নৌপথেই অর্থনীতির নয়া ভিত গড়ছে সরকার

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৩১ এএম, ১৬ মার্চ ২০২১

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশের নৌ-ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, নদী দখলমুক্তকরণ প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের। সরকার নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে এবং নৌপথকে যুগোপযোগী করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে দাবি তার।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন খালিদ মাহমুদ। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ: নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার দু’বছর পার করলেন। কেমন দেখলেন বাংলাদেশের নদীগুলো?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: বাংলাদেশের নদীগুলো ভালো আছে, তা বলা যাবে না। অনেক নদী হারিয়ে গেছে। অনেক নদীর নাব্যতা কমে গেছে। প্রবাহ নেই। অনেক নদীই দখলে চলে গেছে। নদীর পানি দূষণ বেড়েছে।

নদীগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে এই জনপদের মানবজীবনও প্রভাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভালো নেই নদীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই। অতীতের সরকারগুলোও এর জন্য দায়ী।

জাগো নিউজ: অতীতের সরকারে (বর্তমানে ক্ষমতাসীন) আওয়ামী লীগও তো ছিল...

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: স্বাধীনতার পরেই বঙ্গবন্ধু নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে তাগিদ দেন। বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করা হয়। মোংলার পশুর নদীর চ্যানেলে বঙ্গবন্ধু নিজে গিয়ে ড্রেজিং উদ্বোধন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই চ্যানেল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে আবার নতুন করে ড্রেজিং শুরু হয়।

জেনারেল জিয়া, এরশাদ এমনকি খালেদা জিয়া (তাদের ক্ষমতাকালে) নদী ব্যবস্থাপনায় কোনো উদ্যোগ নেননি। তাদের সময় নদী ব্যবস্থাপনা ছিল না বলেই সম্ভাবনাময় একটি দেশ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তারা বিদেশি সাহায্যনির্ভর মনোবৃত্তি নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। তারা নিজেদের উন্নয়ন করেছেন।

রেলপথ এবং নৌপথ হচ্ছে সাশ্রয়ী। অথচ তারা এই দুই পথে কোনো উন্নয়ন করেননি। বরং সংকুচিত হয়েছে। ওই সরকারগুলো সড়কে পরিবহন নামানোর সমস্ত আয়োজন করে। সড়কপথে গাড়ির ব্যবসা গড়ে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই দেশ পরিচালনা করেছে।

জাগো নিউজ: আওয়ামী লীগও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায়। সড়কপথে গাড়ির ব্যবসা এখনো হচ্ছে…

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পুরো দেশটাকে মাকড়সার জালের মতো জট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কেবল নৌ বা রেলপথই না।

মনে রাখতে হবে এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী একটি জনগোষ্ঠী সবসময় সক্রিয় ছিল এবং তারা বিত্তবান। বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এর বাস্তব রূপ দিতে চেয়েছিল তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা ১২ বছরে কী করলাম? বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৮০টির মতো ড্রেজার সংগ্রহ করেছেন নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে। প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর ময়লা অপসারণ করা হচ্ছে। অর্থনীতির গতি বাড়াতেই ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ তৈরি হচ্ছে। বন্ধ নৌপথগুলো চালু করা হচ্ছে। নতুন পথ তৈরি করা হচ্ছে। এটি আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার।

বঙ্গবন্ধু ১৯টি সমুদ্রগামী জাহাজ সংগ্রহ করেছিলেন। ২০০৮ সালের আগে মাত্র দুটি ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১টি জাহাজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এসব থেকেই কিন্তু আপনি আমাদের সরকারের নদী নিয়ে পরিকল্পনার বিষয় অনুমান করতে পারছেন।

জাগো নিউজ: কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার সড়কপথের যে উন্নয়ন করে চলছেন, তার তুলনায় নৌপথ বা রেলপথের উন্নয়ন নিয়ে কী বলবেন?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: আপনি ঢাকার সদরঘাটে যান। সেখানকার নৌপথের উন্নয়ন লক্ষ্য করতে পারবেন। পদ্মাসেতু, মেট্রো রেল বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের মধ্যেই সরকার উন্নয়ন সীমাবদ্ধ রাখেনি। সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটছে সমানতালে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তায় যে উন্নয়ন ঘটছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায় ঈর্ষণীয় বলে মনে করি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পতেঙ্গা টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রফতানি করা হচ্ছে। সকল অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কক্সবাজারে মাতারবাড়ী গভীর সুমদ্রবন্দর হচ্ছে। মোংলা বন্দর প্রায় বন্ধ হয়েছিল। সেটির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এই সমুদ্রবন্দরের বহির্ভাগে প্রায় একশ’ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে, যা ঐতিহাসিক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরেও ড্রেজিং করা হচ্ছে। মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেলপথ যুক্ত হচ্ছে। নতুন ইয়ার্ড তৈরি হচ্ছে। এটি তো একটি মাইলফলক। চট্টগ্রাম বন্দরের সমকক্ষ হচ্ছে মোংলা বন্দর। পায়রা বন্দর হচ্ছে। এই বন্দর ঘিরে ব্যবসায়ের নতুন দ্বার উম্মোচিত হচ্ছে।

নদী-সুমদ্রপথেই অর্থনীতির নয়া ভিত গড়ছে সরকার। যা গত ১২ বছরে প্রমাণ মিলছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথ ড্রেজিং করে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ৯৫ ভাগ পণ্য পরিবহন হয় নদী-সুমদ্রপথে। করোনা মহামারির মধ্যে সমস্ত পথ বন্ধ থাকলেও নৌপথ কিন্তু বন্ধ হয়নি।

জাগো নিউজ: আপনি সড়কপথে পরিবহন ব্যবসার কথা বলছিলেন। এখনো কি এই ব্যবসায়ীরাই নৌপথ, রেলপথের উন্নয়নের অন্তরায়?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: নেতৃত্ব একটি বড় বিষয়। দেশে যদি সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং যোগ্য নেতৃত্ব থাকে, তখন কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল সুবিধা করে উঠতে পারে না। তখন তাদের এক প্রকার প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হয়। যারা এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না, তারা হারিয়ে যাবে। নৌপথ, রেলপথ, আকাশপথ এবং সড়কপথের মধ্যে সরকার সমন্বয় করছে। বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে আমরা বিশ্ববাজারেও প্রতিনিধিত্ব করতে পারব না।

জাগো নিউজ: ঢাকা ঘিরে নদীপথে ওয়াটার বাস পরিচালনা মুখ থুবড়ে পড়ল। অথচ, মানুষের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। অভিযোগ আছে সড়ক পরিবহন মালিকদের কাছেই জিম্মি এই পরিকল্পনা।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: ওয়াটার বাস চালু আছে। তবে নদীর পানি দূষণের কারণে ওয়াটার বাসে যাত্রী যেতে চায় না। দূষণমুক্ত করার জন্য আমরা নানা পরিকল্পনা নিয়েছি।

জাগো নিউজ: নদী দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা বহু আগের।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: সরকার ইতোমধ্যেই নদী দখলমুক্ত করছে। ওয়াসার সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়েছে। (তরল বর্জ্য) শোধনাগার বসাতে বাধ্য করা হচ্ছে কারখানাগুলোকে। নইলে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে কারখানা। এই প্রশ্নে ছাড় নয়। শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কঠোরভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে ইটিপি (তরল বর্জ্য শোধনাগার) বসাতে।

জাগো নিউজ: ঢাকার চারটি নদীর তীর ঘেঁষে ওয়াক ওয়ে (পায়ে হাঁটার রাস্তা) নির্মাণের উদ্যোগ নিলেন। বাস্তবায়ন নিয়ে কী বলবেন?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: আমরা প্রথমত নদীগুলো দখলমুক্ত করার চেষ্টা করছি। বলতে পারেন শতকরা ৯০ ভাগ দখলমুক্ত করতে পেরেছি। সীমানা পিলার দেয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। পায়ে হাঁটার রাস্তা তৈরি করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দখলমুক্ত করে সীমানা প্রাচীর দেয়া হচ্ছে।

জাগো নিউজ: সীমানা পিলারের মধ্যে দখলবাজদের স্থাপনা রয়েছে এখনো...jagonews24মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্প এলাকা

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: স্থাপনা সরাতে অনেকেই সময় নিয়েছে। আদালত থেকেও কেউ কেউ সময় নিয়েছে। সরকার তো আগ্রাসী নীতি অবলম্বন করতে পারে না। সময় দিতে হয়। মানুষের কল্যাণেই সরকার। আমরা তাদের সুযোগ দিচ্ছি। মানুষ সহায়তাও করছে।

জাগো নিউজ: নদী দখল করা হয় রাজনৈতিক শক্তির বলেই। দখলমুক্ত করতে গিয়ে এই চাপ কীভাবে সামলাচ্ছেন?jagonews24সব স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতু

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: যে কোনো অভিযানেই চাপ থাকে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আইন বলে অভিযান পরিচালনা করে থাকেন।

নদী দখলের পেছনে জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার সরকারের রাজনীতি ছিল। ফলে দখলমুক্ত করতে গেলে রাজনৈতিক চাপ আসবেই। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার যে কোনো চাপকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক শক্তির বলে নদী দখলে রাখবে, এই অবস্থা দেশে আর নেই।

জাগো নিউজ: নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে আন্তঃনদী সংযোগ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। ফেনী নদীর পানি নিচ্ছে ভারত। তিস্তার পানি অধরাই রয়ে গেল...jagonews24করোনাকালে সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও চালু ছিল নৌপথ

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: তিস্তা নদীর পানি চুক্তি আমাদের ব্যর্থতার কারণে যে হয়নি, তা নয়, এটি ভারতের ব্যর্থতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বাধার কারণে চুক্তি হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার বারবার চেষ্টা করেছে। আমরা সফল বলেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী (নরেন্দ্র মোদি) এই চুক্তি করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন

জাগো নিউজ: শেষ বিচারে তিস্তা চুক্তি হয়নি...

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: পানি পাইনি, এটি সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার মতো কথা। আমাদের কূটনৈতিক চেষ্টায় ত্রুটি ছিল কি-না, সেটা আগে বিবেচনা করা দরকার।jagonews24শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে এভাবেই খাঁ খাঁ করে তিস্তা নদী

তবে হ্যাঁ, নদীর পানি আমাদের অধিকার। ভারত এই অজুহাত দিলে হবে না যে, পশ্চিমবঙ্গের সরকার চাইছে না বলে চুক্তি হচ্ছে না। তিস্তার পানি আমাদের দিতে হবেই। এটি দয়া নয়, আমাদের অধিকার

ভারতের সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক কালো হতে পারে না।

এএসএস/এইচএ/জেআইএম

জেনারেল জিয়া, এরশাদ এমনকি খালেদা জিয়া (তাদের ক্ষমতাকালে) নদী ব্যবস্থাপনায় কোনো উদ্যোগ নেননি। নদী ব্যবস্থাপনা ছিল না বলেই সম্ভাবনাময় একটি দেশ মুখ থুবড়ে পড়েছিল

অর্থনীতির গতি বাড়াতেই ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ তৈরি হচ্ছে। বন্ধ নৌপথগুলো চালু করা হচ্ছে

৯৫ ভাগ পণ্য পরিবহন হয় নদী-সুমদ্রপথে। করোনা মহামারির মধ্যে সমস্ত পথ বন্ধ থাকলেও নৌপথ কিন্তু বন্ধ হয়নি

শেখ হাসিনার সরকার যে কোনো চাপকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক শক্তির বলে নদী দখলে রাখবে, এই অবস্থা দেশে আর নেই

ভারত এই অজুহাত দিলে হবে না যে পশ্চিমবঙ্গের সরকার চাইছে না বলে চুক্তি হচ্ছে না। তিস্তার পানি আমাদের দিতে হবেই। এটি দয়া নয়, আমাদের অধিকার

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]