এককেজি লবণে চাষি পান ৭ টাকা!

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:১৬ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২২

শেষ পর্ব
এককেজি লবণ উৎপাদনের পর তা বিক্রি করে চাষি পান ৭ টাকা। ওই লবণ সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর খুচরা বিক্রেতার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ দাঁড়ায় ২৩ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা ২৬ টাকায় কেনেন এই লবণ। আর বাজারে ব্র্যান্ডভেদে প্রতিকেজি লবণ বিক্রি হয় ৩২ থেকে ৩৫ টাকায়।

দামের এ বড় হেরফেরের হিসাব নতুন কিছু নয়। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন আলাদা দুটি প্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রতিবেদনে সরকারের নিয়ন্ত্রকদের কাছে এ প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে। কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কখনো। এ পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয় লবণের উৎপাদন তদারকি আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মাঝে মধ্যে ঘাটতি পূরণে আমদানির অনুমতি দেওয়ার মধ্যে সীমিত রেখেছে তাদের সব কার্যক্রম। ফলে দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উপেক্ষিত বহুদিন।

আরও পড়ুন>> লবণ আমদানিতে কারসাজি

দেশের লবণ উৎপাদন সরাসরি তদারকি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, এককেজি অপরিশোধিত লবণের গড় দাম চাষি পর্যায়ে ৭ টাকা ২২ পয়সা। এ লবণ সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে (ভ্যাকুয়াম) পরিশোধনের পরে আয়োডিন মিশিয়ে বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ পড়ে ২৩ টাকা। পরে তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৩৫ টাকা কেজি দরে।

দেশে সব লবণ ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে পরিশোধন হয় না। সুপার রিফাইন (মিহি দানার ঝরঝরে) না হলে সেটা হয় মাঝারি দানার মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে। এছাড়া মোটা দানার ট্রাডিশনাল (সনাতন) পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন হয়। এসব লবণ খোলা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে বেশি।

salt1

বিসিকের তথ্য বলছে, মোটা দানার লবণে ১৪ টাকা খরচের বিপরীতে মুনাফা কেজিপ্রতি ৪ টাকা এবং মাঝারি দানায় মুনাফা ৬ টাকা।

আরও পড়ুন >> ভোজ্যলবণকে ছাড়িয়ে তুঙ্গে শিল্পলবণের চাহিদা

উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে দামের এ ব্যবধানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন মধুমতি সল্ট ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক মিঠু। যদিও তিনি দাবি করেন, লাভের বেশি অংশ যাচ্ছে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার পকেটে। তারা অধিক মুনাফা না পেলে লবণ বিক্রি করতে চায় না।

ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা নিজেরাই সরকারকে বারবার বলেছি। খুচরা ও পাইকারি দোকানদাররা কম দাম লেখা থাকলে সে লবণ বিক্রি করতে চায় না। দোকানদাররা আমাদের ফোর্স করে আপনারা মার্জিন বেশি রেখে সর্বোচ্চ মূল্য বেশি লিখবেন। না হলে সেই ব্র্যান্ড বিক্রি করে না।’

‘এজন্য বাধ্য হয়ে মিল মালিকরা প্যাকেটের গায়ে বেশি দাম লেখেন। সে দামেই বিক্রেতারা বিক্রি করে। তারা মুনাফার অধিকাংশ পায়।’

আরও পড়ুন >> ঘাটতি বাড়ছে লবণের

ওমর ফারুকের দাবি, বিষয়টি উল্লেখ করে লবণ মিল মালিক সমিতি বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে (বিটিটিসি) চিঠিও দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ মূল্য কমাতে চান মালিকরা। খুচরা দাম বিটিটিসিকে নির্ধারণ করে দিতে বলা হয়েছে ওই চিঠিতে।

তবে এ প্রসঙ্গে বিটিটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর দিতে পারেননি কয়েকজন কর্মকর্তা।

অন্যদিকে ২০২০ সালে বিটিটিসি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে একটি প্রতিবেদন দেয়। লবণখাতের সমস্যা নিয়ে ওই প্রতিবেদনে অতিমুনাফার প্রসঙ্গও ছিল। কিন্তু দাম ঠেকাতে পরবর্তীসময়ে সেটা শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু ধোঁয়াশার কারণে সেটি কাজে আসেনি।

ওই প্রতিবেদনে ট্যারিফ কমিশন উৎপাদন ও আমদানি- উভয় ক্ষেত্রে অতিমুনাফার তথ্য দেয়। তারা দেখিয়েছে, পরিশোধিত লবণ বিক্রিতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হয় কেজিপ্রতি ৯ থেকে ১২ টাকারও বেশি।

salt1

সংস্থাটি বলছে, কোম্পানিগুলোর প্রতি কেজি অপরিশোধিত লবণ পরিশোধনে ১২ টাকা খরচ হয়। এরপর অন্য উপকরণ, পরিচালন ও আর্থিক ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন পদ্ধতিতে পরিশোধিত লবণের উৎপাদন খরচ ২৩ টাকা ৩৩ পয়সা।

আর খুচরা বিক্রেতা এ লবণ কেনেন ২৬ টাকা দরে। মোড়কে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ৩৫ টাকা। ফলে খুচরা বিক্রেতা মুনাফার সুযোগ পান কেজিপ্রতি ৯ টাকা।

এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশন সুপারিশ করে, লবণ পরিশোধনকারীদের নির্দেশনা দিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমিয়ে দিয়ে লবণের দাম কমানো সম্ভব।

আবার আমদানি পর্যায়ে ভারত থেকে লবণ আমদানিতে প্রতি কেজির দাম (এফওবি) পড়ে ৯০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা। সব ধরনের কর ও খরচ দিয়ে এ লবণ কারখানায় পৌঁছাতে খরচ দাঁড়ায় ৬ টাকারও কম, যা একইভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অতিমুনাফার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনুবিভাগ) এএইচএম সফিকুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, লবণ আমদানির বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখে। বাজারেও আমদানিনির্ভর পণ্য হলে সেটার দাম আমরা নিয়ন্ত্রণ করি। অথবা অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টে যেসব পণ্য রয়েছে, সেগুলোর করা হয়। সেসবের কোনো পর্যায়ে লবণ পড়ে না। এটা শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাজ।

অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, লবণ নিয়ে কাজ করে বিসিক। এ বিষয়ে বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) জাকির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, লবণ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়টি নিয়ে কাজ করে বিসিক। দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আমাদের নয়।

এনএইচ/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]