‘শ্রীলঙ্কার উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৭ এএম, ১৮ এপ্রিল ২০২২

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়, অটোয়া ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাপানের ইয়োকোহামা সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। আলোচনা করেন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রসঙ্গ নিয়েও। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: আপনি শ্রীলঙ্কায় ছিলেন। গবেষণা করেছেন সেখানে থেকেই। দেশটির খবর রাখছেন নিয়মিত। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হলো কেন?

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। ত্রিশ বছর যুদ্ধ করেছে নিজরাই। এর মধ্য দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে দেশটির অভ্যন্তরেই। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নানা প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ব্যাহত হয়েছে উন্নয়ন।

এই যুদ্ধে আঞ্চলিক প্রভাবও ছিল। কারণ তামিলদের ভারত প্রথমে সাহায্য করলো। আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর মৃত্যুর পরে তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো ভারত। এর মধ্যে দিয়ে ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার তৈরি হলো সন্দেহের সম্পর্ক। তামিল টাইগারদের ভারতই প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। আবার তামিলদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি চুক্তি করা হলো, যে চুক্তি রাজিব গান্ধী করেছিলেন।

এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখে উন্নয়ন করবে, তা উপায় ছিল না। এর মধ্য দিয়ে উন্নয়ন প্রশ্নে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে। এই সময়ে চীনেরও উন্নয়ন হয়েছে এবং বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট অর্থ হয়েছে।

অনেকেই বলছেন, শ্রীলঙ্কার জিডিপি ৩ শতাংশের কম ছিল। এরপরই উন্নয়নে চীনকে গুরুত্ব দেয় দেশটি। চীন মূলত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করে।

জাগো নিউজ: চীনের বিনিয়োগ, উন্নয়ন তো জিডিপি বাড়ানোর কথা…

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: চীনের যে বিনিয়োগ শ্রীলঙ্কা নিয়েছে, তার বেশিরভাগই ব্যয় হয়েছে ট্যুরিজম সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়নে। এই উপমহাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে এগিয়ে গেছে এবং এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই অবকাঠামোর ভিত্তি রয়েছে ট্যুরিজম সেক্টরে।

শ্রীলঙ্কার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে এলিটদের নিয়ে। এই এলিটরা যুদ্ধের সময় থেকেই এক পা বাইরে রেখে দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন, ইউরোপ-আমেরিকায় গেছেন অনেকে। তারা সম্পদগুলোও নিয়ে গেছেন। সিনহালারও গেছেন, তামিলরাও গেছেন। যুদ্ধের সময় দেশে তাদের জন্য ঝুঁকি ছিল বলে মনে করেছে। সব মিলিয়ে ধনীক শ্রেণি শ্রীলঙ্কা থেকে তাদের সম্পদ-বিষয়াদি অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছেন।

এরপরও যুদ্ধের পর দেশটির মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্নীতি তারা থামাতেই পারেনি। দুর্নীতি সব দেশেই হয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্নীতির টাকাটা বাইরে চলে যায়। দেশে এই টাকা বিনিয়োগ হলে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। উন্নত দেশেও দুর্নীতি হয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা তো বাংলাদেশে টাকা পাচার করে বিনিয়োগ করছে না। তারা নিজ দেশেই বিনিয়োগ করছে।

জাগো নিউজ: দুর্নীতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও আছে। কিন্তু এভাবে তো ঠেকেনি।

ইমতিয়াজ আহমেদ: উন্নত দেশে দুর্নীতি হয়। কিন্তু তারা নিজ দেশেই বিনিয়োগ করে। শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের মতো বাইরে অর্থপাচার করে না। সমস্যা ঠিক এখানেই।

জাগো নিউজ: তার মানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়নি?

ইমতিয়াজ আহমেদ: শ্রীলঙ্কার উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ দুটি সেক্টরে মোটামুটিভাবে জড়িত ছিল। একটি হচ্ছে, রেমিট্যান্স উপার্জন, আরেকটি গার্মেন্টস সেক্টর। দুটোই মার খেয়েছে।

দেশটির শিক্ষার হার উচ্চ। তারা অনেক আগেই প্রবাসে গিয়ে ভালো মাইনেতে শ্রম দিয়ে আসছিল। এখন ভারত, পাকিস্তানের অদক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার শিক্ষিত দক্ষ শ্রমিকদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এতে শ্রমবাজার হারাতে হয়েছে তাদের।

একইভাবে তৈরি পোশাক খাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় দেশটির। শ্রীলঙ্কায় একজন শ্রমিক যে মূল্যে একটি পোশাক তৈরি করেন তার চেয়ে অনেক কম মূল্যে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক ওই পোশাক তৈরি করেন। সঙ্গত কারণে পোশাক ক্রেতারা শ্রীলঙ্কা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ বহু আগেই শ্রীলঙ্কাকে ছাড়িয়ে গেছে এই সেক্টরে।

আর শ্রীলঙ্কায় ট্যুরিজম সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সেক্টরের বড় ক্ষতি হয়েছে দশ বছর আগে সিরিজ বোমা হামলার কারণে, যার পেছনে বিদেশিদের হাত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ফাইভ স্টার হোটেলে হামলা মানে গোটা ট্যুরিজম খাতের ক্ষতি করা। তাই হয়েছে এবং যে বা যারাই করুক না কেন।

জাগো নিউজ: শুধুই কি ট্যুরিজম সেক্টরের ক্ষতিসাধন না কি, অন্য কারণও গুরুত্ব পায়?

ইমতিয়াজ আহমেদ: অনেক হিসাব আছে এখানে। যেমন- বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন চীনের দিকে অধিক ঝুঁকে পড়া শ্রীলঙ্কার জন্য কাল হয়েছে। ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অনেক দেশের স্বার্থ আছে। সেখানে একটি দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক অন্যরা হয়তো ভালোভাবে নেয়নি। অনুমাননির্ভর অনেক থিওরি এখানে কাজ করতে পারে। কিন্তু প্রধানত চীন ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে শ্রীলঙ্কা আর কাউকে পায়নি। বড় বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দর তৈরি করতে চীনের কাছেই যেতে হয়েছে।

ট্যুরিজমের ওপর নির্ভর করে চীনের কাছ থেকে লোন নেওয়া খুব ভালো ফল বয়ে আনেনি। এরপর মহামারির থাবা। মহামারির কারণে ট্যুরিজমনির্ভর দেশগুলোও মার খেয়েছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মার খাওয়া আরও ভয়াবহ।

জাগো নিউজ: শ্রীলঙ্কার অগ্রযাত্রা তো এ অঞ্চলে ঈর্ষণীয় ছিল। চীনের ওপর নির্ভরতা বা ট্যুরিজম সেক্টরের ধস দিয়েই এ অগ্রযাত্রা থেমে গেলো?

ইমতিয়াজ আহমেদ: মানব উন্নয়নে এখনো শ্রীলঙ্কা এগিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নয়নে এগিয়ে। কল্যাণমূলক সমাজ কিন্তু সেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

সমস্যা হয়েছিল, দেশটির অর্থপাচার ঠেকানো যায়নি। আর এলিটদের প্রায় সবাই এক পা বিদেশে রেখেছিলেন। মহামারির মধ্যে সব অর্থই তারা বাইরে নিয়ে গেছে। আবার বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য খাতও পায়নি মানুষ। কারণ ট্যুরিজমে অনেকেই বিনিয়োগ করতে চাইছে না।

ত্রিশ বছর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের শ্রীলঙ্কা আসলে ধারণ করেনি। উন্নয়নে অংশীদার হয়নি। যে কারণে চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই নির্ভরতা টেকসই উন্নয়নে সহযোগী হতে পারেনি।

জাগো নিউজ: শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকট নিরসনে চীন এখন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না?

ইমতিয়াজ আহমেদ: প্রথমে শ্রীলঙ্কার জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আসলে সংকট নিরসনের কী উপায় বের করতে পারে।

রাজাপাকসের বাড়ির কাছে বিশাল বিমানবন্দর আর সমুদ্রবন্দর করা হলো। এই সিদ্ধান্ত চীন দেয়নি। এখন সেখানে কোনো উড়োজাহাজ যেতে চাইছে না। রাজাপাকসে আঞ্চলিক প্রীতি দেখাতে গিয়ে বিলাসী উন্নয়ন ঘটালো। কেন এটি করা হলো তার জবাব তো শ্রীলঙ্কার মানুষকে চাইতে হবে।

আবার এটিও গুরুত্ব দিতে হবে যে, শ্রীলঙ্কার ফাইভ স্টার হোটেলগুলোয় কেন এবং কারা বোমা হামলা করলো। এর পেছনের কারও বের করা দরকর। পর্যটনশিল্প তো তখন থেকেই ধরা।

জাগো নিউজ: বিনিয়োগ বাড়াতে ভ্যাট-ট্যাক্সের মার্জিন কমানো হয়েছিল। সংকটের জন্য এই সিদ্ধান্তকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। অন্তত রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি দেখা দেওয়ায়।

ইমতিয়াজ আহমেদ: সেখানে পশ্চিমারাও এক সময় বিনিয়োগ করেছিল। চীনের বিনিয়োগ বাড়ায় পশ্চিমারা আগ্রহ হারায়। তামিলদের শক্তি নিঃশ্বেষ করার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও সামনে এলো। পশ্চিমারা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিলো সুযোগ পেয়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল রাজাপাকসের বিরুদ্ধেই এবং প্রথমবার যখন ক্ষমতায় আসেন।

রাজাপাকসের পর শ্রীসেনা ক্ষমতায় আসে। শ্রীসেনার ক্ষমতায় আসাটা ছিল ইউনিক এবং বিশেষ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে। তাকে সমর্থন দিলো চন্দ্রিকা। একই দলের হলেও রাজাপাকসেকে পছন্দ করতো না। সংকট বাড়লো তাতে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকট দেশটির জন্য সমস্যা বাড়াতে থাকলো।

এরপর আবারও রাজাপাকসে ক্ষমতায় এলো এবং বিদেশিদের পুনঃবিনিয়োগ কমতে থাকলো। একমাত্র চীন ছাড়া। ভারতের উৎসাহ থাকলো না, পশ্চিমাদের উৎসাহ থাকলো না। বিনিয়োগ নেই, ট্যুরিস্ট নেই, মহামারির থাবা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক থাকলো না।

এএসএস/এএ/জেআইএম

‘ত্রিশ বছর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের শ্রীলঙ্কা আসলে ধারণ করেনি। উন্নয়নে অংশীদার হয়নি। যে কারণে চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই নির্ভরতা টেকসই উন্নয়নে সহযোগী হতে পারেনি।’

‘যুদ্ধের পর দেশটির মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্নীতি তারা থামাতেই পারেনি। দুর্নীতি সব দেশেই হয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্নীতির টাকাটা বাইরে চলে যায়। দেশে এই টাকা বিনিয়োগ হলে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না।’

‘শ্রীলঙ্কায় ট্যুরিজম সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সেক্টরের বড় ক্ষতি হয়েছে দশ বছর আগে সিরিজ বোমা হামলার কারণে, যার পেছনে বিদেশিদের হাত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]