দুধের উৎপাদক-ভোক্তা উভয়েই ঠকছেন বাজার অব্যবস্থাপনায়

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৬:১০ পিএম, ০১ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৬:১৮ পিএম, ০১ জুন ২০২১
ওপর থেকে আনিসুর রহমান, শাহ ইমরান ও মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন

দেশে গত এক দশকের ব্যবধানে দুধ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। তবে এখনো চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দুধ কম উৎপাদন হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ছিল ৯৪ লাখ মেট্রিক টন। তার পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯-এ ছিল ৯৯ লাখ মেট্রিক টন, যা চাহিদার ৬৫ শতাংশ। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে প্রায় এক কোটি ৭ লাখ টন দুধ উৎপাদিত হয়। ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৫ লাখ টন।

খামারিদের অভিযোগ, দুধ সংগ্রহ ও বিপণনের ক্ষেত্রে উদ্যোগ অনেকটাই সীমিত। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুধ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমাতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা বৃদ্ধিতে দুধের সরবরাহ পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং মানসম্পন্ন দুধ সরবরাহ নিশ্চিতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

দুগ্ধশিল্পের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান, আড়ং ডেইরির পরিচালক আনিসুর রহমান ও আকিজ ডেইরির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল ইসলাম মিঠু

‘উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় গুঁড়া দুধ আমদানি’

জাগো নিউজ: সুস্থ থাকতে প্রতিদিন ২৫০ গ্রাম করে দুধ খেতে বলা হলেও দাম বেশির কারণে দুধ কিনতে চায় না মানুষ। দুধের বাড়তি দামের কারণ কী?

আনিসুর রহমান: আমাদের এখানে প্রান্তিক পর্যায়ে দুধ উৎপাদন খরচ বেশি। এটা কীভাবে কমানো যায় তা সরকারের দেখা উচিত। উৎপাদন খরচ বেশি বলে বাজারমূল্যও বেশি। কৃষকের কাছ থেকে আমাদের ফ্যাক্টরিতে দুধ আনতে লিটারে ৪৩-৪৫ টাকা খরচ পড়ে যায়। মানে কেনার পর থেকে ট্যাংকারে করে ফ্যাক্টরিতে আনতে দুধের দাম পড়ে ৪৫ টাকা। এটা যদি ডলারে কনভার্ট করি, তাহলে সেটা ৫০ সেন্টের ওপরে পড়ে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দুধের খরচ পড়ছে ২২-২৮ সেন্ট। মানে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এক লিটার দুধ উৎপাদনে ৩০ সেন্টের নিচে খরচ পড়ে। যদি আমাদের কেনা দামই হয় অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ, তাহলে আমরা স্বল্পমূল্যে কীভাবে দুধ দেব? আন্তর্জাতিক উৎপাদন খরচের সঙ্গে আমাদের উৎপাদন খরচে সামঞ্জস্য না করা হলে দুধের দাম কমানো সম্ভব না।

Milk-4.jpg

খামারির কাছ থেকে বাজারে পৌঁছানোর পর দ্বিগুণ হয়ে যায় দুধের দাম

অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ড থেকে পাউডার দুধ আমদানি করলে সব ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে যে দাম পড়ে, সেটা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুধের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ কম। বাইরে থেকে কিনে আনলে যদি আমার দাম কম পড়ে, তাহলে দেশীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্প হিসেবে আমরা এগোতে পারবো না।

জাগো নিউজ: অবকাঠামোগত সমস্যা কেমন দেখছেন?

আনিসুর রহমান: আমাদের দেশে দুধ উৎপাদন বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না প্রক্রিয়াজাত কারখানা। এ কারণে প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ছে না। এর ফলে দুধ আমদানি বাড়ছে। দেশে দুধের উৎপাদন খরচ বেশি বলে, প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার দুধ আমদানি করছি। এটা সমন্বয় করা না গেলে খামারি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান কিংবা ভোক্তা কেউই উপকৃত হবেন না।

জাগো নিউজ: ডেইরি শিল্পে আর কী কী সমস্যা আছে?

আনিসুর রহমান: গো-খাদ্যের দাম বেশি এবং জেলা পর্যায়ে প্রসেসিং প্লান্টের অভাব আছে। খামারিদের প্রণোদনা দিয়ে, যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে ডেইরিশিল্প সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

‘নজরদারি বাড়িয়ে গো-খাদ্যের সিন্ডিকেট বাণিজ্য ভেঙে দিতে হবে’

জাগো নিউজ: কৃষিপণ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। এ কারণে কি দুধ উৎপাদনে খরচ বাড়ছে?

শাহ ইমরান: ধান, চাল ও ডালের মত দুধও কৃষিপণ্য। ধান ও চাল উৎপাদনের বিদ্যুৎ বিল কৃষির আওতায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দুগ্ধ খামারকে বাণিজ্যিক আওতায় রাখা ঠিক হয়নি। এ কারণে কৃষকদের দুধ উৎপাদনে খরচ বেশি।

Milk-4.jpg

দেশে পর্যাপ্ত দুধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা নেই

জাগো নিউজ: গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি খামারিদের কেমন ভোগাচ্ছে?

শাহ ইমরান: গো-খাদ্যের দামও এখানে বেশি। এই বিষয়টাকে সরকারের মনিটরিং করা দরকার। গমের দাম ২২ টাকা, অথচ গমের ভুসির দাম ৪০ টাকা। গো-খাদ্যে বিদ্যমান ভ্যাট-ট্যাক্স আছে, সেটা বাদ দিতে হবে। বাজার নজরদারি বাড়িয়ে গো-খাদ্যের সিন্ডিকেট বাণিজ্য ভেঙে দিতে হবে। গো-খাদ্য আমদানি শুল্ক বাদ দিতে হবে। আবার অনেকেই কম শুল্কে গো-খাদ্য এনে দাম কমাচ্ছেন না। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাগো নিউজ: অবকাঠামোগত সংকট কেমন?

শাহ ইমরান: দুধ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রচুর অবকাঠামোগত সংকট আছে। দুধকে লংটার্ম (দীর্ঘমেয়াদি) সংরক্ষণ করার জন্য যেসব যন্ত্র দরকার, সেগুলো প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের পক্ষে কেনা সম্ভব না। প্রত্যেকটা উপজেলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা কৃষকদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে। তাদেরকেও চিলিং প্লান্ট দিতে হবে। মিল্ক ভিটা এটা করে দিতে পারে, কিংবা খামারিদের সংগঠনগুলোকে এই মেশিনারিজ কিনে দিতে পারে।

জাগো নিউজ: খামারিরা ন্যায্যমূল্যে দুধ বিক্রি করতে পারেন না কেন?

শাহ ইমরান: ঢাকায় বসে প্রতিলিটার দুধ ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনে খেতে হয়। কিন্তু কৃষককে দুধ বিক্রি করতে হয় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে ব্যাপক গ্যাপ আছে। ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর দুধের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এতে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই ঠকছে। বাজার অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে মধ্যস্থতাকারীরা বড় অংকের টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এটার দিকে নজর দিতে হবে।

জাগো নিউজ: গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয় কেন?

শাহ ইমরান: চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারায় গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয়। আমাদের এখানে দুধের ঘাটতি আছে প্রায় ৩৫ শতাংশের মতো। আমাদের দুধ উৎপাদন বাড়াতে হবে। অন্য সময়ে উৎপাদন প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ে। তবে করোনার কারণে এটা থমকে আছে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে।

Milk-4.jpg

প্রান্তিক পর্যায়ে দুধ উৎপাদন খরচ বেশি

‘গুঁড়ো দুধের প্লান্ট নির্মাণে বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে’

জাগো নিউজ: এখন মাত্র কয়েকটি জেলায় দুধ উৎপাদন হচ্ছে। অন্য জেলায় উৎপাদন বাড়াতে কী করা যেতে পারে?

মোসলেহ উদ্দিন: এখন পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এটা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রথমে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ঋণের ব্যবস্থাও করে দিতে হবে। গাভীর জাতের উন্নয়ন করতে হবে। বিদেশ থেকে উন্নত জাতের গাভী বা সিমেন আমদানিতে ভর্তুকি দিতে হবে। প্রত্যেক বিভাগে অন্তত একটি করে পাউডার প্লান্ট করতে হবে। পাশাপাশি অন্য এলাকায় উৎপাদন বাড়িয়ে দুধ ক্রয় কেন্দ্র করতে হবে। দুধ বিপণন ব্যবস্থাও সহজ করতে হবে।

জাগো নিউজ: দুধ উৎপাদনে এত খরচ কেন হচ্ছে?

মোসলেহ উদ্দিন: দেশীয় এই শিল্পে সরকারের যে ধরনের সাহায্য দরকার তা খামারিরা পাচ্ছেন না। গো-খাদ্যের দাম তাদের ভোগাচ্ছে। গো-খাদ্য আমদানিতে তাদের ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। তার ওপর গবাদিপশুর রোগবালাই ও ভ্যাকসিনেশন আছে। এতকিছু সমন্বয় করে তাদের বাড়তি দামে দুধ বিক্রি করতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ: আকিজ ডেইরি কী পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করতে পারছে?

মোসলেহ উদ্দিন: বাজারে দুধের চাহিদা মোতাবেক দেশীয় সোর্স থেকে আমরা তা পূরণ করতে পারছি না। আমরা প্রসেসররা (প্রক্রিয়াজাতকারী) মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দুধ পাই। বাকি ৮৫-৯০ শতাংশ দুধ লোকাল মার্কেটে বিক্রি হয়। এটাকে যদি অর্গানাইজ ওয়েতে (সমন্বিত উপায়ে) বিক্রি করা হয় এবং বলা হয় পাস্তুরাইজড বা ইউএইচটি ব্যতীত কোনো দুধ বিক্রি হবে না, তাহলে ভোক্তা দুধ পাবে স্বল্পমূল্যে। খোলা দুধ বিক্রি ঠিক নয়। এতে অনেক রোগ ছড়ায়। আমরা দুধ পাওয়ার পর সেটার বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করি, প্রক্রিয়াজাত করি। উন্নত দেশে কোথাও খোলা দুধ বিপণন হয় না।

Milk-4.jpg

দুধের উৎপাদন খরচ বেশি বলে বাজারমূল্যও বেশি

জাগো নিউজ: প্রক্রিয়াজাতকরণে কী ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যা আছে?

মোসলেহ উদ্দিন: খামারি পর্যায়ে মেশিনারিজের অভাবে অনেক সময় দুধটা আমাদের কাছে পৌঁছায় না। প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রত্যেক বিভাগে উন্নত পাউডার প্লান্ট ও চিলিং প্লান্টের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে পাউডার প্লান্ট করা দরকার। উৎপাদন বাড়াতে যদি সরকার এই ব্যবস্থাগুলো নেয়, তাহলে দুগ্ধ উৎপাদন কয়েকটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

জাগো নিউজ: কী পরিমাণ গুঁড়ো দুধ আমদানি করতে হয়?

মোসলেহ উদ্দিন: দেশে গুঁড়ো দুধের বিশাল চাহিদা আছে। বছরে দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ বাংলাদেশে আসে। প্রত্যেক জেলায় যদি প্লান্ট হয়, তরল দুধের পরিমাণ বাড়বে এবং গুঁড়ো দুধের আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। আর যারা প্লান্ট করতে চায় তাদের বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এসব করা গেলে অল্প সময়েই দুধ উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো।

এসএম/এমএসএইচ/এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]