করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রাণ কাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৬:৩৮ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২১

দুর্ঘটনা রোধে নানা পদক্ষেপ নেয়ার পরও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিনই ঝরছে অসংখ্য প্রাণ। সড়ক দুর্ঘটনা এখন যেন মহামারির মতো তরতাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস।

সড়ক দুর্ঘটনা, সড়কে যাত্রী ও চালকের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল হক মিঠু

জাগো নিউজ: সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আপনারাসহ একাধিক সংগঠন কাজ করছে। সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশও দিয়েছেন। তবুও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: সড়ক দুর্ঘটনা নির্মূলের জন্য যেসব বিষয় শনাক্ত হয়েছে, যে সুপারিশ দেয়া হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও নেই। সড়ক নিরাপদ করতে যেসব উপাদান দরকার, তার মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া কিছু হয় না। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে গতি বাড়ছে। কিন্তু গতিকে নিরাপদ করতে যেসব কাজ করা দরকার সেগুলো হচ্ছে না।

গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহন যদি আলাদা করা যেত কিংবা আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসত। বর্তমানে ঘন কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু প্রতিরোধে কোনো কাজ করা হচ্ছে না। মুখে মুখে সারাদিন সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর কথা বলি, কিন্তু বাস্তব কোনো পদক্ষেপ না নিলে সড়কে মৃত্যু কখনোই কমবে না।

জাগো নিউজ: ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরতে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের অভিযান চালাতে দেখা যায়? তারপরও কীভাবে রাস্তায় থেকে যায় এ ধরনের যানবাহন?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: এগুলোকে আমরা আইওয়াশ মনে করি। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বর্তমান বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। করোনা মহামারির চেয়ে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, বাজেট, জনসম্পৃক্ততা দেখি। যার কোনো কিছুই সড়ক নিরাপত্তার জন্য নেই। দু-এক দিনের এসব কর্মকাণ্ড আসলে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ, বড় দুর্ঘটনার রেশ লুকানো এবং মানুষকে সাময়িক সান্ত্বনা দেয়ার জন্যই করা হয়।

jagonews24

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যাত্রীকল্যাণ সমিতিসহ একাধিক সংগঠন নানা সুপারিশ দিলেও তার কোনো ফল মিলছে না

জাগো নিউজ: বিআরটিএ’র সক্ষমতা কতটুকু? তারা সড়ক নিরাপত্তায় কী ধরনের কাজ করছে বলে আপনি মনে করেন?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: বিআরটিএ সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর চেয়ে বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বেশি। ছোট যানবাহন নিবন্ধন হচ্ছে, প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ লাখ মোটরসাইকেল নামছে। অটোরিকশা, ইজিবাইক নামছে। এগুলোর জন্য তারা সরকারের কাছে কোনো সুপারিশমালা দিচ্ছে না। গত তিন-চার বছরে তারা ১০ লাখের অধিক চালককে লাইসেন্স দিতে পারেনি।

অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তায় তাদের যেসব কাজ করা দরকার সেগুলো নেই। তাদের রোড সেইফটি ইউনিট আছে। সেটার কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। তারা চালকদের কোনো ধরনের মডিউল ছাড়াই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

বিআরটিএ শুধু সরকারের রাজস্ব আহরণের একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা যানবাহন নিবন্ধন, ফিটনেস দিতে ব্যস্ত। বিআরটিএ যানবাহনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাদের কাজ হলো, যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় কাজ করবে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে এসব কিছুর প্রতিফলন দেখা যায় না। তারা মাঝে মধ্যে রোড-শো করছে, এটা-ওটা করছে। এগুলো তো সামাজিক সংগঠনের করার কথা।

jagonews24

আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই বিধায় ট্রাফিক পুলিশকেও পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হয়

জাগো নিউজ: ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ’র গাফিলতি কতটুকু বলে আপনার মনে হয়?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: ভাড়া নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে বিআরটিএ সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ। কিন্তু আমরা দেখি ভাড়া নির্ধারিত হয় কিলোমিটার হিসাবে। কিন্তু রাস্তায় ভাড়া আদায় হয় ওয়েবিল হিসাবে। শেষ গন্তব্য পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সব যাত্রীকে দিতে হয়। ওয়েবিলে ভাড়া আদায় নিয়ে বিআরটিএ কিন্তু একদম নীরব। তাদের মোবাইল কোর্টকেও আমরা মাঠে দেখি না। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখিনি। আমরা মনে করি, বিআরটিএ জনগণের প্রতিষ্ঠান হলেও পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের স্বার্থে তারা কাজ করছে। ফলে জনগণ ভাড়া নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছে।

জাগো নিউজ: সিএনজি অটোরিকশাগুলো ফ্রি স্টাইলে আর কতদিন চলবে বলে আপনি মনে করেন?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: এখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি চায়, এগুলোকে মিটারে চালাবো, তাহলে সেটা সম্ভব। রাইড শেয়ারিং সেবা আসার আগে আমরা বলেছিলাম ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি জাদুঘরে চলে যাবে। আজ আমাদের কথাই সত্য হচ্ছে। তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে এগুলো নামানো হলো, আমরা সেগুলো থেকে রেজাল্ট নিতে পারলাম না।

জাগো নিউজ: সরকার কি পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মি? এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মোজাম্মেল হক চৌধুরী: আমি মনে করি, এ চক্রের কাছ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত না বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের গণপরিবহনে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নতি হবে না। আমরা দেখছি, আমাদের আওয়াজ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে দেখি, সড়ক সংক্রান্ত বিষয়ে মালিকদের সুরে কথা বলেন। তখন আমরা বুঝতে পারি। তারা প্রধানমন্ত্রীকে ইনফ্লুয়েন্স করেন।

এসএম/এআরএ/এসএইচএস/এইচএ/এমএস

বাস্তব পদক্ষেপ না নিলে সড়কে মৃত্যু কখনোই কমবে না

গতিভেদে সড়কে যানবাহন আলাদা করতে পারলে দুর্ঘটনা কমে আসবে

জনগণের প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ কাজ করছে মালিক-শ্রমিকদের স্বার্থে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]