বন্দি দেখে আপনজন, ডুকরে কাঁদে শিশুমন

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫০ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২১

মিষ্টি মেয়ে সাহেলা আফরোজ বিথি (ছদ্মনাম)। সাত বছরের এ শিশু ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানার সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিল। তার মা বারবার বোঝানোর পরও কান্না থামছিল না। কিছুক্ষণ পর হাজত থেকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় একজন আসামিকে বের করছিলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। বিথি দৌড়ে গিয়ে ‘বাবা বাবা’ বলে তাকে জড়িয়ে ধরে। এবার যেন বিথির কান্নার বাঁধ ভেঙে যায়। অবুঝ শিশুটির সঙ্গে তার বাবাও কাঁদতে থাকেন। আদর করতে করতে বিথিকে বলতে থাকেন, ‘কেঁদো না মা। কয়েকদিনের মধ্যে আমি চলে আসব’। বিথি বলতে থাকে, ‘না না, তুমি এখনই আমার সঙ্গে চলো’।

সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের হাজতখানার সামনে এ আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। বিথির বাবা রমিজ উদ্দিনকে (ছদ্মনাম) তিন মাস আগে একটি মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলার শুনানির জন্য তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আবারও তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বিথি তার বাবাকে দেখার জন্য মায়ের সঙ্গে প্রায় সময়ই আদালত পাড়ায় আসে। প্রতিবারই বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ছোট্ট এ শিশুকে সামলাতে গিয়ে অশ্রু গড়ায় মায়ের চোখেও।

বিথির মা আমেনা বেগম (ছদ্মনাম) আদালত প্রাঙ্গণে জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি মামলায় বিথির বাবাকে তিন মাস আগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করেছেন। এরপর পর থেকে প্রায় সময় বিথিকে নিয়ে আমি আদালতে আসি। বিথি তার বাবার এ অবস্থা দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। এখন বিথি খেলাধুলাও করে না কারও সাথে। সব সময় অন্য মনস্ক হয়ে থাকে।’

বিথির মতোই আরেক শিশু শাহাবউদ্দিন (ছদ্মনাম)। তার মা সাহেরা বানুকে (ছদ্মনাম) মাস খানেক আগে একটি মামলায় গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মামলার পর আট বছরের এ শিশু তার মাকে দেখতে আদালতপাড়ায় আসে।

সেদিন খালা নিলুফা জাহানের (ছদ্মনাম) সঙ্গে বসেছিল মাকে দেখার অপেক্ষায়। মাকে যখন কারাগার থেকে এনে প্রিজন ভ্যান হতে পুলিশ সদস্যরা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে নামাচ্ছিলেন, তখন শাহাবউদ্দিন ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।

মাকে বলতে থাকে, ‘মা মা আমাকে ছেড়ে যেও না। তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না। তুমি চলে গেলে আমি কার সাথে থাকবো।তুমি চলো আমার সাথে।’

সাহেরা বানুও সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। মা-ছেলের কান্নায় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত অন্যদেরও চোখ মুছতে দেখা যায়। এরপর পুলিশ সদস্যরা সাহেরাকে নিয়ে আদালতে চলে যান।

শাহাবউদ্দিনের খালা নিলুফা জাহান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাসখানেক আগে আমার বোন সাহেরাকে একটি মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। শাহাবউদ্দিনের বাবা বিদেশে থাকেন। ছেলেটি তাদের একমাত্র সন্তান। মাকে ছাড়া সে কখনো একা থাকেনি। এর আগেও তার মাকে দেখার জন্য আদালতে এসেছিল। তার মাকে আদালতে দেখে সে মুষড়ে পড়েছে। মাকে দেখলেই কেঁদে ওঠে, আর কারও সঙ্গে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে চায় না।’

jagonews24গত বছরের ডিসেম্বরে পারিবারিক কলহের এক মামলায় মা ও বাবা গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতের বারান্দায় আসতে হয় দুই শিশুকে, সেই ঘটনা আলোচনার ঝড় তোলে দেশজুড়ে

বিথি ও শাহাবউদ্দিনের মতো এমন অনেক অবুঝ শিশুকে প্রতিদিন দেখা যায় ঢাকার আদালতপাড়ায়। আদালতে তারা আপনজনকে দেখতে আসে। সেসময় তাদের শিশুমন যেন ডুকরে কেঁদে ওঠে। এসময় আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশও যেন ভারী হয়ে যায়। আসামি আপনজন পরিস্থিতি সামলে নিতে পারলেও অবুঝ শিশু পারে না। পুলিশ, ভ্যান, হাতকড়া, ভিড়—দেখে তাদের মনের মধ্যে ঢুকে যায় ভয়-শঙ্কা।

আদালত প্রাঙ্গণে শিশুদের না আনার পরামর্শ
আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় পুলিশের জালে দেখে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক আপনজনই কেঁদে ফেলেন। সেই তুলনায় মা-বাবাকে এমন পরিস্থিতিতে দেখা কোনো শিশুর জন্যই সহজ নয়। বরং এই পরিস্থিতি অনেক শিশুর মানসিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য নিতান্তই প্রয়োজন না হলে কোনো শিশুকে আদালতপাড়ায় না আনার পরামর্শ দিয়েছেন আইনবিদ ও মনোবিদরা।

jagonews24ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত

আইনজীবী ইকতান্দার বাপ্পী জাগো নিউজকে বলছিলেন, ‘ঢাকার আদালতপাড়ায় প্রতিদিন অনেক আসামিকে আনা হয়।আসামিদের দেখতে তাদের আপনজনকেও আদালতে উপস্থিত হতে দেখা যায়। আপনজনদের মধ্যে অনেক শিশুও থাকে। শিশুরা তাদের আপনজনদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনেক শিশু মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবুঝ শিশুদের এভাবে আদালতে আনা ঠিক হচ্ছে না।’

একই ভাবনা আইনজীবী খালেদ হোসেনেরও। তিনি বলেন, ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এ শিশুরা যেন মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বর্তমানে ঢাকার আদালতপাড়ায় অনেক শিশুকে দেখা যায়। তারা তাদের আপনজনকে দেখতে আদালতপাড়ায় আসে। আদালতে এসে তারা আপনজনদের দেখে পুলিশের জালে। দেখে হাতকড়া। দেখে আদালতের কাঠগড়া। এই পরিস্থিতি তারা নিতে পারে না। তাই পরিবারের উচিত শিশুদের আদালতে না আনা।’

jagonews24আপনজনের হাতে হাতকড়া দেখে অনেক শিশুই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে

আইনজীবী খায়রুল ইসলামের মতে, শিশু আদালতপাড়ায় এসে যে পরিবেশ দেখে, যে আচরণ দেখে, সেটা তার মগজে গেঁথে যায়। এখানকার নেতিবাচক ধারণাই সারাজীবন বয়ে বেড়ায় শিশুটি। যা তার মানসিক বিকাশে হয়ে ওঠে প্রধান বাধা। পরিবারের উচিত শিশুর মঙ্গলের স্বার্থে তাদের আদালতে না আনা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়েশা সুলতানা বলেন, ‘শিশুরা আদালতের পরিবেশ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধার মুখে পড়ে। এর প্রভাব তাদের দীর্ঘদিন বইতে হয়। শিশুদের বিনা প্রয়োজনে আদালতে আনা মোটেও ঠিক নয়। যতদূর সম্ভব তাদের আদালতের বাইরে রাখতে হবে।’

পড়ুন আগের পর্ব
>> বছরের পর বছর যায়, শেষ হয় না দেনমোহর আদায়ের লড়াই
>> ভরণ-পোষণের জন্য শিশুকে নিয়ে আদালতে ঘোরেন মা
>> ভরণ-পোষণ চেয়ে মামলা করে উল্টো ভোগান্তি
>> কলহের করাতে শিশুমনে রক্তক্ষরণ

জেএ/এইচএ/জেআইএম

ঢাকার আদালতপাড়ায় অনেক শিশুকে দেখা যায়। তারা তাদের আপনজনকে দেখতে আদালতপাড়ায় আসে। আদালতে এসে তারা আপনজনদের দেখে পুলিশের জালে। দেখে হাতকড়া। দেখে আদালতের কাঠগড়া। এই পরিস্থিতি তারা নিতে পারে না। তাই পরিবারের উচিত শিশুদের আদালতে না আনা

শিশুরা আদালতের পরিবেশ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধার মুখে পড়ে। এর প্রভাব তাদের দীর্ঘদিন বইতে হয়। শিশুদের বিনা প্রয়োজনে আদালতে আনা মোটেও ঠিক নয়। যতদূর সম্ভব তাদের আদালতের বাইরে রাখতে হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]