পাহাড়-বন উজাড় করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বানানো সুস্থ চিন্তা নয়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩৫ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশবাদী আইনজীবী এবং প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)। বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ‘পরিবেশ পুরস্কার’ এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ’ অর্জনকারী। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’ এবং ২০১২ সালে ফিলিপাইনের প্রখ্যাত ‘রামোন ম্যাগসেসে’ পুরস্কারও লাভ করেন।

সম্প্রতি কক্সবাজারে বনের মধ্যে জনপ্রশাসন বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। দীর্ঘ আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে পরিবেশ ও উন্নয়নের নানা প্রসঙ্গও। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ: কক্সবাজারে ৭০০ একর বন কেটে প্রশাসন বিভাগের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। বিষয়টি অবশ্যই পর্যবেক্ষণে রেখেছেন...

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: একটি দেশের সিভিল প্রশাসনের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জরুরি, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের জন্য কিন্তু ইতোমধ্যে সাভারে একটা কেন্দ্র আমাদের আছে। পিএটিসির সেই কেন্দ্রটা প্রায় ৫৬ একরের। দ্বিতীয় আরেকটি কেন প্রয়োজন সেটা আমি বলতে পারি না। প্রশাসনের মধ্যকার পরিধি বাড়লে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিধিও বাড়তেই পারে। আমার তাতে আপত্তি নেই। হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বন উজাড় করে এমন কেন্দ্র করতে হবে কেন? সাভারের সেই কেন্দ্রেই উন্নতমানের ভবন নির্মাণ করে পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।

jagonews24কক্সবাজারসহ পার্বত্য এলাকায় পাহাড়-বন উজাড় করে স্থাপনা নির্মাণ চলছেই

তা না করে কক্সবাজারের একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় দেশের বিদ্যমান আইন ভেঙে, পাহাড় কেটে ও বন উজাড় করে কেন এটা করতে হবে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাগো নিউজ: আপনি কেন মনে করছেন, এখানে বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন এবং অস্বচ্ছতা রয়েছে?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: হ্যাঁ, গোটা প্রক্রিয়াকে এতটাই অস্বচ্ছ রাখা হয়েছে যে, যখন ভূমি মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জন্য এটার বরাদ্দ চেয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ করতে বলেছে, তখন কিন্তু এখানে যে পাহাড়, বন ও ঝরনা আছে এই কথাগুলো একবারও বলা হয়নি। বিশ্বে বন উজাড়ের হার হচ্ছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর আমাদের দেশে এই হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এই অবস্থায় আমরা কেন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করতে যাবো? এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি দেশে কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা। আর আমাদের বনভূমি আছে মাত্র আট ভাগ। সংবিধানে আছে, রাষ্ট্র বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করবে। বন আইন অনুযায়ী, যদি একটা জায়গা সংরক্ষিত বন হয়, সেটার আর পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। সরকারের কাজের জন্যও বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান নেই।

তাদের কাছে নিশ্চয়ই এই নোটিফিকেশনগুলো আছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা-৫ এ যেটা বলা আছে, ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যালি ডিক্লেয়ার্ড (প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ঘোষিত) একটি জায়গা কী করে অধিগ্রহণ হতে পারে; ওই আইনে তো অধিগ্রহণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে। এমনকি কোনো স্থাপনা বা কোনো নির্মাণকাজ হবে না, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।

আপনারা দেখেছেন, দুই বছর আগে আমাদের আপিল বিভাগ বলে দিয়েছেন যে, কক্সবাজারে যত হোটেল হয়েছে, তার সব ভেঙে ফেলতে হবে। ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়াতে হোটেল জোন হতে পারে না। আদালতের আদেশে ভাঙা লাগবে, আমাদের নিজেদের একটা মামলা আছে। নিষেধাজ্ঞাও আছে।

এখানকার বনের পরিস্থিতি এবং কাঠামো জানার পরেও তথ্য গোপন করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাগো নিউজ: ভূমিমন্ত্রী বলেছেন সরকারের এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দিয়েছে। আর জায়গাটি সরকারের কাজেই ব্যবহার করা হবে…

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: প্রশাসন অনেক সময় সঠিক তথ্য তুলে ধরে না। মন্ত্রী-এমপিরা সঠিক তথ্য জানতে পারেন না। এমনও হতে পারে যে মন্ত্রী মহোদয়কে জানানোই হয়নি এখানে সংরক্ষিত বন আছে। এই বনে কোনো অবকাঠামো হতে পারে না। বনে অবকাঠামো করলে পরিবেশ সংকটাপন্ন হবে।

jagonews24কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

‘সরকারের এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়কে দেবে’ এই কথাগুলো শুনলে মনে হয় সরকারের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই এবং জনগণ কোনো বিষয়ই নয়। সরকার যা চায় তাই করে ফেলতে পারে। আসলে তো সরকার সেটা করতে পারে না। সরকারেরও ক্ষমতা কিন্তু সীমিত। সরকারকেও আইন মেনেই চলতে হবে। একটা গণতান্ত্রিক দেশে যদি সরকার নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করে, নিয়মসিদ্ধ দাবি করে; তাহলে তাকে তো আইন মেনে চলতে হবে।

জমিটা হচ্ছে বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায়। এটা ভূমি মন্ত্রণালয় কেমন করে জনপ্রশাসনকে দিয়ে দেবে? বন বিভাগ তো দিচ্ছে না। বন বিভাগ তো স্পষ্ট চিঠি লিখে আপত্তি জানিয়েছে যে, এটা বন্দোবস্তযোগ্য নয়।

জাগো নিউজ: বন্দোবস্ত নিয়ে নানা অসঙ্গতির কথা বলছেন। বন বিভাগ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেও সমাধান টানতে পারে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: আমার কাছে যেটা মনে হয়, প্রশাসনের এই প্রকল্পের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত রয়েছে। প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা চান কক্সবাজারে যেন তাদের জন্য ফাইভ স্টার মানের একটা ট্রেনিং সেন্টার হয় যেটা তারা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করবেন। তাদের চোখটা মূলত কক্সবাজারের দিকে। ওখানে তো ভূমি অন্য রকমের হয়।

প্রথমত, প্রশাসনিক পক্ষপাতদুষ্ট। দ্বিতীয়ত, খুব নির্মোহভাবে বা নির্লোভভাবে কক্সবাজারকে বেছে নেওয়া হয়নি। যদি তাই হতো তাহলে সাভারের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকেই বর্ধিত করা হতো। কক্সবাজারের একটি প্রাকৃতিক আবেদন আছে। আর এই আবেদন থেকেই বন কেটে ভবন বানাতে চাইছে। বনের জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে। প্রশাসনের ক্ষমতার প্রকাশ ঘটেছে এখানে। বন কেটে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অসুস্থ চিন্তা।

আর বন বিভাগ এমন শক্তি অর্জন করেনি যে প্রশাসনিক বড় বড় কর্তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলবে।

এর আগের একটা ঘটনা বলি, কক্সবাজারের ৫১ একরের একটি পাহাড় কেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসন প্রকল্প করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর বিপক্ষে আমরা উচ্চ আদালতে গেলাম। আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিলেন। তারা আপিল করলেন। আপিল বিভাগও আমাদের পক্ষে রায় দিলেন। হেরে যাওয়ার পরও তারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে ওই প্রকল্পের একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে এলেন।

এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের মধ্য দিয়ে তারা প্রকাশ করলেন যে প্রশাসনই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমরা যেভাবে আইনের ব্যাখ্যা দেবো, সেটাই সঠিক। আমরা আদালতের আদেশ মানবো না।

jagonews24ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

জাগো নিউজ: আর এমনটি তো ধারাবাহিকভাবেই হয়ে আসছে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: এমন আচরণের কিন্তু এখন শেষ হওয়ার সময় এসেছে। প্রত্যেককেই জবাবদিহিতার মধ্যে চলতে হবে। আমাকে যদি চলতে হয়, তাহলে সরকারকেও চলতে হবে, বিচার বিভাগকেও চলতে হবে।

সমস্যা হচ্ছে, বন বিভাগকে সত্যিকার শক্তি কখনো অর্জন করতে দেওয়া হয়নি। বন বিভাগের বদলি, বন বিভাগের পদোন্নতি সব কিছুই তো প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বে কতটা দৃঢ়তা আছে সেটাও দেখতে হবে।

একটি জিনিস খেয়াল করেন, বন বিভাগ আপত্তি দিয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা-৫ অনুযায়ী, এটাকে পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যালি এরিয়া) ঘোষণা করেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। অথচ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও অনাপত্তি দিয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কী করে অনাপত্তি দেয়? অনাপত্তির শর্ত হচ্ছে গাছ কাটা যাবে না, পাহাড় কাটা যাবে না। পাহাড়ের মধ্যে করবে (ট্রেনিং ইনস্টিটিউট), বনের মধ্যে করবে, তো গাছ-পাহাড় না কাটলে কেমন করে হবে? পরিবেশ মন্ত্রণালয় কি বন বিভাগের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারতো না? প্রশাসন কি এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরেও চাপ তৈরি করছে? এমন হলে সেটা আসলে মোটেও ভালো হচ্ছে না।

এএসএস/কেএসআর/এইচএ/জিকেএস

কক্সবাজারের একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় দেশের বিদ্যমান আইন ভেঙে, পাহাড় কেটে ও বন উজাড় করে কেন এটা করতে হবে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রস্তাব করা হয়েছে

একটি দেশে কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা। আর আমাদের বনভূমি আছে মাত্র আট ভাগ

আমার কাছে যেটা মনে হয়, প্রশাসনের এই প্রকল্পের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত রয়েছে। প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা চান কক্সবাজারে যেন তাদের জন্য ফাইভ স্টার মানের একটা ট্রেনিং সেন্টার হয় যেটা তারা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করবেন। তাদের চোখটা মূলত কক্সবাজারের দিকে। ওখানে তো ভূমি অন্য রকমের হয়

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]