‘এই মুহূর্তে ইউপি ভোট নিরপেক্ষ করার সক্ষমতা নেই ইসির’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২১

ড. বদিউল আলম মজুমদার। নির্বাচন ও রাজনীতি বিশ্লেষক। সাধারণ সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর।

দীর্ঘ আলোচনায় গণতন্ত্র, সুশাসনসহ গুরুত্ব পায় অন্যান্য বিষয়। তার অভিমত, গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত না হলে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটতে পারে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: ফের নির্বাচন। ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আয়োজন চলছে। আস্থা-অনাস্থার প্রশ্নে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ পেতে হলে কী কী কারণে মানুষ নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তা অনুসন্ধান করতে হবে।

মূলত নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা একেবারেই নেই। যারা নির্বাচন পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিয়ে মানুষ আর সন্দেহ করে না। বরং মানুষ বিশ্বাস করে, কমিশন বিশেষ একটি দলের হয়ে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের সততা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ তারা যে ধরনের বক্তব্য বা তথ্য দেয়, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ।

এসব কারণে মানুষের মধ্যে যেমন নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আছে, আবার আরেকটি অংশের তৈরি হয়েছে অনাগ্রহও।

জাগো নিউজ: দায় শুধুই নির্বাচন কমিশনের?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: না। দায় মূলত সরকারের। সরকারের বিভিন্ন শক্তি নির্বাচনে প্রভাব রাখছে। যে কারণে নির্বাচন কমিশন চাইলেও ভোট সুষ্ঠু করতে পারছে না। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ধরনের ক্ষমতা রাখে, তাতে এ মুহূর্তে ইউপি নির্বাচন নিরপেক্ষ করার সক্ষমতা কমিশন রাখে না। কমিশন নিজেই তো পক্ষপাতদুষ্টু আচরণ করে আসছে।

jagonews24গত ২০ সেপ্টেম্বর ১৬০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়

জাগো নিউজ: যে অভিযোগ করছেন তা পুরোনো। অর্ধশত বছরের বাংলাদেশকে এ অবস্থায় পড়তে হলো কেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: রাজনীতিকরা দুভাবে রাষ্ট্র চালান। প্রথমত স্বপ্ন দেখিয়ে। দ্বিতীয়ত ভয় দেখিয়ে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দিনবদলের সনদের কথা বলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় এবং তখন অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সরকার আসলে মানুষকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করতে পারেনি। স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। তাই এখন ভয় দেখানোর পথে হাঁটতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ: এমনটি কেন মনে করছেন? সরকার তো উন্নয়নের মধ্য দিয়েই জনআস্থা তৈরি করছে বলে মনে করা হয়। দৃশ্যমান উন্নয়ন তো হচ্ছেও।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার আগে আওয়ামী লীগের আরেকটি প্রতিজ্ঞার কথা আলোচনায় আনা দরকার। আওয়ামী লীগ প্রতিজ্ঞা করেছিল, তারা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনবে। দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার যে সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার অঙ্গীকার করেছিল। সমঝোতা এবং ঐকমত্যের রাজনীতি শুরুর কথা ছিল, যা করতে তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি এবং দুঃশাসনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। এখনকার চিত্র কী! হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, গুম, হত্যা কি বন্ধ হয়েছে?

জাগো নিউজ: এই চিত্র বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও ছিল...

ড. বদিউল আলম মজুমদার: এই চিত্র থেকে উত্তরণ ঘটাতেই মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। বিএনপির দুঃশাসন নিয়ে আমরাও মাঠে কথা বলেছিলাম। এখনও বলছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি সেই অবস্থা থেকে বের হতে পারছে?

দুঃশাসনের পথে হেঁটেছে বলেই আওয়ামী লীগ জনসমর্থন হারিছে এবং যার প্রমাণ ছিল ২০১৩ সালের সব কয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি। এ কারণেই দলটিকে ভয় দেখানোর পথে হাঁটতে হয়েছে। ক্ষমতা দখলে রাখতে উপর্যুপরি জবরদখল করতে হচ্ছে।

বালুর ট্রাক দিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কার্যালয়ে আটকে রেখে যে নির্বাচন করেছে, তা থেকেই সব চিত্র ফুটে ওঠে। সরকার পরিকল্পিতভাবে সব জায়গায় বিভাজন করেছে। যারা সরকারের স্বৈরনীতির সঙ্গে একমত হয়নি, তাদেরই নানা তকমা দিয়ে হেনস্থা করা হয়েছে।

জাগো নিউজ: মানুষ তো মেনে নিচ্ছে? উন্নয়নে ভরসা রাখছে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: মেনে নিচ্ছে এটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না। প্রতিক্রিয়াও তো আছে। উন্নয়ন আসলে একশ্রেণির মানুষের হচ্ছে এবং তারা আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। অবৈধ এবং অন্যায় সুবিধা নিয়ে এখানে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে রাতারাতি। ব্যাংক লুট থেকে শুরু করে এমন কোনো কেলেঙ্কারি নেই, যা ক্ষমতাসীনরা করেনি।

jagonews24আবার শুরু হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ডামাঢোল

জাগো নিউজ: কিন্তু সাধারণ মানুষও উন্নয়নের সুবিধা পাচ্ছে…

ড. বদিউল আলম মজুমদার: উন্নয়নে সরকারের পলিসি একেবারে যে কাজে আসেনি, আমি তা বলছি না। কিন্তু উন্নয়নের মূল কারিগর হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পোশাকশ্রমিক, প্রবাসী এবং সাধারণ কৃষক-উদ্যোক্তারা এ উন্নয়নের নায়ক। বরং দুর্নীতি-অপশাসন তাদের অগ্রযাত্রার গতি থামিয়ে দিচ্ছে। এ উন্নয়ন মূলত লুটপাটের সড়ক আরও প্রসারিত করেছে।

উন্নয়ন বলতে সাধারণত বোঝানো হয় রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ। এগুলো অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু এখানে কী ঘটছে, তা-ও দেখতে হবে। ঋণের টাকায় কয়েকগুণ ব্যয় বাড়িয়ে সত্যিকার উন্নয়ন ঘটে না। সত্যিকার উন্নয়ন হচ্ছে, মানুষের চিন্তার উন্নয়ন। তার অবস্থার পরিবর্তন। মানবিক উন্নয়ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন দৃশ্যমান। কিন্তু মানের উন্নয়ন কি ঘটেছে?

জাগো নিউজ: দেশের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন কিন্তু বিশ্বমহলেও প্রশংসিত...

ড. বদিউল আলম মজুমদার: কিন্তু মানের অবনতি নিয়ে কি আলোচনা নেই? শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আসলে শিখছে কী? আপনি সংখ্যা দিয়েই তো সব মূল্যায়ন করতে পারেন না। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও শোচনীয়।

এএসএস/এইচএ/জিকেএস

মূলত, নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা একেবারেই নেই। যারা নির্বাচন পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আর কোনো বিশ্বাস নেই। নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিয়ে মানুষ আর সন্দেহ করে না। বরং মানুষ বিশ্বাস করে, কমিশন বিশেষ একটি দলের হয়ে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের সততা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ তারা যে ধরনের বক্তব্য বা তথ্য দেয়, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ

এই চিত্র থেকে উত্তরণ ঘটাতেই মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। বিএনপির দুঃশাসন নিয়ে আমরাও মাঠে কথা বলেছিলাম। এখনও বলছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি সেই অবস্থা থেকে বের হতে পারছে?

উন্নয়ন বলতে সাধারণত বোঝানো হয় রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ। এগুলো অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু এখানে কী ঘটছে, তা-ও দেখতে হবে। ঋণের টাকায় কয়েকগুণ ব্যয় বাড়িয়ে সত্যিকার উন্নয়ন ঘটে না। সত্যিকার উন্নয়ন হচ্ছে, মানুষের চিন্তার উন্নয়ন। তার অবস্থার পরিবর্তন। মানবিক উন্নয়ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন দৃশ্যমান। কিন্ত মানের উন্নয়ন কি ঘটেছে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]