সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ২১ লাখ নারী

ইসমাইল হোসাইন রাসেল
ইসমাইল হোসাইন রাসেল ইসমাইল হোসাইন রাসেল
প্রকাশিত: ০৮:২৪ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০২১
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কর্মজীবী নারীরা/ফাইল ছবি

নিজের অদম্য ইচ্ছাকে সম্বল করে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন তারা। এই অদম্য মানসিকতার নারীদের সহায়তার জন্য চারটি সামাজিক নিরাপত্তামূলক কমর্সূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব কর্মসূচির সুবিধাভোগী ২১ লাখের বেশি নারী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবে ভিজিডি কার্যক্রম, মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচি, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কর্মসূচি, নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এসব কার্যক্রমের ফলে একদিকে কর্মজীবী নারীরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন অনেকে।

কয়েক বছর আগেও শুধু স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করতেন পটুয়াখালীর সুমনা বেগম। এখন হাঁস-মুরগি পালন করে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সফলতার গল্প জানতে চাইলে সুমনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, কয়েক বছর আগেও আমার স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করা লাগতো। তিনি যেদিন কাজ করতে পারতেন না সেদিন না খেয়ে থাকা লাগতো। তিন বছর আগে আমি এক আত্মীয়ের পরামর্শে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি পালন শুরু করি। এক বছরের মাথায় লাভের মুখ দেখি। এখন আমার খামারে দেড় লাখ টাকার হাঁস-মুরগি আছে।

তবে এসব কর্মসূচির বিষয়ে বেশ কিছু অভিযোগও রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, ভিজিডি কার্যক্রম, মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচি, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কর্মসূচি, নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। টাকা দিলেই এসব সুবিধা পাওয়া যায়।

রাজশাহীর সামসুন্নাহার সামাজিক বেষ্টনীর কর্মসূচিতে মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য আবেদন করলেও মেলেনি কোনো আর্থিক সহায়তা। স্থানীয় অফিসে টাকা দিতে না পারায় তার নামটি রাখা হয়নি বলে অভিযোগ সামসুন্নাহারের। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমি খেটে খাওয়া গরিব মানুষ। গর্ভাবস্থায় কাজ করতে পারিনি। শুনেছিলাম কাগজ জমা দিলে নাকি টাকা দেবে। কাগজ নিয়া অফিসে গেলাম, আমাকে বললো হবে না। পরে একজন বললেন টাকা দিলে নাকি করে দিতে পারবেন। আমি টাকা দিতে পারিনি বলে সুবিধাও পাইনি।

জানতে চাইলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রামচন্দ্র দাস জাগো নিউজকে বলেন, নারী উন্নয়ন ও সমতার লক্ষ্যে আমাদের বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। আমাদের চারটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ২১ লাখ নারী সুবিধাভোগী রয়েছেন। ঋণ দেওয়ার বিভিন্ন কাজ আছে আমাদের, সেখান থেকে ঋণ নিয়ে নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আমাদের আরেও কিছু সংস্থা আছে, তারাও বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

jagonews24

প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন অনেক নারী/ফাইল ছবি

ভাতা প্রাপ্তিতে হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ এলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে দেখি। এটা মূলত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিগুলো থেকে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে আমাদের কাছে আসে। ভাতাভোগী নির্বাচনের ক্ষমতা স্থানীয়দের কাছে। সেখানে সমস্যা হলে, কোনো অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের এখান থেকে এগুলো যাচাই-বাছাই করে দেই।

ভিজিডি কর্মসূচি
ভিজিডি কর্মসূচি সরকারের সর্ববৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি। অসহায় এবং শারীরিকভাবে সক্ষম নারীদের উন্নয়নে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বী-আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে উন্নয়ন প্যাকেজ সেবার আওতায় নির্বাচিত এনজিওর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির উপকারভোগীরা সবাই নারী। এক্ষেত্রে প্রতিটি চক্র দুই বছর অর্থাৎ ২৪ মাস মেয়াদী। ২০২১-২০২২ চক্র শুরু হয়েছে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এবং শেষ হবে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এই সময়ে ৪৯২টি উপজেলায় উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪০ হাজার জন।

এসব উপজেলার ভিজিডি উপকারভোগীকে মাসে ৩০ কেজি গম বা চাল (প্রাপ্যতার সাপেক্ষে) এবং তিনটি পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলায় মাথাপিছু ৩০ কেজি করে আতপ চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম
২০১২-২০১৩ অর্থবছরে প্রশিক্ষণ খাতে বাজেট বরাদ্দ ৩১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভিজিডি উপকারভোগী নারীদের উন্নয়ন প্যাকেজ সেবার আওতায় প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ৬৪টি জেলায় কার্যক্রম চলছে। এক্ষেত্রে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই পূর্বক নির্বাচিত এনজিও চুক্তিবদ্ধ হয়ে উন্নয়ন প্যাকেজ সেবা প্রদান করছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতি উপকারভোগীর জন্য বার্ষিক ৪২৫ টাকা হারে এনজিওকে সার্ভিস চার্জ দেওয়া হয়। উন্নয়ন প্যাকেজ সেবার আওতায় এনজিওগুলো প্রশিক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা, আয়বর্ধক উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সঞ্চয় এবং চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে।

উপকারভোগীরা সাপ্তাহিক ১০ টাকা করে মাসে ৪০ টাকা সঞ্চয় জমা করছেন। এই টাকা এনজিও এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার যৌথ অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়। চক্র শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে মুনাফাসহ সঞ্চয়ের জমাকৃত টাকা উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

উপকারভোগী নারী ইচ্ছা করলে এনজিওদের নিকট হতে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে এনজিও তাদের উৎপাদন, বাজারজাত ও অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করবে। মানিকগঞ্জ জেলার ভিজিডি উপকারভোগী নারীরা ‘জয়িতা’য় তাদের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করছে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মাসে কমপক্ষে চারটি কেন্দ্রের খাদ্য বিতরণ এবং চারটি করে প্রশিক্ষণকেন্দ্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন। জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মাসে কমপক্ষে দুটি কেন্দ্রের খাদ্য বিতরণ এবং দুটি করে প্রশিক্ষণকেন্দ্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন।

jagonews24

কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচির আওতায় গর্ভধারণকাল থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ৫০০ টাকা হারে নগদ অর্থ পেয়ে থাকেন নারীরা

অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা-উপজেলা এবং সদর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা একক বা যৌথভাবে পরিদর্শন করেন। সদর কার্যালয়ের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে অন্যান্য কর্মসূচি পরিদর্শনের পাশাপাশি ভিজিডি কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পরিদর্শন করেন। তাছাড়া জেলা-উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তারা যৌথভাবে নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকেন।

প্রতি মাসে খাদ্য বিতরণের মাসিক প্রতিবেদন উপজেলা থেকে ৭ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। জেলা কার্যালয় উপজেলা থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন সমন্বয় করে সদর কার্যালয়ে ১৫ তারিখের মধ্যে পাঠায়। পরে ৬৪টি জেলার সমন্বিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২৫ তারিখের মধ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।

কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচি
কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচি মায়েদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রতি জাতীয় স্বীকৃতি। কর্মজীবী মায়েদের জন্য এই সহায়তা দরিদ্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টির উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি অন্যতম সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। যার মাধ্যমে গর্ভধারণকাল থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ৫০০ টাকা হারে নগদ অর্থ, আর্থ-সামাজিক ও সচেতনতামূলক সেবা প্রদান করা হয়। বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন রোধকল্পে শুধু ২০ বছরের অধিক বয়সী দরিদ্র কর্মজীবী গর্ভবতী-দুগ্ধদায়ী মায়েদের ক্ষেত্রে প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণকালে এ ভাতা দেওয়া হয়।

পাইলট কর্মসূচি হিসেবে প্রথম পর্যায়ে কর্মসূচিটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় অবস্থিত বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে এবং দেশের ৬৪টি জেলা সদরস্থ পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে ও সাভার উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৪-১৫ র্অথবছর থেকে বিকেএমইএর আওতায় চট্টগ্রাম জেলার নির্বাচিত গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানসমূহ এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। কর্মসূচির সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে দেশের সব পৌরসভায় সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমানে ভাতাভোগীর সংখ্যা দুই লাখ ৭৫ হাজার।

দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচি
পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র, গর্ভবতী মায়েদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাদের দুঃখ দুর্দশা লাঘব করার জন্য সরকার কর্তৃক ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ‘দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচি নেওয়া হয়, কার্যক্রমটি চলমান। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য দরিদ্র মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, মাতৃদুগ্ধ পানের হার বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থায় উন্নত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ বৃদ্ধি। এ কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র গর্ভবতী নারীদের ভাতা প্রদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে এনজিও-সিবিও এর মাধ্যমে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বর্তমানে ভাতাভোগীর সংখ্যা সাত লাখ ৭০ হাজার।

আইএইচআর/কেএসআর/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]