‘কেতাদুরস্ত ফ্যাশনেবল নয়, হতে হবে ভেতরে-বাইরে স্মার্ট নারী’

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৪ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২২

রুমিন ফারহানা। পেশায় আইনজীবী। আলোচিত রাজনীতিক। বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ রাজনীতিক হলেও মা রাশিদা বেগম পেশায় ছিলেন শিক্ষক। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান রুমিন ফারহানা রাজধানীর হলিক্রস স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করেন যুক্তরাজ্যের লিংকনস্ ইন থেকে।

কন্যাসন্তান হিসেবে অত্যন্ত নিরাপদ ও আদুরে পরিবেশে বড় হলেও পেশাগত এবং রাজনৈতিক জীবনে এসেছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। শিকার হয়েছেন নোংরামিরও। নারী দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে অকপটে সেসব গল্প তুলে ধরেন এ রাজনীতিক। খোলামেলা আলোচনা করেন শৈশব, শিক্ষাজীবন, নারী হিসেবে বেড়ে ওঠা, কর্মজীবনে সংগ্রামের গল্প ও রাজনৈতিক জীবনের নোংরামিসহ সুখ-দুঃখের নানা গল্প। নারীদের জন্য চলার পথ মসৃণ করতে দেন নানা পরামর্শ।

সালাহ উদ্দিন জসিমের রিপোর্ট ও বিপ্লব দিক্ষিতের ছবিতে রুমিন ফারহানার সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব-

জাগো নিউজ: নারী দিবস মানেই নারীর মর্যাদা দেওয়া, অধিকার দেওয়া। আপনার কি মনে হয় নারী দিবস প্রকৃতপক্ষে সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে?

রুমিন ফারহানা: প্রতি বছর ৮ মার্চ নারী দিবস আসে। আমরা আলাপ করি, গণমাধ্যমে কথা হয়, কলাম লিখি, টকশোতে কথা বলি। কিন্তু এটার প্রভাব একবারে প্রান্তিক পর্যায়ের নারী বোনটির জীবনে কতটুকু পড়ছে, সেই প্রশ্ন তো থাকেই। তবে এটারও একটা গুরুত্ব আছে। এই যে আবার নতুন করে কথাগুলো হয়। আবার মানুষের কাছে কথাগুলো পৌঁছায়। এই যে আবার একটু করে হলেও মানুষের মস্তিষ্কে ধাক্কা দেয়, সচেতন হয়, এটারও দরকার আছে। বছরে একবার হলেও আমরা একটু ভাবি। আমার নিজের দিকে তাকাই। আবার আমার চারপাশে তাকাই। এটার খুব প্রয়োজন আছে।

‘তবে আজকাল অনেক আধুনিক নারী দেখি। কেতাদুরস্ত ফ্যাশনেবল মেয়ে দেখি। স্মার্ট মেয়ে দেখি না। অর্থাৎ আমার ভ্যানিটি ব্যাগ, মেকআপ ও পোশাকের ব্র্যান্ডটা নিয়ে আমি অত্যন্ত সচেতন। আমার সাজটা কেতাদুরস্ত হচ্ছে কি না, সময়ের ট্রেন্ড বুঝছি কি না, জানছি কি না, সেটা নিয়ে সচেতন। কিন্তু ভেতর থেকে সাহসিকতায় উজ্জ্বল হওয়া নারী কম দেখি। এটা আমাকে আঘাত করে। আমি দেখি, নারীরা রূপচর্চা বা সাজসজ্জায় যতটা পরিপাটি ও সচেতন, নিজের কাজের ক্ষেত্রে বা দেশ-দুনিয়ার ক্ষেত্রে তাদের খুব একটা সচেতনতা আমি দেখি না।’

আমার সার্ভেতে আমি যেটা দেখেছি, রাস্তায় নামলে রিকশাশ্রমিক, ভ্যানচালক বা ফল-বাদাম বিক্রেতারাও আমার কাছে দৌড়ে আসেন। বলেন, আপা আপনার বক্তব্য আমার খুব ভালো লাগে। তার মানে কী? তারা কিন্তু মোবাইল বা কোনো মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো দেখেন-শোনেন। কিন্তু বহু ভালো ভালো পেশাজীবী নারীকে দেখেছি, ওনারা দেশের ব্যাপারে জানেনও না, জানতে চানও না। এমনকি অনেকে প্রশ্ন করেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি থেকে নাকি আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন (ক্ষমতায়)। এতটা অসচেতন নারীও দেখেছি। কিন্তু পুরুষদের মধ্যে আমি এ রকম দেখি না। এজন্য আমি বলবো, নারীর বাধাগুলো নিজেদেরই ভাঙতে হবে। নিজেকেই আসলে সত্যিকার অর্থে সাহসী, আধুনিক ও নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

জাগো নিউজ: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আপনার দলে কি সেটা আছে?

রুমিন ফারহানা: আমরা তো চেষ্টা করছি। আওয়ামী লীগও চেষ্টা করছে। বড় সব দলই চেষ্টা করছে। তবে আমি মনে করি, জোর করে সংখ্যা বাড়াতে চাইলে নেতাদের স্ত্রী, মেয়ে ও বোন দিয়ে কোটা পূরণ করা হবে। সেটা তো লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। যোগ্যতাহীন নারী শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বাড়ানো আমি সমর্থন করি না। যোগ্যতা দেখে নারীকে আনতে হবে। নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে।

জাগো নিউজ: এই ৩৩ শতাংশ পূরণের জন্যও যোগ্য নারী নেতৃত্ব নেই?

রুমিন ফারহানা: যোগ্যতা এমন জিনিস, এটা চাপা দিয়ে রাখতে পারবেন না। এটা জোর করে আরোপও করা যায় না, চাপিয়েও দেওয়া যায় না। যোগ্যতা থাকলে সেই নারী উঠে আসবেই। এটা দাবিয়ে রাখতে পারবেন না।

জাগো নিউজ: যে নারীরা রাজনীতিতে আসেন তাদের সিংহভাগ কি হতাশ হয়ে পড়েন? দলগুলোর ফাইট করার লোক লাগবে, নারী শুধু শোপিস, ব্যানার ধরার ক্ষেত্রে নারীদের প্রয়োজন- এই মানসিকতা পান কি না-

রুমিন ফারহানা: নিশ্চয়ই পাই। তবে যোগ্যতা তো অনেক কিছুর সম্মিলনে ঘটে। তা হলো লেগে থাকা সাহস এবং আত্মবিশ্বাস। এই বাধাগুলো নিজেকেই জয় করতে হবে। কেউ করে দেবে না। আমাকে তো প্রথমে মাসের পর মাস বসিয়ে রাখা হয়েছে চেম্বারে, আমি তো ফিরে যাইনি। আমাকে তো অনেক কথা শোনানো হয়েছে, অনেকভাবে খোঁচা দেওয়া হয়েছে, যাতে আমি না আসি। একটা চেয়ার নাকি দখল করে রাখি, ওই চেয়ারটায় পুরুষ বসলে চেম্বারের উপকার হবে। একটামাত্র কাঠের ভাঙা চেয়ারে বসতাম, সেটার খোটাও আমাকে শুনতে হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, গাড়ি থেকে নেমে পত্রিকা কিনে নিয়ে আসো। যতভাবে অপমান-অপদস্থ করে আমাকে পেশা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়- সব ধরনের চেষ্টা হয়েছে।

‘কোথায় হয়েছে? বাংলাদেশের টপলিডিং চেম্বারগুলোর একটিতে আমার সঙ্গে এই আচরণ করা হয়েছে। তো আমি যদি ফিরে যেতাম, তাহলে? হার মানবো না- এই শক্তিটা নিজের মধ্যে থাকতে হবে। রাজনীতি থেকে আমাকে সরানোর কম চেষ্টা হয়েছে? আমার পেছনে-সামনে কম চেষ্টা হয়েছে? আমাকে তাড়ানোর জন্য কম নোংরামি হয়েছে? এগুলো তো তাওয়াক্কালতু আল্লাহ (আল্লাহর ওপর ভরসা)। এগুলো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভেতরে যদি সাহস থাকে, আপনি যদি জানেন আপনি সৎ, আপনি ফাইট করবেন।’

jagonews24

জাগো নিউজ: বাবা ও মায়ের তৈরি করা পথে আপনি রুমিন ফারহানা যেভাবে পথ চলছেন, সব নারীর পথচলা এ রকম মসৃণ?

রুমিন ফারহানা: না। এ রকম মসৃণ হয় না। যার যার লড়াই তাকেই লড়তে হবে। আমার লড়াইটা ছিল আমার মতো। এটা ছিল অতি আদরে বড় হওয়া একটা মেয়ে। বাস্তবতাটা আমার জন্য বিরাট ধাক্কা ছিল। এমন তো না যে বাস্তবতা ফেইস (মুখোমুখি) করে আসিনি। আর কোনো মেয়ে হলে হয়তো সরে যেতেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে যেতেন। ভাবতেন, দরকার কী। আমি একদম চোখের পানি তো দূরের কথা, প্রতিটি দুর্ব্যবহার আমার জন্য সাহস নিয়ে এসেছে, চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ভেবেছি, আমাকে মোকাবিলা করতে হবে। নিজের কাছে সৎ ছিলাম, পরিবারের কাছে সৎ ছিলাম। এটা ভীষণ দরকার। বারবার বলছি, নিজের ও পরিবারের কাছে সৎ থাকতে হবে। এছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়তিতে বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমার জন্য যেটা নির্ধারণ করবেন, সেটাই সবচেয়ে ভালো। আমার শক্তিটা আমি আমার ধর্মচর্চা থেকে পাই। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস, নিজের কাছে সৎ এবং পরিশ্রম- এই তিনটার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহই বলেছেন, তুমি পরিশ্রম কর, বাকিটা আমি দেখবো। সততা, পরিশ্রম, লক্ষ্যে পৌঁছানোর মনোবল ও পরিবারের সাপোর্ট থাকলে জীবনে কোথাও আটকানোর সুযোগ নেই।

জাগো নিউজ: আপনার দলে নারীদের টেনে আনার আগ্রহ কেমন-

রুমিন ফারহানা: আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের লোকদের দেখেছি, তারা সবসময় চান আরও বেশি মেয়ে যাতে রাজনীতিতে আসেন। যোগ্য মেয়েরা যেন তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী জায়গা করে নিতে পারেন সেই চেষ্টাটা আছে। বিশেষ করে আরপিও সংশোধনের পর তো এই চেষ্টা আরও অনেক বেশি। কিন্তু সেরকম মেয়ে/নারী তো আমাদের থাকতে হবে- যাদের মননে-মেধায় একটা জায়গায় যাওয়ার মতো যোগ্যতা আছে। নিজেকে আগে যোগ্য করে গড়ে তোলো, এর কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে তৈরি করো, তাহলে অটোমেটিক্যালি তুমি তোমার জায়গা পাবে, আজ পাও আর পাঁচদিন পরে। আমার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে আপনি মনে করতে পারেন আমি আগে পেয়েছি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যোগ্যতা থাকলে ৫-১০ দিন পরে হলেও আসবে।

জাগো নিউজ: ঘরে-বাইরে বিভিন্ন জায়গায় নারীরা নির্যাতনের শিকার হন, ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে, এগুলো কমানো যাচ্ছে না, কেন?

রুমিন ফারহানা: আরেকটি ভয়ংকর তথ্য দেই। আজকের (সাক্ষাৎকার গ্রহণের দিন) পত্রিকায় দেখেছি- ধর্ষণের নিউজে ২৩ শতাংশ মানুষ হা হা হা রিয়্যাক্ট দিয়েছে। তাহলে ধর্ষণটা মজার বিষয় হয়ে গেছে? ইয়াসমিনের ঘটনায় দেশ উত্তাল হয়ে গেছে। এখন প্রতি বছর তার আগের বছরের কয়েকগুণ বেশিসংখ্যক নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কয়েকগুণ বেশি নারী ধর্ষণের চেষ্টা, শ্লীলতাহানির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু কোথাও সেভাবে প্রতিবাদ করতে দেখি না। অর্থাৎ এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। এটা ভয়ংকর। এ ব্যাপারে সামাজবিজ্ঞানীদের একটু চিন্তা করা দরকার। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক এই ভয়ংকর পরিবর্তনটা কেন হচ্ছে? মানুষ এখন এই ধরনের অপরাধগুলোতে ইজি (অভ্যস্ত) হয়ে যাচ্ছে, কেন? একটা কারণ হলো- এখন হাতে হাতে স্মার্টফোনের প্রভাব খুব খারাপ হচ্ছে। এটার ভালো দিকও আছে। আপনি যেভাবে ব্যবহার করবেন, সেভাবেই ব্যবহৃত হবে। একটা টিনএজের ইয়াং ছেলের কাছে যখন মোবাইল ফোন থাকে সে কী দেখছে, ডেটা সে কোথায় ব্যবহার করছে, এটা পরিবারের দেখা উচিত। একটা মোবাইল দিয়ে ছেলেকে ছেড়ে দিলাম, সে কী করছে জানি না। এতটা গাছাড়া হওয়া ঠিক নয়। দেখতে পাচ্ছি, মোবাইল কালচার একটা শ্রেণির মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব দেখছি। আমাদের ওয়াজের কিন্তু সংখ্যা বেড়েছে। ধর্মীয় লেবাসও অনেক বেড়েছে। কিন্তু পারিবারিকভাবে সত্যিকারের ধর্মশিক্ষা ও অনুশীলন করা, এটা কিন্তু খুব বেশি দেখি না। যতটা লেবাসে ততটা কর্মে, অন্তরে বা চিন্তায় দেখি না। এটা পরিবারকে দেখতে হবে।

জাগো নিউজ: নারী দিবসে নারী পেশাজীবী, এমপি ও রাজনীতিক হিসেবে জনগণের জন্য আপনার মেসেজ কী-

রুমিন ফারহানা: একটা কথা সবাইকে বলবো- আপনার মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যাসন্তান আপনার কাছে যতটা প্রিয়, আরেকজন নারীও কিন্তু কারও না কারও মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যাসন্তান। সুতরাং সেই শ্রদ্ধাবোধটা নারীর প্রতি সবাই রাখুন। নারীদেরও বলবো, নিজেরা যোগ্য হয়ে উঠুন। যোগ্যতার মূল্যায়ন যদি আজ না পান, ১০ দিনের পরে পাবেন। নিশ্চয়ই পাবেন। কিন্তু নিজে যোগ্য না হয়ে একে-ওকে দোষারোপ করতে পারি, কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। আরেকটা কথা বলবো, তথাকথিত অনেক আধুনিক-ফ্যাশনেবল-কেতাদুরস্ত নারী আমরা চারপাশে দেখি, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ও শ্রদ্ধার পাত্র আমার সেই বোনটা, যে সকালে উঠে গার্মেন্টসে যায়। তাকে আমার অনেক বেশি স্মার্ট মনে হয়। একজন স্মার্ট নারী হয়ে উঠুন ভেতরে-বাইরে। ফ্যাশনে নয়।

জাগো নিউজ: ধন্যবাদ
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ

এসইউজে/ইএ/এএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।