আমনে দাম পাওয়ায় বোরো চাষে ঝুঁকেছেন কৃষক

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ০৬ মার্চ ২০২১
ধানের দামের কারণে এবার বোরো আবাদ বেশি হচ্ছে

গত বছর তিন বিঘা জমিতে বোরো আর বাকি আড়াই বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছিলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামের কৃষক এজাজুল মিয়া। এবার তিনি সবটুকু জমিতেই ইরি-বোরোর চাষ করেছেন। শেষ আমন মৌসুমে বাম্পার ফলনের মধ্যে ধানের চড়া দাম পেয়ে আগ্রহটা বেড়েছে তার।

এজাজুল মিয়া বলেন, ‘হাটে এখনো ধানের দাম ভালো যাচ্ছে। আবার বোরো আবাদে সরকার থেকে তিন কেজি বীজ পেয়েছি। সব মিলিয়ে এবার ধানই করেছি শুধু; ভালো দাম পাওয়ার আশায়।’

শুধু মান্দায় নয়, ‘শস্যভান্ডার’খ্যাত নওগাঁসহ সারাদেশে এ বছর বোরোর আবাদ বেশ বেড়েছে। কৃষকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারাও বলছেন, চালের চড়া দামের প্রভাব পড়েছে ধানচাষে। আমনে দাম পাওয়ায় বোরো চাষে ঝুঁকেছেন অধিকাংশ কৃষক

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামছুল ওয়াদুদ জাগো নিউজকে জানান, নওগাঁ জেলায় এরই মধ্যে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পেরিয়ে গেছে। জেলায় এ মৌসুমে এক লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত এক লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো রোপণ হয়েছে। ফলে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা ১০৩ শতাংশ।

তিনি বলেন, এখন জেলায় কিছু সরিষা ও গমের জমি তৈরি হচ্ছে। যেখানে বোরো লাগানোর জন্য বীজতলা রয়েছে। সার্বিকভাবে এ বছর বোরোর আবাদ নতুন রেকর্ডের দিকে যাচ্ছে।

শামছুল ওয়াদুদ আরও বলেন, এখনো নওগাঁর বাজারে মোটা ধানের দাম মণপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকা। আর মাঝারি ও সরু ধান দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যাচ্ছে, যা সর্বোচ্চ। ধানের দামের কারণেই এবার বোরো আবাদ খুব বেশি হচ্ছে।

Paddy-3.jpg

সারাদেশে বোরো রোপণ এখনো শেষ হয়নি

নওগাঁর মতোই সারাদেশে বোরো রোপণ এখনো শেষ হয়নি। কিছু এলাকায় কৃষকেরা বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলে জমিতে রোপণ করছেন। কেউ কেউ অন্য ফসল উঠিয়ে জমি প্রস্তুতে ব্যস্ত। এখনো এক-দুই সপ্তাহ বোরো রোপণ চলবে এলাকাভেদে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রধান কার্যালয় খামারবাড়ির তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা রয়েছে ৪৮ লাখ ৫২০ হেক্টর জমিতে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত ৪৭ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্ভাব্য খাদ্যসঙ্কট মোকাবিলায় কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’ এমন ভাবনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ কারণে প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে বীজ ও সার সহায়তা পাচ্ছে কৃষক। পাশাপাশি চলতি বোরো মৌসুমেও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বোরো ধানবীজে কেজিপ্রতি ১০ টাকা হারে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

অবশ্য, গত আউশ ও আমন মৌসুমে করোনা মহামারির চরম বিরূপ পরিস্থিতি এবং ঘূর্ণিঝড়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হয়নি।

জানা গেছে, সমাপ্ত আমন মৌসুমে এবার ৫৬ লাখ ২৫ হাজার টন আমন ধান উৎপাদন হয়েছে। এ বছর আমন (রোপা ও বোনা আমন) আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে। পাশাপাশি চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে আউশের আবাদ হয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৪ লাখ ৫১ হাজার টন। সব মিলিয়ে গত কৃষিবছরের তুলনায় এবার দেশে ১০ লাখ ৫০ হাজার টন ধান কম উৎপাদিত হয়েছে। ফলে বাজারে উদ্বৃত্ত চাল নেই।

এ অবস্থায় সম্ভাব্য খাদ্যঘাটতি কমাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি হচ্ছে। সেটা মাত্রাতিরিক্ত হলে বোরো ধানের বাজারেও প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান।

Paddy-3.jpg

এবার নতুন রেকর্ডের দিকে যাচ্ছে বোরো আবাদ

তিনি বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তাতে কৃষক বোরো চাষ করে ভালো দাম পাবে। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দশ লাখ টন চাল আমদানি হচ্ছে। সেটা এর চেয়ে বেশি বা মাত্রাতিরিক্ত হলে তার প্রভাব আবার আসন্ন বোরো ধানে পড়বে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দুই মাস পরেই বোরো ধান বাজারে আসবে। তাই আমদানির ক্ষেত্রে সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কারণ দামের কারণে কৃষকের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, দাম হারালে তারা সেটা হারিয়ে ফেলবে।

দেশে ধানের আবাদের পরিমাণ ও ফলন সবচেয়ে বেশি হয় ইরি-বোরো মৌসুমে। দেশের মোট চালের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন হয় এ মৌসুমে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে আমন ও আউশ। তবে অধিক মাত্রায় সেচে খরচ ও ধান বিক্রিতে কম মুনাফার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বোরো উৎপাদনে আগ্রহ হারায় কৃষকরা। আর সর্বাধিক বিনিয়োগের এ ফসলের দাম পড়ে গেলে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

আগে চালের উৎপাদন সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বরাবরই কম হতো। তবে দাম ও ফলন ভালো হওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টেছে এ বছর। ফলে দাম পাওয়ার বিষয়ে সরকারকে অত্যন্ত যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষিবিদ ও গবেষকরা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বোরো লাগানোর পরে ব্যবসায়ীরা এলসির চাল এনে বাজার সয়লাব করবে। তখন ধানের দাম কমে যেতে পারে। সরকারের উচিত আরও চাল আমদানির প্রয়োজন থাকলে সেটা নিজেরা করা। ব্যবসায়ীদের ওপর ভরসা করলে কৃষক মরবে।

এনএইচ/এমএসএইচ/এইচএ/এমএস

বোরো লাগানোর পরে ব্যবসায়ীরা এলসির চাল এনে বাজার সয়লাব করবে। তখন ধানের দাম কমে যেতে পারে। সরকারের উচিত আরও চাল আমদানির প্রয়োজন থাকলে সেটা নিজেরা করা। ব্যবসায়ীদের ওপর ভরসা করলে কৃষক মরবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]