মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান লোক-দেখানো

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১১ পিএম, ২০ জুন ২০২১

মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখতে জাতিসংঘ যে আহ্বান জানিয়েছে, সেটিকে লোক-দেখানো বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তার মতে, পশ্চিমারা মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি না করলেও অন্য ব্যবসা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের খণ্ড খণ্ড নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এলে কিছুই হবে না।

গত শুক্রবার (১৮ জুন) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তার প্রতি নিন্দাও জানানো হয়। জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত প্রস্তাব সমর্থন করেছে ১১৯টি দেশ। স্বৈরশাসিত বেলারুশই একমাত্র এর বিপক্ষে মত দেয়। বাংলাদেশ, ভারত, চীন-রাশিয়াসহ মোট ৩৬টি দেশ প্রস্তাবে মতামত দেয়া থেকে বিরত থাকে।

এ প্রস্তাবে বাংলাদেশের ভোট না দেয়াসহ মিয়ানমার-রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ড. ইমতিয়াজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের প্রস্তাব এনেছে জাতিসংঘ, যেখানে বাংলাদেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। এর কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি আপনার কাছে?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সমস্যা। এ সমস্যা থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং বাংলাদেশ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে আসলে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করি না। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ঝগড়াও নেই।

jagonews24জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে বলে এটি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এর সঙ্গে বাংলাদেশকে আলাদা করে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। যে কারণে একেবারে গায়ে পড়ে ঝগড়া করার সুযোগ নেই বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করে সেটাই আগে দেখা দরকার।

এ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে-বিপক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানে কিছুই যায়-আসে না।

জাগো নিউজ: মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। রোহিঙ্গা গণহত্যা চালালো। অনেক দেশই তো নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ভোট দিল। বাংলাদেশেরও কি শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়ার সুযোগ ছিল না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: মিয়ানমারের কাছে মূলত অস্ত্র বিক্রি করে চীন। গত বছর থেকে ভারতও বিক্রি করছে। চীন-ভারত কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাই দেখার বিষয়। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সদিচ্ছা কতটুকু তা-ও দেখার বিষয়। মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বাংলাদেশের আসলে কিছুই করার নেই।

অন্যান্য ব্যবসা সবাই চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে। এসবে তো বাধা দিচ্ছে না। পশ্চিমা দেশগুলো এগুলো দেখছে না কেন? তার মানে চীন-ভারতকে একটি বার্তা দিতেই এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

jagonews24মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংস অভিযান থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা

জাগো নিউজ: ভারত এবং চীনের পক্ষে থাকতেই বাংলাদেশ ভোট প্রদানে বিরত থাকল কি-না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: হতেই পারে। যেহেতু ভোট দানে ভারত-চীন বিরত থাকছে সেহেতু বাংলাদেশ একই পথে হেঁটেছে। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নীতি অনুসরণ করতেই হয়।

মিয়ানমার নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব সামগ্রিক অর্থে কোনো সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি। খণ্ড খণ্ড নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসলে কিছুই হবে না। পশ্চিমা বিশ্ব অস্ত্র বিক্রি করছে না, কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে অন্য ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না কেন? এ নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই লোক-দেখানো বলে মনে করি। বাংলাদেশ আগ বাড়িয়ে বিরাগভাজন হতে যাবে কেন?

জাগো নিউজ: ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যু আলোচনার ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে কি-না?

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: মিয়ানমারে কে ক্ষমতায় তার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বোঝাপড়ার ব্যাপার। ’৭০ বা ’৯০-এর দশকে রোহিঙ্গাদের যখন ফেরত নেয়া হলো, তখনো সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছিল। সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মিয়ানমারে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও সামরিক বাহিনীর শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটবেই। গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে সামরিক শক্তিও বেড়ে যায়।

jagonews24নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে ক্ষমতা দখল করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী

বাংলাদেশ হয়তো বলতে চাইছে, মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রির নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমাদের বিষয় নয়। পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিলেই স্ট্যান্ড (অবস্থান) নেয়া। বাংলাদেশ তা নিতে চায়নি। বাংলাদেশ স্ট্যান্ড নিলেও এখানে কোনো প্রভাব ফেলবে না। মূলত, চীন, ভারত এবং জাপানের ভূমিকা কী, তার ওপরই বিষয়টি নির্ভর করছে।

এএসএস/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]