কাসেমী-ফারুকীর ‘স্বেচ্ছাচারিতায়’ গভীর সংকটে হেফাজত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০৭ পিএম, ৩১ মে ২০২১
মুফতি মনির হোসেন কাসেমী ও ইনামুল হাসান ফারুকী

হেফাজতে ইসলামের সাবেক অর্থ সম্পাদক ও রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, অর্থলিপ্সা এবং জুনায়েদ বাবুনগরীর খাদেম ইনামুল হাসান ফারুকীর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে গভীর সংকটে হেফাজতে ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে তারা হেফাজতে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন। এতে একদিকে তারা যেমন অঢেল অর্থ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের ঢাল হিসেবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে গত ২১ মে বারিধারা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তার বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতার একাধিক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের সহিংসতার ঘটনাতেও তিনি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠে।

শনিবার (২২ মে) তাকে চারদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। অপরদিকে শুক্রবার (২১ মে) রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেয়াবাদে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হন ইনামুল হাসান ফারুকী।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মনির হোসেন কাসেমী বারিধারা মাদরাসা দখল নিতে ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসানকে মাদরাসায় না আসার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। অথচ মাওলানা নাজমুল হাসানকে নুর হোসেন কাসেমী জীবদ্দশায় ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবে অসিয়ত করে যান। সরকারবিরোধীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বারিধারা মাদরাসা দখলে নিয়ে ভবিষ্যতে হেফাজতে ইসলাম ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই ছিল মনির হোসেন ও তার সহযোগীদের মূল লক্ষ্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনির হোসেনের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানান, মনির বারিধারা মাদরাসার গরিব, অসহায় ছাত্রদের ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য এবং গুলশান, বনানী, বারিধারার ধনাঢ্য ও দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা সংগ্রহ করেন। অথচ এ টাকার সিকিভাগও মাদরাসা ছাত্রদের পেছনে ব্যয় করেননি তিনি। চাঁদার টাকায় ঢাকার অভিজাত পাড়ায় গড়ে তুলেছেন আলিসান বাড়ি। ছাত্রদের নামে তোলা চাঁদার টাকায় আয়েশি জীবনযাপন করছেন তিনি। তিনি অতীতেও এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছেন। এরমধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর মাদরাসায় চাকরিকালীন কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মনির হোসেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার পরে তাদের সাহায্যার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দাতা সংস্থা অর্থ সাহায্য করে। মনির হোসেন কাসেমী ওই চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে রোহিঙ্গাদের পেছনে ব্যয় না করে নিজে আত্মসাৎ করেন।

এছাড়াও হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাঙালিসহ বিদেশিদের অনুদানকৃত অর্থও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার সংসদীয় আসন নারায়ণগঞ্জ-৪ থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে এ টাকার একটি বড় অংশ খরচ করেন মনির হোসেন।

এদিকে, জুনায়েদ বাবুনগরীর খাদেম ইনামুল হাসান ফারুকী একচ্ছত্রভাবে হাটহাজারী মাদরাসাসহ হেফাজতে ইসলামকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। ইনামুলের কূটকৌশলের কাছে জিম্মি হেফাজতের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরী। বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মসহ রাতারাতি বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক বনে গেছেন ইনাম। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এমনটিই জানান।

jagonews24মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে ২১ মে বারিধারা থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ

তারা জানান, হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত ইনামুল হাসান ফারুকী। বিভিন্ন উপায়ে ছাত্রদের উত্তেজিত করে বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালেন তিনি। মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার, দলাদলি ইত্যাদি কারণে ছাত্ররা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েন। হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালনা কমিটির বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যেন তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। এ কাজে তিনি কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাবুনগরীকে কব্জা করে। বাবুনগরীর চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে নিজেই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। যার কারণে অন্য কোনো খাদেম কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী বাবুনগরীর ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেন না। ইনামুল হাসানের কর্মকাণ্ডে হাটহাজারী মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষকসহ ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের প্রধান হলেও ইনামুল তাকে কৌশলে হেফাজতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করেন। অনেক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে হেফাজতের পদ পাইয়ে দেন। এছাড়া নিজে হাটহাজারীর বাসিন্দা না হয়েও হাটহাজারী পৌরসভা হেফাজতে ইসলামের সহকারী প্রচার সম্পাদক পদটি বাগিয়ে নেন তিনি। খাদেম ইনামুল হাসানের কর্মকাণ্ডে হেফাজতে ইসলামের গ্রেফতার করা নেতৃবৃন্দসহ ইসলামি অঙ্গনে ক্ষোভ রয়েছে। হেফাজতের বিস্তৃতি দেশব্যাপী হলেও এর নেতৃবৃন্দ কেউ সরাসরি বাবুনগরীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। যা নিয়ে হেফাজতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিরক্ত ও বাবুনগরীকে দোষারোপ করেন। এতে বাবুনগরীর ইমেজ দিন দিন চরম সংকটের মধ্যে পতিত হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা আরও জানান, নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান ইনামুল হাসান ফারুকী। তার বাবার বিরুদ্ধে রয়েছে চেক জালিয়াতির অভিযোগ। অথচ বাবুনগরী হাটহাজারী মাদরাসায় সর্বেসর্বা হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ইনামুলের নিজ বাড়িতে বিশাল পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন উৎস থেকে একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য বাবুনগরীর নাম ভাঙিয়ে তিনি নগদ অর্থ, তার বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেন। এছাড়া ব্যক্তিগত ও আত্মীয়-স্বজনদের নানা সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিতে বাবুনগরীকে দিয়ে বিভিন্ন মহলে তদবির করান।

সম্প্রতি ইনামুল ঘটা করে তার বিয়ের উৎসব করেন। বিয়েতে দু’টি হেলিকপ্টার ভাড়া করেন তিনি। হেলিকপ্টারে অতিথি আনা-নেয়া করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে খরচ করেছেন লাখ লাখ টাকা। বিয়ে করেছেন কুয়েতপ্রবাসী কনেকে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বিয়ের মাধ্যমে কনের বাবার অর্থ সম্পদ করায়ত্ত, এবং বাংলাদেশি টাকা কুয়েতে পাচার করা ইনামুলের উদ্দেশ্য।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জুনায়েদ বাবুনগরী কোথায় কোন মাহফিলে অতিথি হয়ে যাবেন তা নির্ভর করে খাদেম ইনামুলের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে বাবুনগরীর শরীর খারাপ থাকলেও প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাড়ি কিংবা হেলিকপ্টার যোগে বাবুনগরীকে নিয়ে বিতর্কিত করছেন এবং শারীরিকভাবেও তাকে অসুস্থ করে তুলছেন। আমন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে বাবুনগরীর অনুষ্ঠান নির্ধারণ করেন। অথচ বাবুনগরী নিজেই জানেন না তিনি কখন কোন অনুষ্ঠানে যাবেন। হাটহাজারী মাদরাসায় বাবুনগরীর অনুরক্ত ব্যক্তিরা তার জন্য উপহার ও হাদিয়া নিয়ে এলে এর বড় একটা অংশ চলে যায় ইনামুলের পকেটে। শুধু তাই নয়, সরকারবিরোধী লোকদের কাছেও তিনি হরহামেশা টাকা নিচ্ছেন।

বারিধারা মাদরাসার মুহতামিম মনির হোসেন কাসেমী বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা নিয়ে ইনামুলের সঙ্গে ভাগাভাগিও করেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান। এছাড়া ইনামুলের বিয়েতেও মোটা দাগে অর্থ খরচ করেন তিনি। মনিরের ইনামুলকে হাত করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে হেফাজতে ইসলামে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজ স্বার্থে হেফাজতকে ব্যবহার করা।

সংশ্লিষ্টরা অনেকেই মনে করছেন, জুনায়েদ বাবুনগরী নীরব থাকলে হেফাজতে ইসলাম ও হাটহাজারী মাদরাসাসহ সমস্ত কওমি অঙ্গন আবারও গভীর সংকটে পরতে পারে।

টিটি/জেডএইচ/এসএইচএস/এএসএম

সম্প্রতি ইনামুল ঘটা করে তার বিয়ের উৎসব করেন। বিয়েতে দু’টি হেলিকপ্টার ভাড়া করেন তিনি। হেলিকপ্টারে অতিথি আনা-নেয়া করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে খরচ করেছেন লাখ লাখ টাকা। বিয়ে করেছেন কুয়েতপ্রবাসী কনেকে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]