টিসিবির লাইন দেখলেই বোঝা যায় অভাব কত ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিয়েছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৫ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। অধ্যাপনা করছেন বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা, সরকারের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের।

সরকারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার অভাবেই বাজার পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে উঠছে বলে মত তার। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ: বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ ব্যাপক চাপে আছে বলে আলোচনা করেছেন আগের পর্বে। কিন্তু মানুষ মাঠে নেমে এই অবস্থার অবসান চাইছে না, এর কী কারণ?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: এর নানামুখী কারণ আছে। প্রথমত, অভিযোগ করে কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং তাকে হেনস্তা হতে হয়। দ্বিতীয়ত, সরকার এই অভিযাগগুলো স্বীকার করতে চায় না। রাজনৈতিকভাবেই এসব অভিযোগ মোকাবিলা করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। তাহলে মাঠে নেমে লাভ কী? মানুষ এখন ভয় পায়। ভয়ের পরিবেশ তো তৈরি হয়েছে।

মিডিয়াও নিয়ন্ত্রিত। মিডিয়ায় কোনো সমস্যার কথা প্রচার করা হচ্ছে না। সফলতার খবর প্রচার হচ্ছে। সব মিডিয়াই সরকারের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। জনগণের পক্ষ নেই।

জাগো নিউজ: কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা বেষ্টনী তো তৈরি হয়েছে। সরকারের নানা কর্মসূচির মাধ্যমে গরিব মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ: হ্যাঁ, সরকার বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছে, তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু সে সেবা কজন পাচ্ছেন? শহরের সাধারণ মানুষের জন্য (সরকার) কী করছে? টিসিবির পণ্য কয়জন পাচ্ছেন?

সরকার অল্পমূল্যে পণ্য বিতরণ বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য দিচ্ছে, তা অবশ্যই ভালো। কিন্তু এটির ব্যাপকতা তো বাড়ানো দরকার ছিল। আপনি টিসিবির পণ্য কিনতে লাইন দেখলেই বুঝবেন মানুষের মধ্যে অভাবটা কত ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিয়েছে।

জাগো নিউজ: তার মানে টিসিবির মূল্য বিতরণে ব্যাপকতা আনলেই কিছুটা সমাধান?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমি মনে করি যে শুধু টিসিবি পারবে না। টিসিবি সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা সম্পর্কে সবাই অবগত। তাছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এখানে বেসরকারি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত করা সম্ভব। বহু সামাজিক সংগঠন আছে যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে চায়। পাড়া-মহল্লায় ক্লাব, সমিতি রয়েছে। তাদের কাজে লাগানো যায়। এনজিওগুলোকে দায়িত্ব দিলে জবাবদিহি বাড়বে। আসলে সরকার কতটুকু আন্তরিক তার ওপরই নির্ভর করে।

jagonews24

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মানুষকে ভোগাচ্ছে চালের বাজার/ফাইল ছবি

কৃষকের কাছ থেকে আপনি ন্যায্যমূল্যে কিনুন। তাদের কম দেওয়া যাবে না। মাঝখানের মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করুন। ক্রেতাও কম দামে কিনতে পারবেন। কেউ ঠকবে না। এমন অস্থির পরিস্থিতিও তৈরি হবে না। ঢাকায় একটি লাউ ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ একজন কৃষক সেই লাউ মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। বাকি ৫০ টাকা কার পকেটে গেল? এই ৫০ টাকায় উৎপাদক এবং ভোক্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কোনো সমাধান মিলবে না। এটি সরকারের দায়। সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে মাঝখানের ৫০ টাকা এভাবে ক্রেতাকে বেশি গুনতে হতো না।

জাগো নিউজ: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ইতোমধ্যে। ধানের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ চালের দাম আরও বাড়বে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ: ধানের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে চালের দাম বাড়ে না। চালের দাম কত, ধানের দম কত—এ হিসাবটাও রাখা জরুরি। মূলত মিলমালিকদের কারসাজির কারণে চালের দাম বাড়ে। চালের অতিরিক্ত দাম তো কৃষক পাচ্ছে না। কৃষক তো ন্যায্যমূল্যই পাচ্ছে না। তাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার বাজারে গিয়ে যখন পণ্য কিনছে, ওই কৃষককেই বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।

কৃষকের ফসল সংরক্ষণের জন্য আমরা এতদিনেও কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলাম না। গুদামের অভাবেই তাদের অল্প মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। গুদামগুলোকে সংরক্ষণ করাও অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। জায়গাও বেশি থাকে না।

জাগো নিউজ: মধ্যবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সমাজের এ পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

সালেউদ্দিন আহমেদ: হ্যাঁ। এদিকটা খারাপের দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত। সমাজ পরিবর্তনে মধ্যবিত্ত মানুষই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের আর্থিক পরিবর্তন মানেই অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। কিন্তু সেই সংখ্যায় ভাটা পড়ছে। দিন দিন মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। উচ্চবিত্ত মানুষ সমাজের অস্থিরতার সুযোগ নেয়। নিম্ন-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ কষ্ট করে হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু মধ্যবিত্ত চাইলেও রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে না। জিনিসের দাম বাড়ছে, কিন্তু মধ্যবিত্তদের আয় কমছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানে তারা দিশেহারা।

মধ্যবিত্তদের চাহিদা বাজার এবং উৎপাদনে গতি আনে। এ চাহিদায় ভাটা পড়লে বাজার পড়ে যাবে। অর্থনীতি তখন অবশ্যই গতি হারাবে। মধ্যবিত্তদের কেনা-কাটা বা সেবাগ্রহণের ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে। করোনার মধ্যে এ চাহিদা কমে গেছে। আপনি শপিংমলগুলোর চিত্র দেখেন। অনেকেই পথে বসে যাচ্ছে। আপনি ভারত এবং চীনের দিকে তাকান। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

জাগো নিউজ: করোনা পরিস্থিতির কথা বললেন। গত দু’বছরে বিপর্যস্ত জনজীবন। সাধারণ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে কী পরামর্শ দেবেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: করোনার কারণে আমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা দেখলাম। এ অব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষই। সরকার যে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না, তার প্রমাণ হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম। একই চিত্র সব জায়গায়ই। সাধারণ মানুষকেই সবার আগে ঠেকতে হচ্ছে।

jagonews24

টিসিবির পণ্য কেনার লাইন দিনে দিনে দীর্ঘ হচ্ছে/ফাইল ছবি

করোনায় সব হারিয়েছে অনেকে। বেঁচে থাকাই দায়। সরকার নানা প্রণোদনা দিয়েছে। এটি ভালো দিক। অনেকেই সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু এ প্রণোদনা খুবই অপ্রতুল। কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ সরকারের এ সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু সরকারের কাছে কোনো সঠিক তথ্য আছে বলে মনে হয় না, যে গত দুই বছরে কতজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার প্রণোদনা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। অনিয়ম হয়েছে। দলীয় বিবেচনা গুরুত্ব পেয়েছে। এই মহামারির সময় এমন অনিয়ম সাধারণকেই বঞ্চিত করেছে বলে মনে করি।

জাগো নিউজ: ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?

সালেউদ্দিন আহমেদ: দুর্নীতি রোধ করতে পারলে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা এমনতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। মানুষ আসলে সাহায্য চায় না। চায় আয় করার পরিবেশ। সেই পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারলেই মানুষ আয়ের পথ বের করতে পারবে।

এরপরও আমি বলবো, করোনায় এই শ্রেণির মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে। তাদের জন্য বিশেষ ভাবনা অবশ্যই ভাবতে হবে। সুদবিহীন বা অল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। মনে রাখতে হবে উদ্যোক্তা টিকলেই অর্থনীতি টিকবে।

এএসএস/এইচএ/এমএস

প্রথমত, অভিযোগ করে কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং তাকে হেনস্তা হতে হয়। দ্বিতীয়ত, সরকার এই অভিযাগগুলো স্বীকার করতে চায় না। রাজনৈতিকভাবেই এসব অভিযোগ মোকাবিলা করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। তাহলে মাঠে নেমে লাভ কী? মানুষ এখন ভয় পায়। ভয়ের পরিবেশ তো তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় একটি লাউ ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ একজন কৃষক সেই লাউ মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। বাকি ৫০ টাকা কার পকেটে গেল? এই ৫০ টাকায় উৎপাদক এবং ভোক্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কোনো সমাধান মিলবে না। এটি সরকারের দায়। সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে মাঝখানের ৫০ টাকা এভাবে ক্রেতাকে বেশি গুনতে হতো না

মিডিয়াও নিয়ন্ত্রিত। মিডিয়ায় কোনো সমস্যার কথা প্রচার করা হচ্ছে না। সফলতার খবর প্রচার হচ্ছে। সব মিডিয়াই সরকারের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। জনগণের পক্ষ নেই

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]