিবাসীরা কথা বলতো, এই ভাষায় নিম্নশ্রেণির মানুষ কথা বলতো। উচ্চবিত্তরা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতেন। আবার সেটাও বাংলা হয়ে গেল এক সময়।

জাগো নিউজ : বাংলার কারণে এ অঞ্চলে অনেক ভাষা বিলীন হয়েও যাচ্ছে। যেমন আদিবাসীদের ভাষা। তার মানে বাংলা ভাষা নিয়েও ডলা-ডলি, মোচড়া-মোচড়ি তো হলো।

হাসান আজিজুল হক : এটি বাস্তব এবং বেদনাদায়ক। তবে আদিবাসীদের ভাষা হচ্ছে স্বতন্ত্র। আমি বলছি, বাংলা ভাষার উপ-ভাষাগুলোর কথা। আপনি এবং আমি দু’জনই বাংলায় কথা বলছি। কিন্তু আপনি যদি রংপুরের অধিবাসী হন, তাহলে আমার ভাষার সঙ্গে বিস্তর ফারাক থাকবে। ভাষার চরিত্র এমন যে, গ্রাম থেকে গ্রামেই বদলে যায়। আমি পশ্চিম বাংলার বহু গ্রামে ঘুরেছি। ঘুরেছি বাংলাদেশেও। মিলতো পাই না। একই ভাষায় কত তফাৎ!

যেমন, পায়ের জুতা নিয়ে কত কথা, কত নাম, আর কত রচনা! সবাই বাংলা ভাষাই বোঝাতে চান এসব রচনা দিয়ে। আমার এ দুটো পা কত নামের আবরণে ঢাকা পড়েছে, তার কী হিসাব আছে? চটি, খড়ম, জুতা আবার সু বা স্যান্ডেলও এখন বাংলা ভাষার কাছাকাছি চলে আসলো। এমন প্রতিটি জিনিসরেই সামাজিক, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে। আর সব ব্যাখ্যাই ভাষা দ্বারা আবৃত।

জাগো নিউজ : শুরু করছিলাম ভাষা-সংস্কৃতি চর্চার প্রসঙ্গ দিয়ে। আমাদের অর্জন নিয়ে কী বলবেন?

হাসান আজিজুল হক : ভাষা-সংস্কৃতির চর্চার প্রশ্নে আমরা বেশি কিছু করতে পারিনি। করা উচিত ছিল। ব্রিটিশরা দু’শো বছর শাসন করেছে। এর আগে বহু পক্ষ শাসন করেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ব্রিটিশ আমলেই বাংলা ভাষার গদ্য রূপ দাঁড়ালো। এর আগে তো সবই পদাবলি ধরনের ছিল।

ঊনিশ শতকের গড়ার দিকে কথ্য ভাষাকে লিখিত রূপ দেয়ার মধ্য দিয়ে গদ্যের রূপান্তর ঘটতে থাকলো। তখন থেকেই মূলত চর্চার শুরু গদ্যের। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রশ্নে যে জাতিবোধ জাগ্রত হওয়ার কথা সেখানে আমাদের চর্চা প্রায় থেমে গেছে। আমরাতো ভাষিক জাতি। ভাষাকে কেন্দ্র করেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু তা কী আসলে হলো?

জাগো নিউজ : সংকটটা আসলে কোথায়?

হাসান আজিজুল হক : যারা সৃষ্টি করবেন, তারাই মূলত সংকটে পড়ে আছেন। লেখক, সাহিত্যিক এমনকি বুদ্ধিজীবীরা তো আর নিজস্ব সংস্কৃতিতে শক্তি পাচ্ছেন না। মানে তারা নিজেকে জাগ্রত করতে পারছেন না। এটি তাদের দৈন্যদশা। নিরাশা ঠিক এখানেই।

লিখিত ভাষা এক প্রকার বিকৃত ভাষা। কারণ মানুষ ঠিক ওভাবে বলে না। অথচ আমাদের ভাষাকেন্দ্রিক যে সাহিত্য, তা মূলত লিখিত রূপেই। যেখানে কথ্য ভাষার মিলন ঘটানো হয়নি সঠিকভাবে। তবে এখন কিছুটা হচ্ছে বটে।

এএসএস/এমআরএম/এসএইচএস/এমকেএইচ

যারা সৃষ্টি করবেন, তারাই মূলত সংকটে পড়ে আছেন। লেখক, সাহিত্যিক এমনকি বুদ্ধিজীবীরা তো আর নিজস্ব সংস্কৃতিতে শক্তি পাচ্ছেন না। মানে তারা নিজেকে জাগ্রত করতে পারছেন না। এটি তাদের দৈন্যদশা। নিরাশা ঠিক এখানেই

ইংরেজি ভাষার বহু আগেই বাংলা ভাষার জন্ম। এরপরেও বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে সঠিক কাঠামো দাঁড় করানো যায়নি। যেমন বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া সম্ভব হয়নি বাংলাকে। ভাষার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক আছে, আমরা তা দিতে পারিনি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]