বেশিরভাগ ব্যাংকের মুনাফায় উন্নতি, বেড়েছে সম্পদ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০৪ পিএম, ৩০ মে ২০২১

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ ব্যাংকের মুনাফায় উন্নতি হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সম্পদের পরিমাণ। প্রভিশনে ছাড় দেয়ার পাশাপাশি আদায় না করেই খেলাপি ঋণ কমাতে অবলোপনে (রাইট অফ) ছাড় দেয়ায় ব্যাংকের মুনাফায় এ উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত নানাবিধ সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ সেই সঙ্কট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে একপ্রকার স্থবিরতা নেমে এসেছে। ব্যাংকের আমানত কমে গেছে। সেই সঙ্গে ঋণ বিতরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়া কতটা বাস্তবসম্মত তা দেখা উচিত।

তারা আরও বলেন, করোনার কারণে অনেক ব্যাংকের প্রশাসনিক খরচ কমেছে। আবার সুদের হার কম হওয়ার কারণেও ব্যাংকের খরচ কমেছে। এছাড়া আগের বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ এখন আদায় হতে পারে। সেই সঙ্গে অবলোপন ও প্রভিশনে ছাড় দেয়া হয়েছে। এসব মুনাফা বাড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তারপরও ব্যাংকগুলোর দেখানো মুনাফা মেনুপুলেট কিনা দেখা উচিত।

নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাস পর পর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। এরই আলোকে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৫টি চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা নিয়ম অনুযায়ী স্টক এক্সচেঞ্জেও পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ১৭টির মুনাফা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে ৭টির কমেছে।

সমস্যায় নিমজ্জিত আইসিবি ইসলামী ব্যাংক বরাবরের মতো লোকসানে রয়েছে। এখনো চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করা ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক এবং ইউসিবি।

চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় মুনাফা বাড়ার তালিকায় রয়েছে- এবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং সাউথইস্ট ব্যাংক।

এর মধ্যে গত বছরের তুলনায় মুনাফা প্রবৃদ্ধিতে সবার ওপর রয়েছে প্রাইম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা গত বছরের তুলনায় বেড়ে দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের তিন মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১ টাকা ৩৪ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৬ পয়সা।

মুনাফায় বড় ধরনের উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটির সম্পদের পরিমাণও বেড়ছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ টাকা ৩৫ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৫ টাকা ১১ পয়সা।

মুনাফার প্রবৃদ্ধিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময় ছিল ৮ পয়সা।

মুনাফার পাশাপাশি এই ব্যাংকটিরও সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ টাকা ৩৬ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩১ টাকা ৭২ পয়সা।

এর পরই রয়েছে নতুন তালিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এই ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ৪৪ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৯ পয়সা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ৫২ শতাংশ। মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়ার পাশাপাশি এ ব্যাংকটির সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৮২ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৪ টাকা।

এদিকে মুনাফা বাড়লেও দুটি ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কমেছে। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের ব্যবসায় মুনাফা করেছে ৬৪ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ৯ পয়সা। অপরদিকে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ টাকা ২১ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ টাকা ২৩ পয়সা।

মুনাফা বাড়লেও সম্পদ কমে যাওয়া আরেক ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এ ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৮১ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৭২ পয়সা। এ হিসাব ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ৯ পয়াস। বিপরীতে চলতি বছরের মার্চ শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদ দাঁড়িয়েছে ২৩ টাকা ৯৯ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ টাকা ২ পয়সা।

মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়া অন্য ব্যাংকের চিত্র-

ব্যাংকেরনাম

শেয়ারপ্রতি মুনাফা (টাকা)

শেয়ারপ্রতি সম্পদ (টাকা)

জানুয়ারি-মার্চ ২০২১

জানুয়ারি-মার্চ ২০২০

মার্চ ২০২১

মার্চ ২০২০

ব্র্যাক ব্যাংক

.৯৩

.৬৬

৩৬.২৪

৩১.৩৮

সিটি ব্যাংক

.৯৮

.৭৫

২৯.৩৮

২৯.০৩

ডাচ-বাংলা ব্যাংক

১.৬৫

১.৩৭

৬০.২৯

৫৮.৬৫

ইষ্টার্ণ ব্যাংক

১.২৮

১.০৩

৩৭.৬২

৩৩.০৮

এক্সিম ব্যাংক

.০৫

.০৪

২১.৭১

২০.৭১

আইএফআইসি

.৪৬

.৪৪

১৭.৫৭

১৬.৭১

ইসলামী ব্যাংক

.৪৫

.৪৩

৩৯.৩৩

৩৭.৩১

যমুনা ব্যাংক

১.৬০

১.৪২

৩১.৪২

২৪.৫০

ওয়ান ব্যাংক

.৮৪

.৭৯

২০.১৫

১৯.৩১

পূবালী ব্যাংক

.৯৮

.৮৬

৩৮.৬৫

২৮.৮০

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

.৬৫

.৬১

১৮.২৯

১৭.৪৬

সাইথইস্ট ব্যাংক

১.২২

.৯৬

২৬.২৫

২৭.২৮

এদিকে অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের থেকে বাড়লেও ব্যাংক এশিয়া, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং উত্তরা ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের তুলনায় কমেছে। তবে এই ব্যাংকগুলোর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে।

মুনাফা কমে যাওয়া ব্যাংকগুলোর চিত্র

ব্যাংকেরনাম

শেয়ারপ্রতি মুনাফা (টাকা)

শেয়ারপ্রতি সম্পদ (টাকা)

জানুয়ারি-মার্চ ২০২১

জানুয়ারি-মার্চ ২০২০

মার্চ ২০২১

মার্চ ২০২০

ব্যাংক এশিয়া

১.০৫

১.১৬

২২.৯৫

২২.৩২

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী  ব্যাংক

.৩২

.৬৬

১৯.২৪

১৬.৯০

আইসিবি ইসলামী ব্যাংক

শেয়ারপ্রতি লোকসান ১৫ পয়সা

শেয়ারপ্রতি লোকসান ৯ পয়সা

ঋণাত্মক ১৭ টাকা ৬৯ পয়সা

ঋণাত্মক ১৭ টাকা ২০ পয়সা

এনসিসি ব্যাংক

.৫৫

.৮২

২২.৪৬

২২.১৫

প্রিমিয়ার ব্যাংক

.০৬

.৫৫

২১.৬২

১৯.৯৩

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক

.৩৩

.৩৭

১৯.৬২

১৭.১১

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

.১৭

.৩৬

১৭.৩৫

১৬.৫৫

উত্তরা ব্যাংক

.৮৪

১.৩৪

৩৫.৫২

৩২.৫৫

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলো এখন খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো আমানত কম পাচ্ছে। আবার ঋণ বিতরণও কম হচ্ছে। এমন অবস্থায় ব্যাংকগুলো মুনাফা বাড়ার যে তথ্য দিয়েছে তা কতটা বাস্তবসম্মত দেখা উচিত।

তিনি আরও বলেন, সার্বিকভাবে ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়, তবে পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়েছে বলে আমি মনে করি না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, শেয়ারহোল্ডারদের খুশি করতে অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা বাড়িয়ে দেখায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ ব্যাংকের মুনাফা বাড়া আমার কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয় না। এ মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হতে পারে।

ব্যাংকের মুনাফা কি কি কারণে বাড়তে পারে তাও ব্যাখ্যা করেন সাবেক এই গভর্নর। তিনি বলেন, এখন সুদের হার কম হওয়ায় আমানতকারীদের কম মুনাফা দিতে হয়েছে। আবার ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন ও অবলোপনে ছাড় দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে অনেকের প্রশাসনিক খরচ কমছে। আগের বিতরণ করা কিছু ঋণ বর্তমান পরিস্থিতিতে আদায় হতে পারে। এসব মুনাফা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে বর্তমানে কোনো মামলা ছাড়া ব্যাংকগুলো দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপন করতে পারে। যেসব ঋণ নিকট ভবিষ্যতে আদায়ের সম্ভাবনা নেই এবং মন্দমানে খেলাপি হওয়ার অন্তত তিন বছর পার হয়েছে ব্যাংকগুলো তা অবলোপন করতে পারে। অবলোপন করে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের স্থিতি ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। ব্যাংকের স্থিতিপত্রে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। অবলোপন করা ঋণ যোগ করলে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।

আদায় না করেই ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ছাড় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার কারণে গত বছর কেউ ঋণ ফেরত না দিলেও খেলাপি না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তার আগে ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ৫২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।

এমএএস/এসএইচএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]