মুদ্রাপাচার দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলেছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০০ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০২১

সম্প্রতি কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ধরা পড়ার পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে অর্থপাচার। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, গত ১৬ বছরে অন্তত ১১ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে।

অর্থপাচারের এমন ভয়াবহ চিত্র নিয়ে জাগো নিউজের মুখোমুখি হয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার অভিমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই যেন স্বাভাবিক বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১১ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থপাচারের ঘটনা পুরোনো, কিন্তু এই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অবাক করেছে কি না?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: প্রথমত, অর্থপাচারের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু প্রতি বছর বিশাল অংকের অর্থ বাইরে পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ অর্থপাচার দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিনিয়োগের সুযোগ বিনষ্ট করছে এবং রাজস্ব আদায়ে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। সহজ কথা হচ্ছে, দেশের সম্পদ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতির ওপর যে বিশাল চাপ, তার অন্যতম কারণ অর্থপাচার এবং সবক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব কাজ করছে।

jagonews24

জাগো নিউজ: সরকারপক্ষ অর্থপাচারের এমন দাবি গ্রহণ করতে চাইছে না। বরং চলমান উন্নয়ন-অর্থনীতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত।

ড. ইফতেখারুজ্জামান: অস্বীকার করার মানসিকতা সরকারগুলোর পরম্পরায়। যখনই এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তখনই সরকারের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং কিছুটা আলোচনা হলেও তা একটি ফ্রেমের মধ্যে আটকে থাকে। কোনো প্রতিকার হয় না।

জাগো নিউজ: প্রতিকার না হওয়ার কারণ কী?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: যে প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার হয়, তার সঙ্গে সরকার বা রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ জড়িত। এ কারণেই তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে হয়। এখানে হাত দেওয়া যাবে না। হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী হওয়ার পরও অর্থপাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না এই প্রভাবশালী মহলের কারণে। রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা, যারা অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত, তারা সরকারের আনুকূল্য পেয়ে থাকে এবং তারা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী।

জাগো নিউজ: অর্থপাচারকারীরা শক্তিশালী বলে এই অস্বীকার করার প্রবণতা, নাকি জনমত বিপক্ষে যাবে বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: সরকার জনমতকে তোয়াক্কা করে বলে আমার মনে হয় না। জনমতকে একেবারেই গুরুত্বহীন ভাবে এখন।

অর্থপাচাররোধে কঠোর আইন আছে। যারা অর্থপাচারে জড়িত তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা দ্বিগুণ জরিমানা করারও আইন আছে। অথচ এই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। যদিও এখনকার পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই স্বাভাবিক বিষয়।

jagonews24

জাগো নিউজ: ব্যবস্থা গ্রহণের একাধিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তারা আসলে কী করছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: সর্বত্রই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সদিচ্ছার ঘাটতির কারণেই কেউ ব্যবস্থা নেয় না বা নিতে পারে না। এত সমস্যার কারণেও কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যদি প্রতিষ্ঠানগুলো সদিচ্ছা দেখাতে পারতো, তাহলে অনেক কিছুই সম্ভব। আমরা দেখেছি, সদিচ্ছা থেকেই কিন্তু বিগত সরকারের কারও কারও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অর্থ যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত আনা হয়েছে, তার মাধ্যমে ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু এখন আর সেই সদিচ্ছা কাজ করছে না। সরকারের সদিচ্ছা ঠিক বিপরীত ক্ষেত্রে। এ কারণেই প্রতিকার মিলছে না।

জাগো নিউজ: এই যে এত বিপুল অংকের টাকা বাইরে পাচার হচ্ছে, এতে গণমানুষের বঞ্চনা কতটুকু ঘনীভূত হচ্ছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: সাধারণ মানুষের অর্থই পাচার করে থাকে দুর্নীতিবাজরা। জনদায় থাকলে ১৬ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকা পাচার হতো না। বৈষম্য তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

জাগো নিউজ: বিরোধীপক্ষ ‘সংকুচিত গণতন্ত্র’র কথা বলে। এই অবস্থাকেই জনদায় না থাকার কারণ বলে উল্লেখ করা যায় কি না?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে গণতন্ত্রহীনতাকে আমি দায়ী করবো না। তাহলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের দায় কী? দুদক বা বাংলাদেশ ব্যাংক তো মূলত অকার্যকর। তারা জনদায়ের প্রশ্নে একেবারেই উদাসীন। যদিও রাজনৈতিক ধারা থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে।

এএসএস/এইচএ/এএসএম

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অর্থ যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত আনা হয়েছে, তার মাধ্যমে ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু এখন আর সেই সদিচ্ছা কাজ করছে না। সরকারের সদিচ্ছা ঠিক বিপরীত ক্ষেত্রে। এ কারণেই প্রতিকার মিলছে না

সাধারণ মানুষের অর্থই পাচার করে থাকে দুর্নীতিবাজরা। জনদায় থাকলে ১৬ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকা পাচার হতো না। বৈষম্য তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে

যে প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার হয়, তার সঙ্গে সরকার বা রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ জড়িত। আর এ কারণেই তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে হয়। এখানে হাত দেওয়া যাবে না। হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]