মালিটোলার ভাগাড় এখন নান্দনিক পার্ক

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৭:১২ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২১

পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডে ২৪ কাঠা আয়তনের একটি পরিত্যক্ত জায়গা ছিল আবর্জনার ভাগাড়। ওই ভাগাড়ের ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠেছিল ট্রাক-পিকআপ স্ট্যান্ড। দিন-রাত সেখানে চলতো মাদকসেবীদের আড্ডা। সেই নোংরা জায়গাটিকে নান্দনিক পার্কে রূপ দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পার্কটির নাম ‘মালিটোলা পার্ক’।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, সংস্থাটির ‘জল-সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় তিন কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্কটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পার্কে নাগরিকদের জন্য পানির ফোয়ারা, কফি শপ, নারী-পুরুষদের জন্য পৃথক টয়লেট, হাঁটাচলার পথ, গ্রিন জোন (ফুলের বাগান), ওভারপাস, বসার বেঞ্চ, এলইডি লাইটিং, শিশুদের জন্য আলাদা খেলার জায়গা, লেডিস কর্নার, পানি নিষ্কাশনে আরসিসি ড্রেনেজ সিস্টেম, মিনি এসটিএসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া পার্কের দক্ষিণ পাশের রাস্তা ও তাঁতীবাজার ইন্টারসেকশনের রাস্তার উন্নয়ন করা হয়েছে। এখন পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

jagonews24পুরো পার্ক এলইডি বাতির আলোয় আলোকিত

এমন আধুনিক পার্ক পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন পুরান ঢাকার বাসিন্দরা। তারা জানান, পুরান ঢাকা খুবই ঘিঞ্জি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেয়ার তেমন সুযোগ নেই। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্যও নেই তেমন কোনো মাঠ-পার্ক। মালিটোলা পার্কটি আধুনিকায়ন করায় তারা সেই সুযোগ পেয়েছেন। এ জন্য করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তারা।

ডিএসসিসির প্রকৌশল দফতর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের জুনে ডিএসসিসির ৩১টি পার্ক এবং মাঠ আধুনিকায়নে ‘জল-সবুজে ঢাকা’ শীর্ষক প্রকল্পটি নেয়া হয়। পরে ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মালিটোলা পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০১৮ সালের ২০ জুন পার্কটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও নকশা পরিবর্তনসহ নানা কারণে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আবার পার্কটির আধুনিকায়নের কাজ আটকে যায়। সবশেষ গত ৭ এপ্রিল মালিটোলা পার্কটির উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।

পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে তাঁতীবাজার যেতে ইংলিশ রোডে হাতের বাঁ পাশে মালিটোলা পার্ক। গত ৮ এপ্রিল রাত ৯টায় সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো পার্ক এলইডি বাতির আলোয় আলোকিত। পার্কের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত স্পষ্ট সবাইকে দেখা যায়। এমন মিষ্টি আলোতে বসে গল্প করছিলেন আগতরা। তাদের সঙ্গে ছিল শিশু-কিশোরের দলও। তারা পার্কের ভেতর আনন্দ-উল্লাস, খেলাধুলা ও দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ কেউ পার্কের গাছের সঙ্গে ছবি তুলছেন এবং ভিডিও করছেন। পার্কের চারপাশে হাঁটাচলা (ব্যায়াম) করছেন মধ্য ও বয়স্ক লোকজন। এভাবে রাত ১১টা পর্যন্ত পার্কে অনেককে অবস্থান করতে দেখা যায়।

jagonews24পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের অবসর কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছে মালিটোলা পার্ক

তাঁতীবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা সুকুমার রায়। স্ত্রী ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে পার্কে ঘুরতে এসেছেন তিনি। আলাপকালে সুকুমার রায় বলেন, পার্কটি উদ্বোধনের পর পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকার মানুষ এখানে এসে হাঁফ ছেড়ে শ্বাস নিচ্ছেন। সকাল-দুপুর-রাত সারাক্ষণই জায়গাটা লোকে লোকারণ্য থাকে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা চুরি-ছিনতাই না থাকায় অনেকেই মধ্যরাত পর্যন্ত পার্কে ঘোরাঘুরি করেন।

তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে মালিটোলা পার্কের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পরে সেখানে ময়লার ভাগাড় ও ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। এখন সিটি করপোরেশন পার্কটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনায় তাদের প্রতি এ এলাকার মানুষ কৃতজ্ঞ।

রায়সাহেব বাজার থেকে পার্কে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন আবিদ হাসান ও সানজিদা সুলতানা দম্পতি। আবিদ বলেন, পার্কটি উদ্বোধনের পর থেকেই এলাকার মানুষের মুখোমুখি এর সুনাম ছড়িয়েছে। তাই পরিবার নিয়ে পার্কে ঘুরতে এসেছি। পার্কের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে।

jagonews24মালিটোলা পার্ক ফিরে পেয়েছে তার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য

পার্কটির আধুনিকায়নে কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচআরডিআই কনস্ট্রাকশন এবং নওয়াব এন্টারপ্রাইজ (জেবি)। নওয়াব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমিনুল হক বিপ্লব বলেন, ‘এই পার্কের আধুনিকায়নের যে নকশা তা নির্ধারণ করে দিয়ে গিয়েছিলেন সংস্থাটির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। সে অনুযায়ী পার্কটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এই কাজ বাস্তবায়নে ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনেক সহযোগিতা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই বছর আগে মালিটোলা সংলগ্ন সিক্কাটুলি পার্কের কাজটিও তিনি করেছেন। কিন্তু পার্কটি উদ্বোধনের পরপরই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এখন মালিটোলা পার্কটি উদ্বোধনের পর তা সংশ্লিষ্ট দফতরকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো পার্কে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেয়নি। পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণ না করলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর সার্কেল) মুন্সি মো. আবুল হাসেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি আধুনিক পার্কে যেসব বিষয় থাকা দরকার তার সবটুকুই রাখা হয়েছে। ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস পার্কটি পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। স্থানীয়রাও এমন নান্দনিক পার্ক পেয়ে অনেক খুশি। এখন পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে ডিএসসিসি।’

এমএমএ/এমএসএইচ/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]