‘দুর্নীতির বিস্তার ঘটলে মানবাধিকার বেশি লঙ্ঘিত হয়’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৮ এএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২২
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

ড. ইফতেখারুজ্জামান। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক। গবেষণা করছেন এবং লিখছেন দুর্নীতি, সুশাসন ও রাজনীতির নানা বিষয়ে।

বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২১’-এ বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের এক ধাপ উন্নতি হয়েছে এবার। আবার বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আপনি হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান: দুর্নীতির অবস্থানে বাংলাদেশ এক ধাপ উপরে উঠে এসেছে (১২ থেকে ১৩তম), এটা ঠিক। এতে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু এটি সূচকের যে মূল প্রতিপাদ্য, তার একটি অংশবিশেষ মাত্র।

সূচকের মূল বিষয় হচ্ছে, স্কোর কত হয়েছে? বাংলাদেশ কত নম্বর পেয়েছে? বাংলাদেশ এবারও ২৬ স্কোর পেয়েছে এবং গত ১০ বছর ধরে এই স্কোরে রয়েছে। বৈশ্বিক র‌্যাকিংয়ে অবস্থান খানিক পরিবর্তন হলেও টিআই গবেষণা করে দেখেছে বাংলাদেশ স্কোরে আগের জায়গায় রয়েছে। আমাদের স্কোর বাড়ছে না। বাংলাদেশ স্থবির হয়ে আছে এই প্রশ্নে।

জাগো নিউজ: এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় একধাপ অবনমন ঘটেছে। এর ব্যাখ্যা কী?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: হ্যাঁ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক ধাপ অবনমন ঘটেছে। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬তম। এবার দাঁড়িয়েছে ১৪৭তম অবস্থানে। ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮৮ স্কোর পেয়ে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড প্রথম অবস্থানে। প্রথম থেকে নামতে নামতে ক্রমান্বয়ে সর্বনিম্ন স্থানে যায়। এমন কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়েছে।

jagonews24দুর্নীতির ধারণা সূচকে ১৩তম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ/গ্রাফ সংগৃহীত

অর্থাৎ বিপরীতমুখী অবস্থানের এই ওঠানামার কারণ হচ্ছে একই স্কোর একাধিক দেশ পাওয়া। বাংলাদেশের সমপরিমাণ স্কোর আরও একটি দেশ পেয়েছে এবার। আবার সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে তিনটি দেশ।

জাগো নিউজ: তার মানে দুর্নীতিরোধে বাংলাদেশের আসলে অগ্রগতি নেই?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: না। কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ ২৬ স্কোর পেয়ে এক দশক ধরে একই অবস্থানে আছে। আবার দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। পুরো এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে।

অর্থাৎ টিআইয়ের সূচকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। অবস্থান এবং স্কোর বিবেচনায় হতাশা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

জাগো নিউজ: সরকারপ্রধান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলছেন বারবার...

ড. ইফতেখারুজ্জামান: প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। বরং দুর্নীতির আরও বিস্তৃতি ঘটেছে। যারা দুর্নীতি করে চলছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। দুর্নীতি রোধ করার কথা যাদের, তারা নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সৎসাহসের সঙ্গে কাজ করতে পারছেন না। তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন।

জাগো নিউজ: এ অবনতির জন্য প্রধানতম কারণ কোনটি উল্লেখ করবেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসা একাকার হওয়ার কারণেই আজকের এই অবনতি। রাজনীতির কেন্দ্রে বা কাছাকাছি থাকলে দুর্নীতি করা যায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করা যায়, এটি সমাজে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এ কারণেই আজ দুর্নীতির ব্যাপকতা।

জাগো নিউজ: উত্তরণের উপায়?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: সরকারপ্রধানের ঘোষণার বাস্তবায়ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে পিছপা না হওয়া, রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনস্বার্থরক্ষার মানসিকতা তৈরি করতে পারলেই দুর্নীতিরোধ করা সম্ভব। এর বাইরে আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

jagonews24দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ সম্পর্কে টিআইয়ের পর্যবেক্ষণ/গ্রাফ সংগৃহীত

দুর্নীতির বিকাশ ঘটলে মানবাধিকার বেশি লঙ্ঘিত হয়। দুর্নীতির কারণে মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়। বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়। মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হলে অবশ্যই দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করলেন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান: টিআইয়ের গবেষণা জরিপ দেখিয়েছে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও দুর্নীতিরোধে কোনো অগ্রগতি নেই। কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার অগ্রগতি হলেও অন্যান্য জায়গায় অবনতি হয়েছে।

টিআই দেখিয়েছে বিশ্বের ৮৪টি দেশে অবস্থার উন্নতি হয়েছে, আবার ৮৪টি দেশে অবস্থার অবনতি হয়েছে। তার মানে স্থবির অবস্থায়ই আছে।

দুর্নীতির ব্যাপকতা বাড়ছে বিশ্বজুড়েই। কোনো দেশই দুর্নীতিমুক্ত হতে পারছে না। সর্বোচ্চ ৮৮ পেয়েছে ঠিক, কিন্তু আরও ১২ স্কোর পেতে বাকি। তার মানে ওইসব দেশেও দুর্নীতি হচ্ছে।

এএসএস/এইচএ/এএসএম

গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬তম। এবার দাঁড়িয়েছে ১৪৭তম অবস্থানে। ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮৮ স্কোর পেয়ে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড প্রথম অবস্থানে। প্রথম থেকে নামতে নামতে ক্রমান্বয়ে সর্বনিম্ন স্থানে যায়। এমন কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়েছে

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। বরং দুর্নীতির আরও বিস্তৃতি ঘটেছে। যারা দুর্নীতি করে চলছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। দুর্নীতি রোধ করার কথা যাদের, তারা নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সৎসাহসের সঙ্গে কাজ করতে পারছেন না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]