খোঁড়াখুঁড়িতে পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা

মাহবুবুল ইসলাম মাহবুবুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩০ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০২১

পুরান ঢাকার আবুল হাসানাত রোডে নিজের দোকানের সিঁড়িতে থুতনিতে ভর দিয়ে বসে আছেন মিল্টন। গ্রিল-দরজা তৈরি করেন তিনি। এভাবে বসে আছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাস্টমার নেই ভাই। মাসের পর মাস রাস্তার যে অবস্থা, কাস্টমার আইব-ই ক্যামনে।’

মিল্টনের দোকান ঘেঁষে কেটে রাখা হয়েছে রাস্তা। কোনো ক্রেতা এলে দাঁড়ানোর মতো জায়গা নেই। শুধু মিল্টনের দোকানের সামনেই নয়, বংশাল সাইকেলপট্টি থেকে শুরু করে পাকিস্তান মাঠ হয়ে পুরোনো জেলখানা পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই খোঁড়া। এতে সারাবছর ব্যস্ত থাকা এ রাস্তাটি এখন খানাখন্দের কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

jagonews24

রোববার (২৬ সেপ্টেম্বর) পুরান ঢাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন বংশাল, পাকিস্তান মাঠ, আবুল হাসানাত রোড হয়ে পুরোনো কারাগার পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, পুরো রাস্তাই খোঁড়া। এসব রাস্তা দিয়ে মালামাল আনা নেওয়া করেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এখন মালামাল আনা নেওয়া করতে পারছেন না তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজাবাজার মসজিদের মোড় থেকে শুরু করে পাকিস্তান মাঠ পর্যন্ত আগাসাদেক রোডের পুরোটাই খোঁড়া। পুরোনো জেলখানার সামনে থেকে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়ে এ রাস্তায় এসে ঠেকেছে। এ রাস্তাটিতে কাজ চলমান। কোথাও ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে, কোথাও খুঁড়ে বসানো হচ্ছে পাইপ। আবার কোথাও পাইপ বসানো শেষে মাটি ভরাট করে ইটের খোয়া বিছানো হচ্ছে।

jagonews24

রাস্তাটির দুই পাশের মার্কেটগুলোতে পাইকারিসহ খুচরা জিনিসপত্রের বেশকিছু দোকান রয়েছে, যাদের নিয়মিত ভারী মালামাল আনা নেওয়া করতে হয়। ছোট ছোট পিকআপ ভ্যানে এসব মালামাল আনা-নেওয়া করা হলেও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে তা করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

বিষয়টি নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় ওই এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীর। তারা জানান, দুই মাস হলো রাস্তাটির এ অংশের কাজ শুরু হয়েছে। খোঁড়াখুঁড়ি চলছেই। এই দুই মাসে তাদের মালামাল আনা-নেওয়ায় অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভারী মালামাল আনা নেওয়া করতে পারছেন না তারা। এতে নিয়মিত ক্রেতার সঙ্গে খুচরা ও নতুন ক্রেতাও পাচ্ছেন না।

jagonews24

আফজাল নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমার দোকানের প্রতিটি মালামালই অনেক ওজনের। এসব আনা-নেওয়া করতে হলে সরাসরি ভ্যান কিংবা পিকআপ দোকানের সামনে আনতে হয়। কিন্তু রাস্তা খোঁড়ার কারণে তা হচ্ছে না। করোনার সময় যখন সব বন্ধ ছিল তখন কেন এসব কাজ শেষ করা হলো না।

সাতরওজা রাস্তার মোড়ে ঘরের বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র বিক্রি করেন ষাটোর্ধ্ব এক ব্যবসায়ী। কতদিন ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই মাস তো হবেই। ব্যবসায় সমস্যা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইডা বইলা আর কী করুম। এ অবস্থা তো অহন গোটা ঢাকা শহরেই।’

jagonews24

হাসেম আলী নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, উন্নয়ন হোক এইডা আমরাও চাই। কিন্তু মাসের পর মাস খোঁড়াখুঁড়ি চলবো, এটা তো যন্ত্রণার। ঝিমাইয়া ঝিমাইয়া কাম করলে তো জনগণের কষ্ট হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আগে চার ফুট পাইপ ছিল, তার তিন ফুটই ময়লা দিয়ে ভর্তি ছিল। পুরান ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশনের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করেই আমরা কাজটা করছি। আশা করি, আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবো।

একই অবস্থা ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন আজিমপুর থেকে লালবাগ রাস্তার। স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা থেকে লালবাগের দিকে যেতে প্রধান সড়ক শেষ হলেই শহীদ শাহ মাজার থেকে লালবাগ ছাতা মসজিদ পর্যন্ত রাস্তাটিতে কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। তবে এ রাস্তার চিত্র আবার একটু ভিন্ন। পাইপ বসানোর কাজ শেষ, বাকি শুধু রাস্তার ঢালাই। দুই মাসেরও বেশি সময় আগে ড্রেনের কাজ শেষ হলেও ঢালাইয়ের কোনো খবর নেই।

jagonews24

দোকানে ক্রেতা না থাকায় বাইরে চেয়ারে বসে আছেন এক স্টেশনারি ব্যবসায়ী। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে বলেন, রাস্তা খুঁড়ে রাখছে করোনার শুরু থেকেই। বছর দেড়েক তো হবেই। পাইপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে দুই মাস হলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঢালাইয়ের খবর নেই।

কাজ কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ কাজ দিয়া আমাগো কী হইবো? পাশেই সরকারি কোয়ার্টার। তাদের জন্য চওড়া পাইপ বসাইছে। এই পাইপ তো আমাগো চিন্তা করে বসায় নাই।

আজিমপুরে (অঞ্চল-বি) নির্মিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প কেন্দ্র করে তার চারপাশেই পয়ঃনিষ্কাশন সম্প্রসারণের জন্য রাস্তা খুঁড়ে চওড়া পাইপ বসানো হয়েছে। এ কাজের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার সামনের রাস্তা থেকে শুরু করে লালবাগ পর্যন্ত রাস্তাটি খোঁড়া হয় করোনার শুরুতে। পাইপ বসানোর কাজ শেষ হলেও এখনো রাস্তাটিতে ঢালাইয়ের কোনো খবর নেই।

jagonews24

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, কাজ বন্ধ রয়েছে বিষয়টা এমন নয়। রাস্তা ঠিক করার পর বালু ও ইটের খোয়া বিছিয়ে মাসখানেক রেখে দেওয়ার নিয়ম। যেন ঢালাই দেবে না যায়। এজন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

‘ধীরগতিতে কাজ হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ আছে’ উল্লেখ করলে তিনি বলেন, না না, ড্রেনের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র এক মাস। এখন যত দ্রুত সম্ভব ঢালাইয়ের কাজে হাত দেওয়া হবে।

এমআইএস/এমআরআর/এএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]