কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে শুরুতেই বিপত্তি

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
তৌহিদুজ্জামান তন্ময় তৌহিদুজ্জামান তন্ময় , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪৩ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২১

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীতে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। একই সঙ্গে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে যানজট। শহরের এ সমস্যা কমিয়ে আনতে ছয় বছর আগে, ২০১৫ সালে রাজধানীর সড়কে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার দফায় স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করেছিল সিটি করপোরেশন। তবে অব্যবস্থাপনায় সেগুলো পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এবার রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর আশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল সিস্টেম বসানোর কাজ চলছে। তবে এতেও বেঁধেছে নতুন বিপত্তি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রাস্তায় থাকা অবৈধ ডিশ ও ইন্টারনেট ক্যাবল অপসারণের সময় এ প্রকল্পের গুলশান ও মহাখালী এলাকার প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ক্যাবল কেটে ফেলেছে। এ কারণে প্রকল্পটি চালু করা যাচ্ছে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এ সিগন্যাল সিস্টেম বসানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। নতুন সিস্টেম বসানোর পর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ডিএমপি। দেখভালের দায় দুই সিটি করপোরেশনের।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রযুক্তি ব্যবহারে অতিসূক্ষ্মভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতিও কমে আসবে। এতে কমে যাবে জনবলের চাহিদা।

jagonews24

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল সিস্টেম চালু করতে জাপানিজ কোম্পানি নিপ্পন কই থেকে কেনা হয়েছে প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ। এর মধ্যে রয়েছে- সিগন্যাল মেইনটেনেন্স সরঞ্জাম, সিসিটিভি, ইমেজ ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, হাই রেজ্যুলেশনের আল্ট্রাসনিক ভেহিকেল ডিটেকটিভ ডিভাইস, ক্যাবল ও বিশেষ পোল। রয়েছে সিগন্যাল পোস্ট ও উচ্চ আলো ছড়ানোর লাইট।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সূত্রে জানা যায়, ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে পাইলট প্রজেক্টের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, পল্টন ও ফুলবাড়িয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত মোড়ে এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল সিস্টেম স্থাপন করা হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই বাতি নিজ থেকেই গাড়ির সংখ্যা শনাক্ত করে সংকেতের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেয়। গাড়ির সংখ্যা বুঝে ট্রাফিক সিগন্যাল চালু ও বন্ধ করার সংকেত দেয় সেন্সর ক্যামেরা ডিভাইস। ২৫০ মিটার এলাকা কাভার করতে পারে এ ধরনের সেন্সর ক্যামেরা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে ব্যবহার
এখনো পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পুরোনো পদ্ধতিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর ট্রাফিক সিগন্যালের লাইটগুলো পরিবর্তিত হয়। এ পদ্ধতিটি যুগোপযোগী নয়। কারণ যান চলাচলের একদম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত কোনো রুটিন নেই। যানজট থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে, দ্রুত ট্রাফিকের চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। এর ভিত্তিতে ট্রাফিক সিগন্যালগুলো পরিবর্তন করে কোনো একটি এলাকা বা রাস্তার যানবাহন নিয়ন্ত্রণের তাৎক্ষণিক সঠিক নির্দেশনা দেওয়া।

এ কাজটি মানুষের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সূক্ষ্ম ও নির্ভুলভাবে করতে সক্ষম। এজন্য বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থার কয়েকটি দিক খানিকটা ঢেলে সাজাতে হবে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েকটি ধাপে যানজট কমানোর চেষ্টা করবে।

যানবাহন শনাক্তকরণ ও তথ্য সংগ্রহ
ট্রাফিক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করতে জনবহুল রাস্তাগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা বসানো হবে। এগুলো আবার যুক্ত থাকবে একটি করে কম্পিউটারের সঙ্গে। এই কম্পিউটারে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্যামেরাটিতে ধারণ করা দৃশ্যে ছোট-বড় নানা ধরনের যানবাহনকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারবে। এছাড়া রাস্তায় থাকা সেন্সরগুলোর সাহায্যে ক্যামেরায় গৃহীত তথ্যগুলো আরও নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। এসব তথ্য ধারণ করার পর দ্রুত তা একটি কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ব্যবস্থায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাটিই হবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র। বিভিন্ন অঞ্চলের ক্যামেরা থেকে পাঠানো এসব তথ্য থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিখুঁতভাবে জানতে পারবে ঠিক সেই মুহূর্তে কোথায় কতটি গাড়ি আছে এবং কোন দিকে যাচ্ছে।

jagonews24

সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ
পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে হলে এ দায়িত্বটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দিতে হবে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ট্রাফিক সিগন্যালের লাইট নিয়ন্ত্রণ করবে। যানবাহনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে সিস্টেম বুঝতে পারবে কোন পয়েন্টে গাড়ির ঘনত্ব কেমন। কোন দিক থেকে কোন দিকে কতগুলো গাড়ি যেতে দিলে তার প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়বে। এসব হিসাব করে সিগন্যাল লাইট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গোটা অঞ্চলকে যথাসম্ভব যানজটমুক্ত রাখার চেষ্টা করবে নতুন ধরনের এ ট্রাফিক সিগ্যাল সিস্টেম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (টিএমপিটিআই) মোহাম্মদ রবিউল আলম জাগো নিউজকে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সংকেতবাতিগুলো সাধারণ সংকেতবাতি থেকে আলাদা। সাধারণ বাতিগুলোতে কত সেকেন্ড পর পর সবুজ বাতি বা লাল বাতি জ্বলবে, তার সময় নির্ধারণ করা থাকে। এখানে সময় নির্ধারণ করা থাকবে না। ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম নিজে নিজে সিদ্ধান্ত দেবে কোন দিকে গাড়ি চলাচলের জন্য বা বন্ধ করার বাতি জ্বালাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এ প্রযুক্তি সড়কে থাকা রিকশা বা সাইকেল চিনতে পারবে না। শুধু ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চিনবে। এ কারণে সড়কে রিকশা না চললে কিছুটা যানজট স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।

jagonews24

শুরুর আগেই বড় বিপত্তি
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী নতুন ধরনের সিগন্যাল সিস্টেম চালুর কথা ছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু জাপান থেকে কেনা প্রকল্পের অর্ধকোটি টাকা মূল্যের সার্ভার কম্পিউটার চুরি হয়ে যায়। এরপর সেটি কেনা হয় পুনরায়। এরপর শুরু হয় আরেক বিপত্তি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রাস্তায় থাকা অবৈধ ডিশ ও ইন্টারনেট ক্যাবলের সঙ্গে ডিটিসিএর এ প্রকল্পের গুলশান ও মহাখালী এলাকার প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ক্যাবল কেটে ফেলে। ঘটনার পর প্রায় বছর পেরিয়ে গেলেও এ সমস্যার সমাধান হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম জাগো নিউজকে বলেন, রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, পল্টন ও ফুলবাড়িয়া- এই চার স্থানেই ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেমের (আইটিএস) ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, সিগন্যাল মেইনটেনেন্স সরঞ্জামাদি, ইমেজ ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, হাই রেজ্যুলেশনের আল্ট্রাসনিক ভেহিকেল ডিটেকটর, ক্যাবল, পোল, সিগন্যাল পোস্ট ও সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হয়েছে। শুধু বাকি ছিল অ্যাডজাস্টমেন্ট। করোনার কারণে সে কাজ পিছিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি সার্ভার কম্পিউটার হারিয়ে যায়। সেটি পুনরায় কেনা হয়। পরে গণঅভিযানের মধ্যে ডিটিসিএর আপত্তির পরও কয়েক কোটি টাকার ক্যাবল কেটে নিয়ে যায় উত্তর সিটি করপোরেশন। এ কারণে আর চালু করা যায়নি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সংকেতবাতি।

ডিএনসিসি ক্যাবল কিনে না দিলে বা ফিরিয়ে না দিলে এ প্রকল্প থমকে থাকবে কি না জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, আমরা বারবার যোগাযোগ করছি। ডিএনসিসি আমাদের শুধু ঘোরাচ্ছে। এখন এ প্রকল্প কবে নাগাদ চালু করা সম্ভব হবে তা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয় সমস্যা সম্পর্কে অবগত। তবে আশা করছি শিগগির এ প্রকল্প চালু হবে।

টিটি/এমএইচআর/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]