‘শ্রীলঙ্কার আজকের পরিস্থিতির জন্য দুর্নীতিই প্রধানত দায়ী’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৬ এএম, ১৯ এপ্রিল ২০২২

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়, অটোয়া ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাপানের ইয়োকোহামা সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। আলোচনা করেন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রসঙ্গ নিয়েও। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: ভারতের পক্ষ থেকে শ্রীলঙ্কা সংকট কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছে?

ইমতিয়াজ আহমেদ: ভারত রাজাপাকসের পরিবারকে কতটুকু বিশ্বাস করবে সেটা দেখার বিষয়। শ্রীসেনা ক্ষমতায় আসার পর ভারত বেশ উৎসাহী ছিল। অনেকে মনে করেন শ্রীসেনা আসার পেছনে ভারতের হাইকমিশনের ভূমিকা ছিল।

রাজপাকসে শ্রীলঙ্কায় জনপ্রিয় ফিগার হওয়ার পরেও শ্রীসেনার কাছে হেরে যান তখন। রাজপাকসে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে ভারতবিরোধী মনোভাবও কাজ করেছে। ফলে রাজাপাকসের ব্যাপারে দিল্লি এখন কতটুকু উৎসাহী থাকবে, সেটা অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এবার রাজপাকসে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-শ্রীলঙ্কার মিডিয়া প্রকাশ্যে বলতে থাকলো যে, এতে দিল্লির বড় ক্ষতি হয়ে গেলো। কারণ দিল্লি শ্রীসেনার ওপই নির্ভর করেছিল। চীনকে খুশি রেখে দিল্লি বা পশ্চিমাদের খুশি রাখা শ্রীলঙ্কার জন্য কঠিনই বটে।

জাগো নিউজ: আসলে বিদেশ নীতিই কী একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণে সব ভূমিকা রাখে?

ইমতিয়াজ আহমেদ: কিছুটা তো বটেই। কিন্তু শ্রীলঙ্কার আজকের পরিস্থিতির জন্য দুর্নীতিই প্রধানত দায়ী। প্রচুর অর্থপাচার হয়েছে। এই অর্থ দেশের মধ্যে বিনিয়োগ হলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

জাগো নিউজ: অভিযানেই হোক আর চুক্তির মাধ্যমেই হোক তামিল টাইগাররা শক্তিহীন। আজকের পরিস্থিতিতে তারা বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না?

ইমতিয়াজ আহমেদ: বলা মুশকিল। তামিলদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তারা সমাঝোতা করেনি। তারা আলাদা দেশ গঠনের চেষ্টা করেছিল। আগ্রাসী নীতি অবলম্বন করে সন্ত্রাস চালালো। নতুন প্রজন্ম তামিল টাইগারদের ওপর ভরসা রাখবে তা মনে করার কারণ নেই। ভারতও এসবে আর জড়িত হতে চাইছে না। সে-ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর।

আবার উন্নয়নশীল দেশ হয়ে যাওয়ার কারণে বিদেশি সাহায্যও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমার মনে হয় না যে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় আছে।

জাগো নিউজ: তৃতীয় কোনো শক্তির উত্থান…

ইমতিয়াজ আহমেদ: ত্রিশ বছর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সিনহালা সেনাবাহিনীর এক ধরনের ভূমিকা কিন্তু ছিল। জরুরি অবস্থা জারি করায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা আরও বাড়বে। তবে এখানে ভারতের ভূমিকা গুরুত্ব পেতে পারে।

রাজাপাকসের ব্যাপারে ভারতের বিশ্বাস নেই প্রথমত। দ্বিতীয়ত, সিনহালা মিলিটারির ওপরও ভারতের বিশ্বাস নেই। তামিলরা তো সেনাবাহিনীতে নেই। এমন একটি কাঠামোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা বলা মুশকিল।

তবে আমি আবারো ঐক্যের ওপরই গুরুত্ব দেবো। কারণ বিভাজন হলে সমস্যা আরও বাড়বে। তামিলদের পতনের পর সিনহালারা এমনিতেই নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। যারা ঐক্য গড়বেন তাদের বেশিরভাগই দেশের বাইরে চলে গেছেন।

এই সংকটের মধ্যে অতিবামপন্থিরা কোনো সুযোগ নিতে পারবে কি না, তা বলা যাবে না। বাইরে যারা ফান্ড নিয়ে চলে গেছে, তারা বিনিয়োগ করবে না, তাও বলা যাবে না। এই বিষয়গুলো অবশ্যই আমলে আনতে হবে আগামী শ্রীলঙ্কার জন্য। তবে কেউ না কেউ তো সমাধানের জন্য এগিয়ে আসবে এবং একটা কিছু হয়তো ঘটবে।

জাগো নিউজ: শ্রীলঙ্কা সংকট থেকে বাংলাদেশকেও শিক্ষা নিতে বলছেন অনেকে। বিশেষ করে জনপ্রিয় উন্নয়ন, দুর্নীতি, অর্থপাচারের মতো বিষয়গুলোতে দু’দেশের মধ্যকার সাদৃশ্য খুঁজছেন অনেকেই।

ইমতিয়াজ আহমেদ: শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতির তুলনা করার আগে কয়েকটি বিষয় আমলে নিতে হবে।

সবার আগে যে পার্থক্য তা হচ্ছে বিদেশি ঋণের বিষয়টি। বাংলাদেশ অর্থনীতির ভালো সময়ে এসে বিদেশি ঋণ নিতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ঋণ নিয়েছে খারাপ সময় থেকে। যে কারণে এক সময়ে এসে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। আবার আমাদের ঋণের সুদও অনেকটা কম। আমাদের বড় ঋণদাতা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি। তারপর জাপান। এরপরে চীন। এটি অনেকেই খেয়াল রাখে না। চীনের ঋণ নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভালো সময়ে এসে। খারাপ অবস্থায় আমরা নেইনি।

আমাদের এখানকার এলিটরাও বাইরে চলে যাচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা বাইরে পড়ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো এখনো হয়নি।

শ্রীলঙ্কার ঋণ নেওয়া সাধারণত ট্যুরিজম সেক্টরের উন্নয়নে। আর আমরা ঋণ নিয়ে যে উন্নয়ন করছি এর সঙ্গে ট্যুরিজমের তেমন সম্পর্ক নেই। আমাদের ঋণ নেওয়া অবকাঠামো নির্মাণে, তবে সেটা সরবরাহ বাড়াতে। এই পার্থক্যটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে।

রাজাপাকসের বাড়ির কাছে এয়ারপোর্ট বানানো হলো। আমরা এখনো সেই জায়গায় যাইনি।

জাগো নিউজ: আমাদের এখানেও তো দুর্নীতির অভিযোগ আছে। লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ করছে...

ইমতিয়াজ আহমেদ: এটি সাদৃশ্য। শ্রীলঙ্কার এলিটরাও যেমন ভরসা রাখতে পারেনি তেমনি বাংলাদেশের এলিটরাও ভরসা রাখতে পারেনি। ব্যতিক্রম হচ্ছে ব্যবসায়ী এলিটদের ক্ষেত্রে। এরা তো ব্যবসাটা কারও হাতে দিয়ে যেতে পারেন না। যে কারণে পরের প্রজন্ম হলেও দেশে এসে ব্যবসার দায়িত্ব হাতে তুলে নিচ্ছে।

কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত বিশাল অঙ্কের টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। পাচার হয়ে যাচ্ছে উন্নত দেশগুলোতেই। দুর্নীতি-অর্থপাচার না থামাতে পারলে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি হবে, এটি বলতেই পারি। মহামারির সময় গণমাধ্যম আতঙ্ক তৈরি করলো। এতে অনেকেই দেশের বাইরে চলে গেলো। অর্থ নিয়ে গেলো। একবার খবর প্রকাশ করলো দুই মিলিয়ন মানুষ মারা যাবে। কোনো তথ্য যাচাই ছাড়াই। এটি তো দায়িত্বশীল আচরণ হলো না।

জাগো নিউজ: টিসিবির দীর্ঘ লাইন, বাজার পরিস্থিতি দেখে কী বলবেন?

ইমতিয়াজ আহমেদ: সংকট আছে। কিন্তু আমি যদি মূল্যস্ফীতি দেখি তাহলে খুব বেশি আতঙ্ক হওয়ার কারণ নেই। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। তাকে নির্বাচনে যেতে হয়। স্থানীয় নির্বাচনে গুরুত্ব দিতে হয়ে। মানুষ না খেয়ে মরবে এটি সরকার চাইবে না।

আমরা তো মহামারির মধ্যে সরকারের সফলতা দেখেছি। বিদেশিরাও প্রশংসা করছেন। অনেকেই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করেছিলেন। তা হয়নি।

রেমিট্যান্স আমাদের অন্যতম ভরসা। আমাদের এলিটদের পরিবার থাকে বিদেশে, সে থাকে দেশে। আর মেহনতি মানুষেরা বিদেশে শ্রম দিচ্ছে আর পরিবার থাকছে দেশে। উল্টো হয়ে গেছে।

আমি মহামারির শুরুর সময় বলেছিলাম, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বাড়বে।

জাগো নিউজ: এর ব্যাখ্যা কী ছিল?

ইমতিয়াজ আহমেদ: আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের বাবা-মা, পরিবার দেশে থাকে। সে বিদেশে না খেয়ে থাকলেও দেশে টাকা পাঠাবে। মহামারির সময় দায়িত্বটা আরও বেশি করে পালন করেছে। এই মানবিক সংস্কৃতিটা অর্থনীতিবিদরাও তখন ধরতে পারেনি। এখনো তারা বুঝতে পারছে কি না জানি না।

প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে যেসব কাজ করেন, তা কখনো বন্ধ হবে না। মহামারির বিষয়টি অধিক আতঙ্ক আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। আসলে এত আতঙ্কের বিষয় ছিল না।

আমি তখন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হককে মেসেজ করে লিখেছিলাম, এত আতঙ্কিত হবেন না। ব্যবসা আরও ভালো হবে। সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারা বেশি মাত্রায় ভয় পেয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদরাও ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।

পদ্মা সেতু নিয়ে নানা আলোচনা আছে। কিন্তু এটি চালু হলে তো বড় প্রভাব ফেলবে অর্থনীতিতে। প্রবৃদ্ধিতে যদি ২ শতাংশও যোগ করে তাহলে তো বড় পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশ এখনো এমন কোনো বিনিয়োগে যায়নি যে, উৎপাদনের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। আমাদের অর্থনীতি ট্যুরিজমনির্ভরও নয়।

আমাদের কৃষিখাত সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মহামারিতে আমরা কৃষির কারণেই বেঁচে গেলাম। খাদ্যনির্ভরতা আমাদের এখনো ভালো অবস্থানে রেখেছে। কৃষি, প্রবাসী শ্রমিক, গার্মেন্টস আমাদের অর্থনীতির ভিত দাঁড় করিয়েছে। সুতরাং টিসিবির লাইন দীর্ঘ হলেই যে হতাশা বাড়ছে, তা মনে করি না। অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনে বাইরে বিক্রি করছেন। কারণ তার নগদ টাকাও দরকার। এই চিত্রও উঠে এসেছে।

সরবরাহ ঠিক রাখা, বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা এবং প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আমরা শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারবো বলে মনে করি।

এএসএস/এএ/জেআইএম

রাজাপাকসের ব্যাপারে ভারতের বিশ্বাস নেই প্রথমত। দ্বিতীয়ত, সিনহালা মিলিটারির ওপরও ভারতের বিশ্বাস নেই। তামিলরা তো সেনাবাহিনীতে নেই। এমন একটি কাঠামোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা বলা মুশকিল।

বাংলাদেশ অর্থনীতির ভালো সময়ে এসে বিদেশি ঋণ নিতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ঋণ নিয়েছে খারাপ সময় থেকে। যে কারণে এক সময়ে এসে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি।

মানুষ না খেয়ে মরবে এটি সরকার চাইবে না। আমরা তো মহামারির মধ্যে সরকারের সফলতা দেখেছি। বিদেশিরাও প্রশংসা করছেন। অনেকেই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করেছিলেন। তা হয়নি।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]