খালেদার বিদেশে চিকিৎসা: আইন কী বলে?

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৭ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০২১

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নেই বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা গুরুতর বলে তার দল ও পরিবারের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে। এজন্য বিদেশে নিয়ে তাকে চিকিৎসার সুযোগ দিতে সরকারের কাছে আবেদনও জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি এ সুযোগ দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছে বিএনপি।

অন্যদিকে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনের মধ্য থেকেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে হলে সাজার স্বঅবস্থানে (কারাগারে) ফিরে যেতে হবে।

দুর্নীতির দুটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া কারাবন্দি ছিলেন। গত বছরের মার্চে করোনা মহামারি শুরু হলে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত করে কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে সরকার শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়। সেই শর্তের মধ্যে আছে তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। পরে দফায় দফায় সেই মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। তিনি এখন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার দাবিকে ঘিরেই এখন সরগরম রাজনীতির মাঠ।

আসলে আইনের ব্যাখ্যা কী? খালেদা জিয়ার সাজার শর্ত বদলাতে হলে করণীয় কী? এটি রাজনৈতিক ইস্যু হলো কি না? এমন প্রসঙ্গ নিয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে নানান আলোচনা। কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। আপনার মতামত জানতে চাই।

শাহদীন মালিক: খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা নিয়ে আমি কিছু বলছি না। আমি ধরে নিয়েছি, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। কারণ আইনের ব্যাখ্যা তো আইনমন্ত্রীর কাছ থেকেই আসে সাধারণত। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সব কিছুই জানা হয়তো সম্ভব নয়। কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা সচিবের কাছ থেকেই ব্যাখ্যা নেওয়ার কথা।

তার মানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা বলেই ধরে নিতে হবে।

জাগো নিউজ: আপনি সে ব্যাখ্যায় দ্বিমত পোষণ করেছেন। আপনার ব্যাখ্যা কী?

শাহদীন মালিক: হ্যাঁ আমি আইনমন্ত্রীর এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছি। আমি বলছি না যে আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ভুল। আবার আমারটাও শতভাগ সঠিক বলছি না। আইনমন্ত্রীও আইনজীবী এবং আমিও আইনজীবী। একই বিষয় নিয়ে আমরা আইনজীবীরা একে অপরের বিপক্ষে মামলায় লড়াই করি।

জাগো নিউজ: আইনমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার সাজা যে শর্তে স্থগিত করা হয়েছে, তা বদলাতে হলে তাকে জেলখানায় গিয়ে ফের আবেদন করতে হবে। এটিই আইনের ব্যাখ্যা?

শাহদীন মালিক: এখানেই ঠিক আমার দ্বিমত। প্রথমত এরকম কথা আইনের ৪০১ ধারায় বলা নেই। দ্বিতীয়ত, প্রথম যে শর্তে তার সাজা স্থগিত করা হয়েছে তা তো বদলানো হয়েছে। শর্ত ছিল সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত এবং বাসায় বসে চিকিৎসা করাতে পারবেন। এই শর্ত তো থাকেনি। সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং খালেদা জিয়া বাসায় থেকেই আবেদন করেছেন। শর্ত বদলাতে খালেদা জিয়া ফের জেলখানায় যাননি। স্পষ্টতই প্রথম শর্তের একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সুতরাং আরেকবার পরিবর্তনে আমি কোনো আইনি বাধা দেখছি না। আমি প্রথম থেকেই এ কথা বলে আসছি।

জাগো নিউজ: খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকেও আবেদনের বিষয়টি খুব স্পষ্ট করা হয়নি...

শাহদীন মালিক: হ্যাঁ। এটিও অবাক করেছে। খালেদা জিয়াকে বিদেশে কোথায় চিকিৎসা করানো হবে, তা কিন্তু আমরা এখনো জানতে পারিনি। তিনি মালদ্বীপ যাবেন নাকি সিঙ্গাপুরে যাবেন নাকি লন্ডনে যাবেন, তা তো বলছেন না। বিদেশে যে কোনো ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট পাঠিয়েও কিন্তু পরামর্শ নেওয়া যায়। আসলে কোথায় গেলে ভালো হবে... যদি আবেদন করে বলে যে আমি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথে যেতে চাই, তাহলে কিন্তু এক ধরনের বার্তা পাওয়া যায়। সরকার তো খোলা আদেশ দিতে পারে না। আপনি অফিস থেকে ছুটি চাইলেও কোথায় যাবেন, কেন যাবেন, তা স্পষ্ট করতে হয়। বিএনপি খোলাসা করেনি। সরকারও ঠিক বুঝতে পারছে না।

জাগো নিউজ: দুই পক্ষের অবস্থান থেকে সাধারণ মানুষের ধারণা ‘খালেদা জিয়ার বিদেশ চিকিৎসা’ এখন রাজনৈতিক ইস্যুও! আপনারও কি তাই মনে হয়?

শাহদীন মালিক: আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। মিডিয়া থেকেও জেনেছি। তার সুচিকিৎসাটাই বিএনপির জন্য মুখ্য হওয়া উচিত। সুনির্দিষ্টভাবে আবেদন করলে পানি এতদূর গড়াতো না। অনর্থক বিতর্ক কেন তোলা হলো, আমার জানা নেই। আমি বলবো, বিষয়টি উভয়পক্ষই ঘোলাটে করছেন।
----
----
জাগো নিউজ: আপনি বলছেন, খালেদা জিয়ার সাজার শর্ত বদলাতে হলে ফের জেলখানায় যেতে হবে। আগেও শর্ত বদলানো হয়েছে, কিন্তু তিনি ফের জেলে যাননি...

আনিসুল হক: বিএনপি বা খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইনটা আগে ভালো করে দেখুন। তারপর আলোচনা হতেই পারে। জেলখানায় গিয়েই করতে হবে আমি ঠিক এভাবে বলিনি। আমি বলেছি, শর্ত বদলাতে হলে যথার্থভাবে আবেদন করতে হবে।

জাগো নিউজ: তাহলে কি আগের আবেদনগুলো যথার্থ ছিল না?

আনিসুল হক: আমরা তাকে আর অ্যারেস্ট (গ্রেফতার) করিনি। তিনি বাসা থেকেই আবেদন করেছেন। কিন্তু আগের আবেদন আর বিদেশ যাওয়ার বিষয়টির মধ্যে বহু তফাৎ আছে।

জাগো নিউজ: এই তফাতের বিষয়টাই যদি...

আনিসুল হক: আগের আবেদন শুনানির পর নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সাজা স্থগিত করার পর জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন। এখন যদি শর্ত যুক্ত করতে হয় এবং বাতিল করতে হয়, তাহলে স্বঅবস্থানে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হবে। আইনে তাই বলা আছে। আইনে ফিরে গিয়ে তো কথা বলতে হবে।

জাগো নিউজ: আইনের ব্যাখ্যা দিলেন। খালেদা জিয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় গুরুত্ব পাচ্ছে কি না?

আনিসুল হক: খালেদা জিয়ার বিষয়টি সরকার রাজনৈতিক জায়গা থেকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

আমরা কিন্তু খালেদা জিয়ার আচরণও দেখেছি। অনেক অনুরোধ করার পরও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিন ১৫ আগস্ট তিনি জন্মদিন পালন করেছেন। অথচ ওই দিন তার আসল জন্মদিন নয়। জাতিরজনকের প্রতি সামান্য সম্মানবোধ থাকলে তিনি এটি করতে পারতেন না। বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের (আরাফাত রহমান কোকো) যখন মৃত্যু হলো, প্রধানমন্ত্রী দেখতে গেলেন (খালেদা জিয়ার বাড়িতে)। প্রধানমন্ত্রীর মুখের ওপর গেট বন্ধ করে দেওয়া হলো। এটি তো দেশবাসী জানেন।

এরপরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার প্রতি যে সহানুভূতি দেখিয়েছেন, তা কি যথেষ্ট নয়?’

জাগো নিউজ: এ কারণে খালেদা জিয়া সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু আমি অধম হলে আপনি অবশ্যই উত্তম হবেন...

আনিসুল হক: আমি বলছি না যে, আমি উত্তম হবো না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে উত্তম হয়েছেন, তার প্রমাণ রেখেছেন। এরপর আর উত্তম হওয়া যায় না।

যারা আইনের ব্যাখ্যা চাইছেন, তারা আইনটা পড়ুন। আইন তো আমি পকেটে নিয়ে ঘুরছি না। প্রকাশিত বিষয়।

জাগো নিউজ: এ পরিস্থিতির মধ্য থেকে খালেদা জিয়ার শেষ পরিণতি হলে রাজনৈতিক কোনো মোড় ...?

আনিসুল হক: আমি মনে করি না এটি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব পাবে। আমাকেও একদিন মরতে হবে। তাছাড়া তার প্রতি যে সহানুভূতি দেখানো হয়েছে, এর বাইরে আর কিছু করার নেই।

এএসএস/এইচএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]