‘দিনের পর দিন শান্তির পথ বন্ধ থাকলে বিপদ আসবেই’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৫ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০২১

ড. বদিউল আলম মজুমদার। নির্বাচন ও রাজনীতি বিশ্লেষক। সাধারণ সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজ-এর।

দীর্ঘ আলোচনায় গণতন্ত্র, সুশাসনসহ গুরুত্ব পায় অন্যান্য বিষয়। তার অভিমত, গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত না হলে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটতে পারে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ: আগের পর্বে আলোচনা হচ্ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের কাউকে কাউকে প্রভাব বিস্তারে দেখা যায়, কারণ কী? এর মধ্য দিয়ে তো সরকার পরিবর্তন ঘটে না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রভাব রাখতে হয়েছে বিশেষ কৌশল হিসেবে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যরা (এমপি)। এটি সরকারি দলকে নৈতিকতার প্রশ্নে বড় বেকায়দায় ফেলে। বৈধতার এই সংকট থেকে মুক্তি পেতেই সরকারকে সব জায়গায় দখলের নীতি অবলম্বন করতে হয়।

আপনি যদি লক্ষ্য করেন, দেখবেন এমন অবৈধ নির্বাচনের পক্ষেও অনেক ব্যক্তি সাফাই গায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবীদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেলো এমন নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য।

জাগো নিউজ: তাতে কি এ সংকট দূর হয়েছে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: না। তাতে আরও সংকট বেড়েছে।

জাগো নিউজ: তাহলে সরকারকে একই পথে বারবার হাঁটতে হচ্ছে কেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: এই মুহূর্তে সরকারের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। এ কারণেই তারা মনে করে, যে কোনো উপায়েই ক্ষমতায় থাকতে হবে। দখল হচ্ছে সব নির্বাচনেই। কিন্তু কৌশল ভিন্ন। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কৌশল নিতে হয়েছে। ২০১৮ সালে মধ্যরাতে ব্যালটবাক্স ভর্তি করার কৌশল নিতে হয়েছে।

কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকতে যত কৌশলই নিয়ে থাকুক, তাতে দলটির প্রতি জনআস্থা মানুষের কমেছে।

জাগো নিউজ: জনঅনাস্থার কথা বলছেন, তারপরও তো সরকার টিকে গেলো...

ড. বদিউল আলম মজুমদার: বলপ্রয়োগে টিকে আছে। কিন্তু এটাকে কি আসলে টিকে থাকা বলে?

জাগো নিউজ: জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমনকি খালেদা জিয়াও বলপ্রয়োগ করে টিকতে পারেননি। তার মানে টিকে থাকতে জনআস্থাও জরুরি…

ড. বদিউল আলম মজুমদার: ওই সময়ের রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আদর্শ-নীতিবোধ ছিল এখন তো সেটা নেই। মানুষকে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিস্বার্থের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করা হয়েছে। আইন-আদালত তো সবই ভেঙে পড়লো। এই পরিস্থিতিকে টিকে থাকা বলে না। বরং সামনের দিনে কী ঘটবে সেটাও চিন্তায় রাখা দরকার।

জাগো নিউজ: এমন নির্বাচন আর ভোট ব্যবস্থাই কি মানুষ সামনের দিনে দেখবে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমরা ভয়াবহ এক সংকটের মধ্যে আছি। চারদিকে মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে আপনি ভালো কিছু আশা করতে পারেন না।

জাগো নিউজ: রাজনীতি নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে হতাশা থাকলেও অনেকের ইতিবাচক মনোভাবও আছে। কিন্তু তরুণরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে ভাবনার প্রকাশ দেখাচ্ছেন না। এর কী কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: ভয়ের রাজত্ব তৈরি হলে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে ভয় পায়। সামরিক সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে ভেঙে পড়েনি। এখন সবই নিয়ন্ত্রিত। কেউ আর স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।

জাগো নিউজ: শুধুই জবরদখল? নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বেও আস্থা আছে তরুণদের?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তার মধ্যে অবশ্যই নেতৃত্বের গুণাবলি আছে, যা একটি অংশের কাছে আস্থা তৈরি করেছে।

প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিকল্প তৈরি হয়নি। প্রধান বিরোধী দলের (বিএনপি) মধ্যে নেতৃত্বের যে ভয়াবহ সংকট তা ভারসাম্যের রাজনীতিকে আরও বিনষ্ট করছে। তার মানে ভালো কিছু আমাদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করছে না।

জাগো নিউজ: আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ঠিক তাই হবে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: আরও খারাপ কিছু ঘটবে। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল বলে তীব্র সংঘাত হয় এবং সহিংসতার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।

এবারের নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো আকর্ষণ নেই। মানুষ জানে, সরকারি দলের প্রতীক যে পাবে এবার সেই জয়ী হবে। এ কারণে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে।

জাগো নিউজ: এর বিপরীতের আলোচনাও আছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু দেখাতে চাইবে বলে প্রচার আছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: এটি সত্য হলে আমি অবশ্যই খুশি হবো। কারণ আমরা যে পথে যাচ্ছি, বন্ধুর পথ। এ পথে মুক্তি নেই। সরকারসহ সবার মধ্যে বোধোদয় ঘটুক। দিনের পর দিন শান্তির পথ বন্ধ থাকলে বিপদ আসবেই। উগ্রবাদের বিস্তার চারদিকে।

আমি প্রত্যাশা করি ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থা ফের ট্র্যাকে উঠুক। প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হোক। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ধারা প্রসারিত হোক।

এএসএস/এইচএ/এমএস

ওই সময়ের রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আদর্শ-নীতিবোধ ছিল এখন তো আর সেটা নেই। মানুষকে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিস্বার্থের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করা হয়েছে। আইন-আদালত তো সবই ভেঙে পড়লো। এই পরিস্থিতিকে টিকে থাকা বলে না। বরং সামনের দিনে কী ঘটবে সেটাও চিন্তায় রাখা দরকার

শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তার মধ্যে অবশ্যই নেতৃত্বের গুণাবলি আছে, যা একটি অংশের কাছে আস্থা তৈরি করেছে। প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিকল্প তৈরি হয়নি। প্রধান বিরোধী দলের (বিএনপি) মধ্যে নেতৃত্বের যে ভয়াবহ সংকট তা ভারসাম্যের রাজনীতিকে আরও বিনষ্ট করছে। তার মানে ভালো কিছু আমাদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করছে না

এবারের নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো আকর্ষণ নেই। মানুষ জানে, সরকার দলের প্রতীক যে পাবে এবার সেই জয়ী হবে। এ কারণে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে

সরকারসহ সবার মধ্যে বোধোদয় ঘটুক। দিনের পর দিন শান্তির পথ বন্ধ থাকলে বিপদ আসবেই। উগ্রবাদের বিস্তার চারদিকে। আমি প্রত্যাশা করি ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থা ফের ট্র্যাকে উঠুক। প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হোক। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ধারা প্রসারিত হোক

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]