স্থায়ী ‘সাময়িক অসুবিধা’, নীতিমালা মানছে না দুই সিটি

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ এএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

ঢাকা শহরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও জনদুর্ভোগ লাঘবে দুই বছর আগে ‘সড়ক খনন নীতিমালা’ প্রণয়ন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই নীতিমালায় বলা হয়, বর্ষা মৌসুম হওয়ায় মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত খোঁড়াখুঁড়ি পরিহার করতে হবে। তবে এ নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বর্তমানে দুই সিটির অধীনে অন্তত অর্ধশত সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতে প্রায় সব এলাকাতেই সড়কে নেমে নাজেহাল হতে হচ্ছে নাগরিকদের। যদিও সিটি করপোরেশন বলছে এ সংখ্যা সামান্য।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প, খোঁড়াখুঁড়ি ও জনভোগান্তি রোধে সড়ক খনন নীতিমালা থাকলেও সেটি উপেক্ষিত। ফলে নগরে জনভোগান্তি কিছুতেই কমছে না। এই দুর্ভোগ লাঘবে এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি গ্রুপের সঙ্গে সেবা সংস্থার আলোচনা ও করণীয় নির্ধারণ, সড়ক খনন নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ, নীতিমালা অনুযায়ী ‘ওয়ান স্টপ’ সমন্বয় সেল এবং সিটি করপোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক কয়েকটি ‘মনিটরিং সেল’ কার্যকর করার পরামর্শ তাদের।

তবে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির প্রকৌশল দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিমালা অনুযায়ী সেবা সংস্থাগুলোর সড়ক খননে সিটি করপোরেশনের কাছে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তারা নিজেদের মতো করে বছরের বিভিন্ন সময় সড়ক খননের অনুমতি চাইছে।

তবে অনিবার্য কিছু কাজ ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নীতিমালা মানা হচ্ছে এবং আগের তুলনায় সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ কমেছে বলেও দাবি দুই সিটির কর্মকর্তাদের।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সড়ক খননের সমস্যা কমিয়ে আনতে ২০০৩ সালে ঢাকার সড়ক খনন নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্নির্মাণে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে এই নীতিমালার কমই মানা হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর এই নীতিমালার অনুসরণ প্রায় বন্ধই হয়ে যায়।

jagonews24

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে জনদুর্ভোগ লাঘবে পরিকল্পিত এবং উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সড়ক খননের কাজ বাস্তবায়ন, নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন, খনন করা সড়কের পুনর্নির্মাণসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিতে উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তখন আগের সড়ক খনন নীতিমালা-২০০৩ পরিবর্তন করে সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯ প্রণয়ন করা হয়।

এই নীতিমালায় বর্ষা মৌসুমের মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর- এই পাঁচ মাসের মধ্যে রাস্তার খনন কাজ পরিহার করতে বলা হয়। জরুরি প্রয়োজনে বর্ষা মৌসুমে কোনো সড়ক খননের দরকার হলে খননকারী সংস্থাকে মূল ক্ষতিপূরণসহ ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত ফি জমা জমা দিতেও বলা হয়। এছাড়া নীতিমালায় সার্বিক বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘ওয়ান স্টপ সমন্বয় সেল’ এবং সিটি করপোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক কয়েকটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করার কথা বলা আছে।

এ নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সেবা সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় সড়কের নিচে পানি, পয়ঃপ্রণালী, ড্রেনেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিকমিউনিকেশনসহ জরুরি প্রয়োজনে নগরীর বিভিন্ন সড়ক খনন করে। কিন্তু খনন এবং তৎপরবর্তী মেরামতে সমন্বয় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায়ই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প, খোঁড়াখুঁড়ি ও জনভোগান্তি রোধে সড়ক খনন নীতিমালা উপেক্ষিত

গত ৩১ আগস্ট সমসাময়িক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা শীর্ষক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে আদিল মুহাম্মদ খান জাগো নিউজকে বলেন, নীতিমালায় মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত খননকাজ পরিহার করার কথা উল্লেখ থাকলেও সেটা মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় নেই। সিটি করপোরেশনের কাছে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার কথা বলা থাকলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায় না। তাই সিটি করপোরেশনকে সড়ক খনন নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

jagonews24

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)

২০২০ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রকল্প নেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এই প্রকল্পের কাজ গত বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের জুনে, ভরা বর্ষায়। এরপর অন্তত ২৫টি এলাকায় রাস্তা কাটা শুরু করে ডিএসসিসি। এখন ৭০ শতাংশ এলাকার খোঁড়াখুঁড়ি শেষ হয়েছে। তবে সড়ক পুনর্নির্মাণ শুরু হয়নি। এ কারণে বৃষ্টি হলেই সড়কে জমছে পানি, ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নাগরিকদের।

রোববার (২৬ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোড, হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, ধোলাইখালের নাসির উদ্দিন সরদার লেন, ওয়ারীর টয়েনবি সার্কুলার রোড, ফকিরাপুল, রাজারবাগ কালীমন্দির ও মুগদা এলাকায় সড়ক খননের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সড়কের যে অংশ কাটা হয়েছে, সে অংশ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা বা যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। এতে আশপাশের সড়কে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

অথচ সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯ অনুযায়ী অন্য কোনো সংস্থা করপোরেশনের রাস্তা খনন করতে চাইলেও তা বর্ষা মৌসুমের আগে বা পরে করতে হবে। অথচ দক্ষিণ সিটি নিজেই বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করছে। এছাড়া ডিএসসিসির আরও কয়েকটি এলাকায় ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে খোঁড়াখুঁড়ি করতে দেখা গেছে।

jagonews24

এ বিষয়ে আগা সাদেক রোডের বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, গত জুনে বংশালের আগা সাদেক রোডসহ আশপাশের অন্তত ১৫টি গলির রাস্তা কাটা হয়েছে। এখন রিকশা নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। আশপাশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, অতি জরুরি ছাড়া কোনো সড়ক কাটা হচ্ছে না। রাস্তা কাটার আগে ওয়ান স্টপ সেলের সভায় অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে। এখন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সড়ক খনন নীতিমালায় বর্ষায় রাস্তা কাটায় বিধিনিষেধ থাকায় যে কেউ চাইলেই রাস্তা কাটার অনুমোদন পাচ্ছে না। আগের তুলনায় এখন ১০ শতাংশের কম রাস্তা কাটা হয়। ভবিষ্যতে আরও কমিয়ে আনা হবে।

jagonews24

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)
গত ২২ আগস্ট ওয়ান স্টপ সেলের সভায় ছয়টি অঞ্চলের ২৬টি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির অনুমোদন দিয়েছে ডিএনসিসি। এখন অঞ্চল-১ এ ডেসকো, সামিট কমিউনিকেশন কোম্পানি; অঞ্চল-২ এ ডেসকো, পিজিসিবি, ওয়াসা, সামিট কমিনিউকেশন কোম্পানি, তিতাস গ্যাস কোম্পানি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি; অঞ্চল-৩ এ ডেসকো, বিটিসিএল, ডিপিডিসি, সামিট কমিউনিকেশন কোম্পানি, ফাইবার অ্যাট হোম, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল; অঞ্চল-৪ এ ডেসকো, বিটিসিএল, ওয়াসা, সামিট কমিউনিকেশন কোম্পানি, এম আরটি লাইন-৫; অঞ্চল-৫ এ ডেসকো ডিপিডিসি, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, সামিট কমিউনিকেশন কোম্পানি, এম আরটি লাইন-৫ এবং অঞ্চল-৬ এ ডেসকো সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করছে।

সব মিলিয়ে এখন ডিএনসিসি এলাকায় ১৩ কিলোমিটারের বেশি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।

ডিএনসিসির প্রকৌশল দপ্তর সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসি নিজেও অনেকগুলো রাস্তা কেটেছে। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ের অন্তত ২০টি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এর বাইরে ফার্মগেট, আসাদগেট, মোহাম্মদপুর, রামপুরায় রাস্তা কাটা হচ্ছে। অনেক এলাকার কাজ শেষ পর্যায়ে আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহ. আমিরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করেননি।

এমএমএ/এমএইচআর/এএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]