সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি পদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি আন্দোলন, সমাধান কী?

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৪ পিএম, ০৫ জুলাই ২০২১

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সবশেষ নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু। কিন্তু দায়িত্ব বুঝে পেয়ে সভাপতির চেয়ারে বসার আগেই করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। মতিন খসরুর মৃত্যুতে আইনজীবী সমিতির সভাপতির পদটি শূন্য হয়। সেই পদে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা।

অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা তাকে সভাপতি হিসেবে না মেনে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে নিয়মিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে আসছেন। এ নিয়ে সরকারদলীয় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আইনজীবীরাও পাল্টা কর্মসূচি পালন করছেন। এখন পাল্টাপাল্টি এই কর্মসূচির ফলে দেখা দিয়েছে সঙ্কট। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বারের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনী প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

এদিকে আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বার সভাপতি পদে নির্বাচনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এটি সমাধান করা হবে কি-না? আর করোনাকালে যদি নির্বাচন না হয় তাহলে বারের সংবিধান অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সভাপতি নির্বাচন করা হবে কি-না।

বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের অভিযোগ, শূন্যপদ পূরণে করণীয় নির্ধারণে গত ৪ মে বার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সমিতির বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছিল। সেখানে এই শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এর মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত আসার আগেই আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের মধ্য থেকে একজন নিজেকে বিশেষ সভার সভাপতি দাবি করে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকে বারের সভাপতি ঘোষণা করেন। আর তা কণ্ঠ ভোটে পাসও করেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা।

jagonews24

সভাপতি পদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভায় হট্টগোল হয়

তৎক্ষণাৎ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা ‘মানি না, মানবো না’ শ্লোগান দিয়ে সভা মুলতবি করেন। এর পরে এসে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাদের যুক্তির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনও করেন। তারপর থেকে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মাঝে পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি দেয়া শুরু করেন।

যদিও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা দুই ভাগে বিভক্ত। তারপরও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির পদ ঘিরে আন্দোলনে তারা (বিএনপির বিভক্ত দুই গ্রুপে) ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। তারা সবাই এক হয়ে আন্দোলন করছেন।

অন্যদিকে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদ নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসার পরে বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা এটি নিয়ে বিরোধ তৈরি করে ইস্যু বানিয়ে নিয়মিত মানববন্ধন, মিছিল ও আন্দোলন করে আসছেন।

তবে বার সভাপতির শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির পদ শূন্য হওয়ার পর প্রথম বিশেষ সভা যেহেতু মুলতবি আছে, এখন আবার সেই সভা ডেকে বার অ্যাসোসিয়েশনের সংবিধান অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আবার কেউ বলছেন, বারের নির্বাচিত সিনিয়র সহ-সভাপতি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) ওই পদে আসীন হয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সভাপতি নির্বাচন করা হোক। সেক্ষেত্রে এ এম আমিন উদ্দিনকেও যদি সভাপতি করা হয়, তাও যেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়। সেটি নির্বাচিত প্রতিনিধির মতামতের ওপর ভিত্তি করে বা সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি অথবা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যেন করা হয়।

শূন্যপদ নিয়ে সমাধানে বার নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কী
বারের সভাপতি পদ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে আমার কথা হলো সমাধান তো অবশ্যই হওয়া উচিত।’

jagonews24

আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের সংবাদ সম্মেলন

এ বিষয়ে বার নির্বাচন কমিশনের কোনো দায়িত্ব আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট বারের বিধিতে বলা আছে, পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে স্পেশাল জেনারেল মিটিং (বিশেষ সাধারণ সভা) করতে হবে আর ওই মিটংয়েই নির্ধারণ করা হবে ভোট কীভাবে হবে। সেখানে মিটিং ডাকা হলো। কিন্তু সেদিনই যদি ওনারা নির্ধারণ করতেন ভোট কীভাবে হবে, আর সেটার জন্য বারের নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে, তখন যদি আমাদের নাম উঠতো তাহলে একটা কথা ছিল, কিন্তু আমরা তো ওইদিন ওখানে ছিলাম না, তাই (বার) নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখানে নেই।’

বারের সভাপতি পদ নিয়ে যা ভাবছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদ নিয়ে যে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মিছিল-মিটিং হচ্ছে, সেটিকে অযৌক্তিক বলছেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সংবিধান আছে। তার ১৬ নম্বর ধারায় আছে, যদি কোনো কারণে পদ শূন্য হয়ে যায় সেক্ষেত্রে স্পেশাল জেনারেল মিটিং ডাকতে হবে এবং সেই স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়েই সিদ্ধান্ত হবে। এখানে সেদিন স্পেশাল মিটিং ডাকা হয়েছে। এরপরে ভয়েস ভোটে যেহেতু সেখানে প্রেসিডেন্টের (এ এম আমিন উদ্দিন) পক্ষে তারা উপস্থিতি বেশি ছিল, তারা জয় পেয়েছেন। এই হলো গিয়ে বিষয়, আমি যতটুকু জানি আর কী। এখন কথা হচ্ছে মানি না, কথাটা ঠিক না। আবার জোর করে দখল করে নিয়েছে সেটাও আমার কথা না। এখানে সুপ্রিম কোর্ট বারের বিধি অনুযায়ী বিকল্প যেটা ছিল, সংবিধান মোতাবেক সেটা করা হয়েছে।’

জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘সেটাও যদি হতো যে, তারা (বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা) মেজোরিটি ছিলেন, কিন্তু তাদের কথা শোনা হয়নি, সে ধরনের সিচুয়েশনও ছিল না। কাজেই এখন মেনে নেয়া উচিত।’

অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘একটা পোস্টের জন্য নির্বাচন করা খুব কঠিন। অনেক ফরমালিটিজ আছে। আর যদি এমন হতো বিকল্প নেই। বিকল্প তো হয়ে গেছে, আর্টিকেল সিক্সটিনের বিকল্প তো হয়ে গেছে।’

jagonews24

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সংবাদ সম্মেলন

প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি বলে বিএনপির দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে তাদের উপস্থিতি যখন কম ছিল, তখন তারা সিদ্ধান্ত থেকে সরে গেছে, এটা তো ঠিক না। বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা নিজের, তাদের এখন এই অবস্থা আর কি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতি ঘোষণার পরে তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আইনজীবীদের পাল্টা অবস্থানের বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সভাপতি পদ নিয়ে দুইপক্ষের আইনজীবীর মধ্যে এমন উত্তেজনার পরিস্থিতি এর আগে তৈরি হয়নি। উভয়পক্ষ বসে বিষয়টি ঠিক করে ফেলা উচিত।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা যে পন্থীই হোক, বসে একটা সমাধানে আসতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. কায়সার কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সভাপতি হিসেবে আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিনকে মেনে নিতে পারছি না, কারণ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ইতিহাসে কখনো অনির্বাচিত কেউ সভাপতির পদে আসীন ছিলেন না। বরাবরই সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীদের ভোটের মাধ্যমে সভাপতিসহ অন্যান্য পদে যারা থাকেন তারা নির্বাচিত হয়ে থাকেন।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। তবে, এবার যা হয়েছে তা হলো, যেভাবে জবর-দখল করে সংসদে আছে, ঠিক সেভাবে একই কায়দায় জবরদস্তি করে আওয়ামী লীগের দু-চারজন সভাপতি হিসেবে ওনাকে ঘোষণা করেছে। এটার কোনো সাংবিধানিক বৈধতা নাই। ট্র্যাডিশনাল কোনো বৈধতা নাই, সুপ্রিম কোর্টের যে ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে সেটার সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক এবং খুবই বিপরীতমুখী।’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আইনজীবী ফোরামের পক্ষে সাধারণ আইনজীবীদের দাবির মুখে আন্দোলন করছি মূলত সভাপতি নির্বাচনের জন্য। তিনি (এ এম আমিন উদ্দিন) সভাপতি হয়েছেন, সেটা আমরা মানি না। কারণ, সভাপতি পদের জন্য ওই দিন ধার্য ছিল না। আমরা চাচ্ছি যেহেতু শূন্যপদ হয়েছে, সেটা নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটা কী হবে, সেটা আমাদের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির গঠনতন্ত্রে দেয়া আছে। সেই গঠনতন্ত্রের আলোকে সরাসরি ভোটের মাধ্যমেও হতে পারে।’

এখন তো করোনাকাল চলছে, এমন সময়ে ভোটের দাবি তুলছেন কীভাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই আইন সম্পাদক বলেন, ‘করোনাকালে কিন্তু বারের নির্বাচন হয়েছে। করোনায় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর এটা তো হলো সুপ্রিম কোর্টের নিয়মতান্ত্রিক একটা নির্বাচন। এখানে তো প্রয়োজনে দুই, তিন, পাঁচ দিনেও ভোট গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাঁচ থেকে সাত দিনে আমরা ভোট দিতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হলেন তিনি (এ এম আমিন উদ্দিন)। আর সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রতিনিধি হলেন সভাপতি ও সম্পাদক। তাদের কাজ হলো- আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করা, রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনজীবীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বারগেইনিং করা। তো যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, আবার তিনিই সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রেসিডেন্ট। তাহলে সেটা তো হয়ে যাচ্ছে যে, যিনি জামাই তিনিই কনে। তাহলে তো বারগেইনিংয়ের সুযোগ থাকছে না। সুতরাং আবারও বলছি, দেশটা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেটার অংশ হিসেবেই সুপ্রিম কোর্ট বার দখল করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু জাগো নিউজকে বলেন, ‘সভাপতি মারা যাওয়ার পরে বিশেষ সাধারণ সভায় এরকম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জেনারেল হাউজে যায় এবং সেখানে এ এম আমিন উদ্দিনের নাম প্রস্তাব হয়। এতে বিএনপিপন্থীরা বিরোধিতা করলেও দ্বিতীয় কোনো নাম প্রস্তাব করেনি। সেখানে কণ্ঠ ভোটে একজনের প্রস্তাব করা নাম পাস হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বারের বিধিতে যে প্রক্রিয়া আছে, তারা তো এর বাইরে যায়নি।’

এ প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম সজল জাগো নিউজকে বলেন, ‘একজন সভাপতি মারা যাওয়ার পরে ৪ মে সুপ্রিম কোর্ট বারের বিশেষ সাধারণ সভায় বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সভার ব্যানারটা দেখলেই বুঝতে পারবেন ওইখানে লেখা ছিল সভাপতি কীভাবে নির্বাচিত হবে সেটার প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা। তো সভার শুরুতে কে সভাপতি প্রিসাইড করবে, এটা নিয়ে হট্টগোল হওয়ার কারণেই তো সভা মুলতবি করা হলো। সুতরাং সাধারণ সভা-ই তো হয়নি। আগে তো সভা হবে, তারপরে নাম প্রস্তাব হবে। আর এখানে নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি ঠিক করা হয় তারপর হাউজে নাম প্রস্তাব হবে, আমরাও নাম প্রস্তাব করবো, এরপর সিদ্ধান্ত। আমাদের কথা হলো, আগে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঠিক করা হবে। সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরে যদি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনে সভাপতি হন, সেটা আমরা মেনে নেবো। তা না হলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে।’

সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী মো. সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে কোনো কারণে পদ শূন্য হলে সেটা কীভাবে পূর্ণ হবে সেটা আমাদের কনস্টিটিউশনের আর্টিকেল ১৬-তে বলা আছে। পদ শূন্য হলে ৩০ দিনের ভেতরে জেনারেল মিটিংয়ে পদ পূরণের বিষয়ে করণীয় ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া হবে। সেটার ইলেকশন কীভাবে হবে, ভোটাভুটিতে হবে নাকি, হাত তোলার পদ্ধতিতে হবে, এগুলো জেনারেল মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

সাইফুর রহমান বলেন, ‘আর স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এই প্রথা স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছে। সে হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জালাল উদ্দিনের পরবর্তী সভাপতি নির্বাচিত না হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করার কথা। এখন ওনারা (আওয়ামীপন্থীরা) আর্টিকেল ২২-এর বিরোধিতা করে বলছেন, মেজরিটি আমরা, তাই আমরা যা বলবো সেটাই হবে। এটা হলো সিনিয়রিটির বিষয়ে তাদের বক্তব্য।’

jagonews24

‘ভোট চোর-রাজাকার’ স্লোগানে মুখোমুখি হয় আইনজীবীদের দুই পক্ষ

তিনি বলেন, ‘বারের প্রেসিডেন্ট কীভাবে হবে সেটা নিয়ে জেনারেল মিটিং ডাকা হয়েছিল গত ৪ মে। আমাদের সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ওপেন করেছিলেন যে, কে হবেন ওই জেনারেল মিটিংয়ের সভাপতি এবং পরবর্তী করণীয় এবং সেখানে সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আলোচনা হবে। কিন্তু ওনারা (আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা) সকাল বেলা জোর করে বারের ব্যানার সরিয়ে দিয়ে সফিক উল্ল্যাহর সভাপতিত্বে আরেকটা ব্যানার টানিয়ে দেন ওখানে। যখন জোর করে টানিয়ে দিলেন, তখন আইনজীবীরা সবাই প্রশ্ন তোলেন। এর মধ্যে সফিক উল্ল্যাহ মাইক্রোফোন কেড়ে‍ু নিয়ে নিজেকে ওই দিনের স্পেশাল সভার সভাপতি ঘোষণা করেন। এ সময় হলরুম ভর্তি উভয়পক্ষের শত শত আইনজীবী মধ্যে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়। তার পরে সম্পাদক সভা মূলতবি ঘোষণা করে দেন। সভা শেষ হৈ-হুল্লোড় করে যে যার মতো চলে যান। পরে তারা (আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত মোবাইলে নিয়ে নেন এবং তারা বসে সাবেক সভাপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতি ঘোষণা করেন। সেটি এসএমএস ও বারের ফেসবুক গ্রুপে ভাইরাল করে দেন। ফেসবুকে তারা তাদের মতো করে ওইসব বক্তব্য প্রচার করছেন।’

তাহলে সমাধানটা কী হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আগের মতো করে বারের সম্পাদক জেনারেল মিটিং আহ্বান করবেন। সেখানে ভোটাভুটির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হবেন নাকি কীভাবে হবে সেটা ঠিক করা। আর যতক্ষণ পর্যন্ত ইলেকশনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা পদ পূরণ না হবে ততক্ষণ ভাইস প্রেসিডেন্ট দুজনের মধ্যে একজনকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়াটা হবে সমাধান।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী কুমার দেবুল দে জাগো নিউজকে বলেন, ‘একজন সভাপতি মারা যাওয়ার পরে সেটি তো সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির গঠনবিধির ধারা ১৬-তেই আছে নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী। যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হয়েছে, সেটি গঠনতন্ত্র মেনেই হয়েছে। বিষয়টিতে রাজনীতি আছে, এখানে দুটোপক্ষের রাজনীতি আছে। রাজনৈতিক কারণেই সভাপতি পদটি নিয়ে এমন উত্তপ্ত অবস্থা তৈরি হয়েছে।’

jagonews24

‘কারণ হচ্ছে গঠনতন্ত্রে লেখা আছে, মৃত্যুজনিত কারণে যদি কোনো পদ ফাঁকা হয়, তাহলে ওই পদ এক মাসের মধ্যেই স্পেশাল জেনারেল মিটিং দিয়ে পূরণ করতে হবে। যেহেতু সভাপতি নেই তাহলে স্পেশাল জেনারেল মিটিং ডাকতে পারেন সভাপতি অথবা সভাপতির প্রতিনিধি হিসেবে দুজন ভাইস প্রেসিডেন্টের একজন। তবে তাদের ভেতর কে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হবে, এ নিয়ে বারের গঠনতন্ত্রে তেমন কিছু নেই। এর ফলে বারের এজিএসে প্রফেশনে যিনি সিনিয়র তাকে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ দেয়া হতো। আবার কোনো কোনো কমিটি যে বেশি ভোট পান তাকে দিতো। এখন এই কমিটিতে বলা হয়েছিল, অন্তত একটা মিটিংয়ে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সফিক উল্ল্যাহকে মেনে নিলাম, যেহেতু তিনি প্রফেশনে সিনিয়র। উনি স্পেশাল জেনারেল মিটিং ডেকেছেন। সেখানে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি করা হয়েছে। সেখানে সভাপতি হিসেবে নামটা প্রস্তাব আসছে হলো এ এম আমিন উদ্দিন সাহেবের। তখন এটা কণ্ঠ ভোটে পাস করে নিলো। কিন্তু বিএনপি থেকে কোনো নামও আসেনি, কণ্ঠ ভোটেও গেল না, ওনারা নামও দিলেন না।’

কুমার দেবুল দে বলেন, ‘এখন কথা হচ্ছে, অতীতে স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল কি? প্রতিটি স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো কণ্ঠ ভোটে। সেই ক্ষেত্রে এটা তো গ্রহণ না করার কোনো বিষয় না। আর এটা তো হচ্ছে, যেহেতু পদ খালি হওয়ার এক মাস পার হয়ে গেছে। এই সভাপতি পদ মেনে নিতে সমস্যা কী? আর একটা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আটটি পদে জয়ী হয়েছে, বাকি ছয়টিতে বিএনপি। তো মেজরিটির ভিত্তিতেও তারা এগিয়ে। সেক্ষেত্রেও এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতির পদে পাস করিয়ে নিয়েছে, তাতে সমস্যা কী? এখন ওনাকে না মেনে বিএনপি যদি কোঅপারেট না করে তাহলে আওয়ামী লীগও কোঅপারেট করবে না। তার চেয়ে বরং দুইবারের প্রেসিডেন্ট এ এম আমিন উদ্দিনকে মেনে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। উনি আইনজীবী বান্ধব নেতা, এভাবেই বারের বাকি সময়টুকু পার করে দেয়া উচিত। জাতীয় রাজনীতির মতো এখানে তো রাজনীতি করলে হবে না।’

ঘটনার সূত্রপাত
সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু ২০২১-২২ মেয়াদের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ এপ্রিল তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান। পরে গত ২৬ এপ্রিল সমিতির নবনির্বচিত সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৪ মে দুপুর ২টার সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে এক বিশেষ সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠিত ওই স্পেশাল জেনারেল মিটিংয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিনকে সভাপতি ঘোষণা করেন আওয়ামীপন্থীরা। সেই থেকে শুরু হয় সভাপতি পদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল।

এফএইচ/এমআরআর/এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]