৬ বছরের মধ্যে পুরোনো কাপড় আমদানি বন্ধের পরিকল্পনা

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৯:০১ এএম, ২০ অক্টোবর ২০২১
ফাইল ছবি

দেশের তৈরি পোশাকখাতের সমৃদ্ধিতে গত এক দশকে কমেছে পুরোনো পোশাক আমদানি। প্রায় অর্ধেক কমেছে এ ধরনের পোশাক আমদানিকারকের সংখ্যা। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে পদার্পণের পর এ ধরনের কাপড়ের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যেই কাজ করছেন নীতি-নির্ধারকরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো কাপড় আমদানির ব্যবসা অন্য ব্যবসার মতো নয়। এতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। একদিকে দেশের বাজারে পুরোনো পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, অন্যদিকে সরকারের বিধিনিষেধ কঠোর করার কারণে এ ধরনের কাপড় আমদানি কমছে। এছাড়া এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে ভালো মানের শীতবস্ত্র। আগে কম দামের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে পুরোনো কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন দেশে উৎপাদিত শীতবস্ত্রই কম দামে মিলছে। তাই চাহিদা থাকছে না আমদানি কাপড়ের।

এ বিষয়ে পুরোনো কাপড় আমদানিকারক আফছার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা কাপড় আমদানির জন্য এলসি করেন। শীতের আগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে কাপড় চলে আসে। এখন আর পুরোনো কাপড়ের সেই বাজারটা নেই। বাজারে পুরোনো শীতবস্ত্রের চাহিদা নেমে এসেছে অর্ধেকে। গত বছরের আমদানি করা কাপড় এখনো অনেকের গোডাউনে পড়ে আছে।

বাংলাদেশ পুরাতন কাপড় আমদানিকারক সমিতির সভাপতি মাহবুব ইসলাম রুনু জাগো নিউজকে বলেন, একটা লাইসেন্সে এখন এক লাখ টাকার মাল আনা যায়। জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা থেকে আমদানিকারকরা কম্বল, সোয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেট, পুরুষদের ট্রাউজার, সিনথেটিক, ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্ট ও পশমের জ্যাকেট আমদানি করেন। তবে এই ব্যবসাটা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে সরকার।

jagonews24

‘ইচ্ছে করলেই যে কেউ পুরাতন কাপড় আমদানি করতে পারে না। প্রত্যেক জেলায় ডিসিরা কমিটি করে দেন। সেই কমিটির মাধ্যমে জেলা কোটায় পোশাক আমদানি করতে হয়। আমদানিকারকের লাইসেন্স থাকলেই যে তারা ১২ মাস কাপড় আনতে পারবেন সেটা কিন্তু সম্ভব না।’

ভালো করছে পোশাকখাত, লেফটওভার রপ্তানি করেও বিলিয়ন ডলার আয়
করোনা মহামারির মধ্যেও ভালো করছে দেশের পোশাকখাত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বরে ৩৪১ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০০ কোটি ডলার বেশি। চলতি বছর ৩৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এর বাইরে লেফটওভার (ত্রুটিযুক্ত কাপড়) রপ্তানিও হচ্ছে বিপুল অঙ্কের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লেফটওভার ফিলিপাইন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আফ্রিকায় হয় রি-এক্সপোর্ট। এই লেফটওভার রপ্তানির পরিমাণ প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আমাদের পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে প্রচুর এক্সপোর্টের জামাকাপড় বিক্রি হয়। এসবে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও।

৬ বছরের মধ্যে পুরোনো কাপড় আমদানি বন্ধ করতে চায় সরকার
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ও পোশাকখাতের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে পুরোনো কাপড় আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চায় সরকার।

Cloths.jpg

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শেষে নতুন আমদানি আদেশ (২০২১-২৪) জারি করবে সরকার। এরই মধ্যে আমদানি নীতির খসড়া তৈরি হয়েছে ও অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে ‘আমদানি নীতি ২০২১-২৪’ অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। এরপরই খসড়াটি গেজেট আকারে জারি করা হবে।

এর আগের আমদানি আদেশ ২০১৫-২০১৮ অনুযায়ী, একজন আমদানিকারক সর্বোচ্চ দুই টন পুরোনো কম্বল আমাদানি করতে পারতেন। নতুন নীতি অনুযায়ী তা অর্ধেক কমিয়ে এক টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।

একইভাবে সোয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেট (পুরুষ), পুরুষের ট্রাউজার আগে একজন আমদানিকারক সর্বোচ্চ ছয় টন পর্যন্ত আমদানি করতে পারতেন। নতুন আদেশে, আমদানি করা যাবে সর্বোচ্চ তিন টন করে। আর সিনথেটিক ব্র্যান্ডেড কাপড়ের শার্ট আমদানি করা যাবে দুই টনের জায়গায় সর্বোচ্চ এক টন।

Cloths.jpg

এর পরেরবার যে আমদানি নীতি জারি করা হবে তাতে ২০২৭ সাল থেকে পুরোনো কাপড় আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সে লক্ষ্যে আমদানি আদেশ ২০২৪-২৭ এ পুরোনো কাপড় আমদানি স্থায়ীভাবে বন্ধের বিধিমালা রাখা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি অনুবিভাগ) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। বাড়ছে মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। এসব কারণে মানুষ বিদেশে ব্যবহৃত পুরোনো কাপড় আর কিনতে চায় না। আমরা উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করছি। এমন অবস্থায় পুরাতন কাপড় আমদানি বাংলাদেশের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

‘এখন নতুন আমদানি নীতিতে পুরোনো কাপড় আমদানির পথ সংকুচিত করা হচ্ছে। এটাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে পদার্পণের পর।’

এ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা মাহবুব ইসলাম রুনু বলেন, আমরাও চাই আমদানি বন্ধ হোক। বিদেশি কাপড়ের আগের বাজার আর নেই। এটা বন্ধ হলে আমাদের টাকাও সেভ হয়। আমাদের এখন স্টক, লট প্রচুর বের হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আমরা বলেছি, এক লাইসেন্সে ৫০ হাজার টাকার মাল কিনে তা বিক্রি করতে পারছি না। সেটা কেন এক লাখ টাকা করা হয়েছে? তারা আমাদের জানিয়েছে, সেটা পুনরায় ৫০ হাজার করা হবে। আর ধীরে ধীরে বন্ধ করা হবে পুরোনো কাপড় বিক্রি।

এসএম/এমএইচআর/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]