রাবিতে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক নয়, সাক্ষাৎকারে উপাচার্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৫ পিএম, ০৩ মে ২০২১

 অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য। এই পদে তার দায়িত্ব পালনের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৬ মে (বৃহস্পতিবার)। ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে জাগো নিউজের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, শিক্ষা-গবেষণার নানা অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন নিয়োগকেন্দ্রিক জটিলতা, অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়েও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজশাহী প্রতিনিধি ফয়সাল আহমেদ

জাগো নিউজ: দু’বার দায়িত্ব পালন করলেন পূর্ণ মেয়াদে, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিহাসও বটে। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির জায়গা নিয়ে কী বলবেন?

ড. এম আব্দুস সোবহান: বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের মর্যাদাপূর্ণ আসনে আমাকে দুইবার আসীন করেছেন, এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সর্বোপরি মহান আল্লাহ পাকের দরবারে অসীম শুকরিয়া। দুইবার উপাচার্য হওয়ার নজির বাংলাদেশে আরও আছে। কিন্তু আমার বেলায় ব্যতিক্রম হলো একবার পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর চার বছর গ্যাপ দিয়ে আবার দায়িত্ব পাওয়া। এটি নজিরবিহীন। এদিক দিয়ে নয়া ইতিহাসও বটে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা বলতে গেলে এ দুইয়ের মধ্যে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

জাগো নিউজ: আপনার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ কোনো অগ্রগতি, যা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?

ড. এম আব্দুস সোবহান: ২০০৯ থেকে ২০১৩ এবং ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল—এই দুইপর্বে আমি আমার মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা এবং দেশপ্রেম যতটা আমার আছে, তার পুরোটাই নিবেদন করেছি কর্মসম্পাদনে। কতটা সফল হয়েছি সে বিচারের ভার তো আপনাদের। ভৌত অবকাঠামোগত অগ্রগতি, পঠন-পাঠন, গবেষণা, ক্রীড়া, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো রাবিতে ডিজিটাল আর্কাইভস প্রতিষ্ঠা, ৫০ বছরের মাস্টারপ্লান প্রণয়ন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছি। তাছাড়া শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু কর্নার এবং মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। অগ্রগতির তালিকা তৈরি করলে বেশ দীর্ঘ হবে। স্বশরীরে কেউ রাবি ক্যাম্পাসে এলে অগ্রগতির নিদর্শন তার চোখে পড়বেই।

অগ্রগতির তো কোনো শেষ নেই। তবে আমি আমার কাজে তৃপ্ত। এখানে উল্লেখ করা একান্ত প্রাসঙ্গিক যে, ২০১০ সালে গবেষণায় রাবির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ এবং ২০১৯ সালে রাবি সামগ্রিকভাবে গবেষণায় বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছে (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা কোপাস-এর জরিপ)। ২০২০ সালে বিশ্বের এক লাখ ৫৯ হাজার ৬১২ জন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর তালিকায় রাবির একজন শিক্ষক ২৮৪তম স্থান অর্জন করেছেন। ২০২১ সালে স্পেনের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমাগো ইনস্টিটিশন কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪১২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রাবির অবস্থান ১১তম (জরিপকাল ২০১৫-২০১৯)।

Inner-3.jpg

অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান

জাগো নিউজ: অপ্রাপ্তির প্রশ্নে কী বলবেন?

ড. এম আব্দুস সোবহান: প্রত্যাশা যদি সীমাহীন হয় তবে অপ্রাপ্তি সেখানে থাকবেই। আমার চাওয়া, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা সীমাহীন নয়। যতটা চেয়েছি তার শতভাগ পূরণ না হলেও খুব কাছাকাছি। তাই আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। আকাশচুম্বি প্রত্যাশা থাকলে মৃত্যুটি হবে অতৃপ্তির।

জাগো নিউজ: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম কাজ শিক্ষা-গবেষণা। গবেষণা নিয়ে বিতর্ক আছে। আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে আপনার উপলব্ধি কী?

ড. এম আব্দুস সোবহান: হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম কাজ শিক্ষা এবং গবেষণা। গবেষণা নিয়ে বিতর্ক বলতে—এর মান নিয়ে বিতর্ক। এটা ছিল, আছে এবং থাকবে। উৎকর্ষতার কি কোনো শেষ আছে? বরাদ্দ কম বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত নই। নিবেদিতপ্রাণ গবেষকরা বরাদ্দের দিকে নির্ভর করে গবেষণা করেন না। তাছাড়া বর্তমানে শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় শিক্ষাখাতে বিশেষ করে গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছেন। তাই ভালো গবেষণা করতে চাইলে অর্থের অভাব হবে না।

জাগো নিউজ: শিক্ষক রাজনীতি করার দায়ে জেল খেটেছেন। শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন। খোদ সরকারপন্থিরাও নানা ভাগে বিভক্ত। কী বলবেন এ রাজনীতি নিয়ে?

ড. এম আব্দুস সোবহান: শিক্ষকরা ফুলটাইম রাজনীতিবিদ নন এবং হওয়া উচিতও নয়, যতক্ষণ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তবে প্রতিটি নাগরিকের মত শিক্ষকেরও একটি রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ থাকবে। আমার রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দর্শন। আর আমার আদর্শ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সুযোগ্যতম কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সেই ১৯৬৯ সালে আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী—শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হয়ে তৎকালীন সারা পূর্ব-পাকিস্তানে ৬ দফার সমর্থনে জনসভা করে চলেছিলেন। তখন তাকে দেখেছি এবং তার আদর্শকে ধারণ করেছি।

জেল খাটার বিষয়টি ১/১১ অর্থাৎ ২০০৭ সালের। জননেত্রীকে অন্যায়ভাবে জেলে নেয়া হলো। আমি তখন রাবির প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের নির্বাচিত আহবায়ক। আমার নেতৃত্বে জননেত্রীর মুক্তির আন্দোলন করা হয়। সুতরাং তৎকালীন সরকার আমাকে গ্রেফতার, রিমান্ড এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারে ১০৪ দিন কাটে। তবে এই জেল খাটা আমার জীবনের গর্ব ও অহংকার। শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন—তার কারণ শিক্ষকদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ফুলটাইম রাজনীতিকের মতো, তবে সে রাজনীতি কদর্যতাপূর্ণ। আপনি বলছেন খোদ সরকারপন্থি শিক্ষকরাও নানাভাবে বিভক্ত। হ্যাঁ এটি সত্য, তবে এর কারণ উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার বেদনা।

জাগো নিউজ: জামায়াত-শিবিরের দুর্গ বলে পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি প্রথমবার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এ শক্তির রাজনীতিতে ভাটা পড়ে। এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে কী বলবেন?

ড. এম আব্দুস সোবহান: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দুই দশকের অধিক সময় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকার দেশ শাসন করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদিকে গ্রাম। ফলে সেসময়ের সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত-শিবিরের উত্থানের উৎকর্ষ চারণভূমিতে পরিণত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের রাজনীতি ক্যাডারভিত্তিক, চেইন অব কমান্ড খুব মজবুত। পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিভক্তি নেই। প্রথমবার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাবিতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। পরিস্থিতির উত্তরণে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পাই। এছাড়া স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধপন্থি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারী এবং আশপাশের প্রগতিশীল জনগণ পরিস্থিতির উত্তরণে ভূমিকা পালন করেছেন। বৎসরাধিকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আছে। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলার উপকরণ নেই। শূন্য ক্যাম্পাসে ভালো থাকা কি ভালো?

Inner-3.jpg

ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

জাগো নিউজ: আপনার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)...

ড. এম আব্দুস সোবহান: ইউজিসির তদন্ত একপেশে-পক্ষপাতমূলক। যে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি, সেগুলি আমলযোগ্য কিনা সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রধানতম দুইজনের বিরুদ্ধে লক্ষ ও কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে রাবি প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। তদন্তকাজে উভয়েই অসহযোগিতা করেছেন। উপরন্তু তাদের মধ্যে একজন উচ্চ আদালতে রিট করে তদন্ত কাজ স্থগিত করিয়েছেন। এই যে আর্থিক দুর্নীতির জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, এইটিই বর্তমান প্রশাসনের জন্য কাল হয়ে গেল। তখন থেকেই ওই দুইজন এবং তাদের কয়েকজন অনুসারী মিলে আমার বিরুদ্ধে খোঁড়া অভিযোগ ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে থাকে।

খোঁড়া অভিযোগের মূল হলো শিক্ষক নিয়োগে নিম্নমানের (তাদের ভাষায়) নীতিমালা প্রণয়ন। যে কোনো নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন রাবি অ্যাক্ট-১৯৭৩ অনুসরণ করে সকল প্রক্রিয়া সম্পাদন শেষে সিন্ডিকেট কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। উপাচার্যের এককভাবে এখানে কিছু করার নেই। তদুপরি ২৫ অক্টোবর ২০২০ সালে আমি সব মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে দুই ঘণ্টাব্যাপী সম্মেলন করেছি এবং সকল প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিয়েছি। আমি আমার অবস্থান সরকার ও দেশবাসীর নিকট পরিষ্কার করেছি। অধিকন্তু আমি নিজে দাবি করেছি আমার বিরুদ্ধে কোনো রকম দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তদন্ত করতে।

জাগো নিউজ: নিয়োগে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে কী বলবেন?

ড. এম আব্দুস সোবহান: এ ব্যাপারে একটি ভূমিকা দেয়া দরকার। ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি আট বছরব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা বিশেষ করে কর্মচারী নিয়োগ হয়নি। প্রতিবছর অবসরজনিত কর্মচারী পদ শূন্য হয়। ফলে প্রশাসন, বিভাগ, হল ও অন্যান্য দফতর কর্মচারী স্বল্পতায় প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পাদনে নাকাল অবস্থায় পড়ে। ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে কর্মচারীর ২০০টি শূন্যপদ বিজ্ঞাপিত হয়। বহু সংখ্যক আবেদনকারীর লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে যখন মৌখিক পরীক্ষায় তাদের ডাকা হবে—সে সময় মহামারি করোনার হানা। ফলে মৌখিক পরীক্ষা সাময়িক বন্ধ রাখি। ডিসেম্বর ২০২০ এর শুরুর দিকে মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। হঠাৎ ১৩ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে ইমেইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সকল প্রকার নিয়োগের (প্রশাসনিক কারণে) স্থগিতাদেশটি আসে।

অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞা আসার পূর্বে ক্যাম্পাসে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা জোর চেষ্টা চালাচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা আনতে, যাতে আমার সময় কোনো নিয়োগ না হয়। অবশেষে গুঞ্জন বাস্তবে পরিণত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ একটি স্বাভাবিক চলমান প্রক্রিয়া। নিষেধাজ্ঞায় আমার কোনো অনুতাপ নেই। এরপর যিনি এই পদে আসবেন তাকে এই নিয়োগ দিতে হবে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে এই নিয়োগ না দেয়া পর্যন্ত নিত্যদিনের কার্যসম্পাদনে প্রশাসন মুখ থুবড়ে পড়বে। আমি মনে করি এই নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক নয়।

জাগো নিউজ: আপনার মেয়ে ও মেয়ের জামাইয়ের নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা আছে। এর জবাবে আপনার ব্যাখ্যা কী?

ড. এম আব্দুস সোবহান: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় উল্লিখিত যোগ্যতায় যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তি আবেদন করতে পারেন। আবেদন করলেই সবাই নিয়োগ পাবেন এমন তো নয়। কেননা এটি হলো আবেদন করার যোগ্যতা। পরে চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশ করে নিয়োগ নির্বাচনী বাছাই কমিটি (সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত)। আবেদনকারীরা এদেশের নাগরিক এবং প্রত্যেকেই এদেশের নাগরিকদের কারও পুত্র, কারও কন্যা, জামাই, বৌমা ইত্যাদি। যে যোগ্যতায় এদের নিয়োগ দেয়া হয় ঠিক একই যোগ্যতায় উপাচার্যের আত্মীয়-স্বজনের নিয়োগ হলে এটি কি অপরাধ? অভিযোগকারীদের অধিকাংশের একাডেমিক রেজাল্ট উপাচার্যের জামাই-মেয়ের রেজাল্টের অনেক নিচে। তাছাড়া বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োগ একমাত্র একাডেমিক রেজাল্ট নয়, তা যদি হতো তবে নিয়োগ নির্বাচনী বাছাই কমিটির প্রয়োজন হতো না।

জাগো নিউজ: বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজের জমি কেনাসহ সাবেক উপাচার্য ড. মিজান উদ্দীন প্রশাসনের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছিল। এখন কোন পর্যায়ে ?

ড. এম আব্দুস সোবহান: বিষয়টি ২০১৭ সাল থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তাধীন। দুদককে সহায়তা দেয়ার জন্য বর্তমান রাবি প্রশাসন সিন্ডিকেট কর্তৃক একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে এবং এই কমিটি ২৮৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ২০১৯ সালের ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি ইউজিসি, দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে।

Inner-3.jpg

সাম্প্রতিক এক আয়োজনে অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান

জাগো নিউজ: স্বায়ত্তশাসিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বাড়ছে বলে অনেকের অভিযোগ আছে, কী মনে করেন...

ড. এম আব্দুস সোবহান: বিষয়টি এমন নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। স্বায়ত্তশাসন একাডেমিক বিষয়, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব একাডেমিক কোর্স কারিকুলাম, শিক্ষা সহায়ক কারিকুলাম এবং শিক্ষাতিরিক্ত কারিকুলাম তৈরি করবে। কিন্তু আর্থিক বিষয়ে সরকারের আর্থিক নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে। ওই অ্যাক্টের কপি মন্ত্রণালয়ে আছে এবং এর আলোকে মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ব্যতিক্রম ভুলবশত হতে পারে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলবেন?

ড. এম আব্দুস সোবহান: বাংলাদেশে সামগ্রিক অর্থে শিক্ষার হার বেড়েছে-উচ্চ শিক্ষারও প্রসার ঘটেছে। এখন মান নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। ভালো বা মন্দ, এটিকে কোনো না কোনো মানদণ্ডে বিচার করে বলতে হয়। একটি ভালো, আরেকটি ভালো অপেক্ষা আরও ভালো, মন্দের বেলায়ও তাই। তাহলে কি প্রথম ভালোটি খারাপ? তা নয়। বিষয়টি আপেক্ষিক। অর্থাৎ চাওয়াটা হচ্ছে ভালোর উৎকর্ষের উন্নয়ন। আর এটা রাতারাতি হওয়ার বিষয় নয়।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। সেটি প্রণীত হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতা দখল করে, তারা খুদা-কমিশনের নীতিটিকেও হত্যা করে। এটা বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিকতায় দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় শিক্ষাক্ষেত্রেও উল্লেখ্যযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে। খুদা কমিশনের আলোকে ২০১০ সালে একটি বাস্তবধর্মী শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। একটি কল্যাণকামী সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। আমাদের দুর্ভাগ্যের মধ্যে সৌভাগ্য এটাই যে আমরা এরকমই একটি সরকার পেয়েছি, যার ধারাবাহিকতায় দেশ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা একান্ত প্রয়োজন। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের উচ্চশিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ নই।

ফয়সাল আহমেদ/এইচএ/এমএস

গবেষণা নিয়ে বিতর্ক বলতে—এর মান নিয়ে বিতর্ক। এটা ছিল, আছে এবং থাকবে। উৎকর্ষতার কি কোনো শেষ আছে? বরাদ্দ কম বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত নই। নিবেদিতপ্রাণ গবেষকরা বরাদ্দের দিকে নির্ভর করে গবেষণা করেন না

যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রধানতম দুইজনের বিরুদ্ধে লক্ষ ও কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে রাবি প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। তদন্তকাজে উভয়েই অসহযোগিতা করেছেন। উপরন্তু তাদের মধ্যে একজন উচ্চ আদালতে রিট করে তদন্ত কাজ স্থগিত করিয়েছেন। এই যে আর্থিক দুর্নীতির জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, এইটিই বর্তমান প্রশাসনের জন্য কাল হয়ে গেল

আবেদনকারীরা এদেশের নাগরিক এবং প্রত্যেকেই এদেশের নাগরিকদের কারও পুত্র, কারও কন্যা, জামাই, বৌমা ইত্যাদি। যে যোগ্যতায় এদের নিয়োগ দেয়া হয় ঠিক একই যোগ্যতায় উপাচার্যের আত্মীয়-স্বজনের নিয়োগ হলে এটি কি অপরাধ?

আমাদের দুর্ভাগ্যের মধ্যে সৌভাগ্য এটাই যে আমরা এরকমই একটি সরকার পেয়েছি, যার ধারাবাহিকতায় দেশ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা একান্ত প্রয়োজন। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের উচ্চশিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ নই

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]