বিএনপিতে অধিকাংশই কাগুজে নেতা!

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে বিএনপির হাইকমান্ড কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যে মতবিনিময় শুরু করেছেন তা নিয়ে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। যদিও আগামী ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু শুরুতে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের বাদ দিয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করায় কার্যত তাদের অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর তাতেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম দিন দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ১৫ সেপ্টেম্বর নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর শেষদিন ১৬ সেপ্টেম্বর দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়। তিন দিনব্যাপী এই ধারাবাহিক বৈঠকে ২৮৬ জন নেতা অংশ নেন। এর মধ্যে ১১৮ জন নেতা তাদের মতামত দেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জাগো নিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৫০২ সদস্যের বিএনপির নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে ২৯২ জন নির্বাহী কমিটির সদস্য। আর ৭৪ সদস্য বিশিষ্ট চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। ইতোমধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মারা গেছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার আগে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল। তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে এবারই প্রথম সিরিজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, তৃণমূলে যারা রাজনীতি করি অর্থাৎ নির্বাহী কমিটির সদস্য তাদের অধিকাংশই সাবেক ছাত্রনেতা, তাদের মতামত নিয়ে তারপর এই মতবিনিময় সভা শুরু করা উচিত ছিল। পর্যায়ক্রমে পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ধারাবাহিকভাবে মাঠের প্রকৃত চিত্র জেনে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সেটা তো হলোই না বরং নির্বাহী কমিটির সদস্যদের বাদ দিয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় হলো, এটা সাংগঠনিক প্রটোকল ব্রেক করার মতো ব্যাপার।

দলের নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাপারটি নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ এই সিস্টেমে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। রীতিমতো অপমান করা হয়েছে। কেউ বলেছেন, ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে যে কমিটি গঠন হয়েছে সেই কমিটিতে নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়ে কখনো রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত সম্মান মেলেনি। দলের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে সভা-সমাবেশ হলে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের কখনো বক্তব্য দিতে দেওয়া হয় না। এমনকি কমিটি গঠনের পর একবার নির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে তারপরে বিএনপি চেয়ারপারসন বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, মহাসচিব অথবা স্থায়ী কমিটি কেউই নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কখনো মতবিনিময় করেননি।

তিনি আরও বলেন, কেউ তো এমন বলছেন যে, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মানে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কমিটির তালিকায় নাম থাকে আর মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে পদের নাম-পরিচয় থাকে। এছাড়া এই রাজনৈতিক পরিচয় কোথাও কাজে লাগে না। তাই হাইকমান্ডের উচিত নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ বিলুপ্ত করা। এই কাগুজে নেতা হওয়া কি খুব দরকার?

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা আ্যডভোকেট রফিক সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, সদস্য হলো একটি রাজনৈতিক দলের কমিটির প্রাণশক্তি। সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু সদস্যদের সঙ্গে এখনো সভা হয়নি।

তিনি বলেন, এই সভা নির্বাহী কমিটির সদস্যদের দিয়ে শুরু করা যেত। ধারাবাহিকভাবে ভাইস চেয়ারম্যান অবদি। তবেই নির্বাহী কমিটির সভাটি পূর্ণতা পেতো। সদস্য হলো তৃণমূল, তাদের উপেক্ষা করে কখনো ভালো কিছু অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে যারা সাবেক ছাত্রনেতা এবং এখন কেন্দ্রীয় সদস্য, তারা দলের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তারা মামলা, হামলা, ভয়-ভীতি জেল-জুলুম ও নিপীড়ন, নির্যাতনকে মোকাবিলা করে চলেছেন কিন্তু তাদের প্রতি বিভিন্ন সময় অবিচার ও অবজ্ঞা করতে দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, উল্লেখযোগ্য সাবেক ছাত্রনেতারাই দল ও দেশের সঙ্কটকালে সাহসী ভূমিকা রাখার মতো ইতিহাস গড়েছে।

রফিক সিকদার বলেন, ২০১৮ সালের পরে নির্বাহী কমিটির এটি হচ্ছে দ্বিতীয় সভা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, ভোটের অধিকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই এই সভার, সময়ের অন্যতম দাবি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে সব মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের দিয়ে কমিটি সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, আগামী ২১ তারিখ নির্বাহী কমিটির সভায় সদস্যদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ত্যাগী ও মেধাবী সদস্যদেরকে মূল্যায়ন করে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তবেই দেশের এই সঙ্কটকাল অতিক্রম করতে এবং আন্দোলনে বিজয় অর্জন করতে বিএনপি সক্ষম হবে, কারণ বিএনপি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে গড়া গণমুখী একটি বড় রাজনৈতিক দল।

বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে নির্বাহী কমিটির সদস্য খোন্দকার আখতার হামিদ ডাবলু বলেন, দলের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করা উচিত। নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মতামত নিয়ে সব কর্মকাণ্ড করা উচিত। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বসে এই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সুচারুভাবে সম্পন্ন করা উচিত ছিল।

নির্বাহী কমিটির সদস্য সাঈদ সোহরাব বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। মতবিনিময় হবে। তবে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের আগে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করলে সেটা ভালো হতো। এটা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, মহাসচিবসহ দলের সিনিয়র নেতাদের ব্যাখ্যা পেয়েছি। পার্টি অফিসে কম জায়গা এবং আমাদের সংখ্যা অনেক বেশি যে কারণে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আগে বৈঠক হয়নি।

দলের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করে জেনেছি।

অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আগে মতবিনিময় করায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যদের কম গুরুত্ব দেওয়া হলো কি-না জাগো নিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটা কী প্রশ্ন করলেন, ভাই। স্পেস না থাকার কারণে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করছি, এর মধ্যে জেলার সভাপতি সাধারণ সম্পাদকরাও থাকবেন। কম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

কেএইচ/এমআরআর/এসএইচএস/জিকেএস

কেউ তো এমন বলছেন যে, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মানে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কমিটির তালিকায় নাম থাকে আর মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে পদের নাম-পরিচয় থাকে। এছাড়া এই রাজনৈতিক পরিচয় কোথাও কাজে লাগে না।

তৃণমূলে যারা রাজনীতি করি অর্থাৎ নির্বাহী কমিটির সদস্য তাদের অধিকাংশই সাবেক ছাত্রনেতা, তাদের মতামত নিয়ে তারপর এই মতবিনিময় সভা শুরু করা উচিত ছিল। পর্যায়ক্রমে পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ধারাবাহিকভাবে মাঠের প্রকৃত চিত্র জেনে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]