Jago News logo
Banglalink
ঢাকা, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭ | ১৬ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পৃথিবীর আলো দেখতে চায় ওরা


রুবেলুর রহমান, রাজবাড়ী

প্রকাশিত: ০৯:০৭ এএম, ২৭ জানুয়ারি ২০১৬, বুধবার | আপডেট: ০৪:০৩ পিএম, ২৭ জানুয়ারি ২০১৬, বুধবার
পৃথিবীর আলো দেখতে চায় ওরা

সারা বিশ্বে যখন আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা বিদ্যমান এবং প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের সহায়তা করার মানুষের অভাব নেই ঠিক তখনি রাজবাড়ীতে একই পরিবারের চার ভাই অন্ধত্বকে বরণ করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এদের কল্যাণে কেউ তেমন একটা এগিয়ে আসেনি বরং অন্ধত্বের সুযোগে পৈতৃক সম্পত্তি ভুমিদুস্যুরা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজবাড়ীর নিভৃত এক গ্রামে বসবাসরত এই চার ভাইয়ের আকুতি, তারা দেখতে চায় পৃথিবীর আলো নয়ত পুনর্বাসন। এমনি এক অসহায় পরিবারের বসবাস জেলা সদরের বানিবহ ইউনিয়নের পূর্ব দক্ষিণ বানিবহ গ্রামে।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার বানিবহ ইউনিয়নের পূর্ব দক্ষিণ বানিবহ গ্রামের আবুল খায়ের মিয়ার ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে। বড় ছেলে আবুল বাশার (৩৫), মেজ ছেলে আবুল কালাম মিয়া (৩২), সেজ ছেলে আব্দুস ছালাম (৩০) ও ছোট ছেলে আব্দুল মোতালেব (২২)। ৪ ছেলের ৪ জনই দেখতে পাচ্ছেন না সুন্দর এই পৃথিবীর আলো।

জানা গেছে, আবুল খায়ের মিয়ার মেয়েদের কেউই এ পর্যন্ত অন্ধ হয়নি কিন্তু একে একে চার ছেলেই অন্ধ। ছোট ছেলেটি শতভাগ অন্ধ না হলেও ৭৫ ভাগ অন্ধ। ক্রমেই তার দৃষ্টিশক্তি লোপ পাচ্ছে। এরা চার ভাই মোটামোটি লেখাপড়া জানে। এদের বড় ভাই বিয়ের আগে কিছুটা চোখে দেখলেও বিয়ের পর দৃষ্টি শক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়। প্রথম থেকেই তিনি তার স্ত্রীর কাছে তার অন্ধত্বের কথা গোপন রাখলেও পরে তার স্ত্রী বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে ছেড়ে চলে যায়। রেখে যাওয়া তাদের কন্যা সন্তানটি নিয়ে আজও পথ চেয়ে বসে আছে কবে আসবে তার স্ত্রী। মেঝ ভাই অন্ধত্ব বিষয়টি জানিয়ে তার খালাত বোনকে বিয়ে করে। সেজ ভাই অন্য ভাইদের দুর্দশা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে চিরকুমার থাকবে। ছোট ভাই ৫০ ভাগ অন্ধ অবস্থায় প্রেমের সম্পর্কেও মাধ্যমে প্রতিবেশীর এক মেয়েকে বিয়ে করে ঘর সংসার করছে।

আবুল বাশার (৩৫) ১৯৯৮ সালে সামান্য অন্ধ অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে। এইচএসসি ভর্তি হওয়ার তিন মাসের মাথায় সম্পূর্ণ অন্ধ হয়। চিকিৎসকের কথামত তিনি বিয়ে করেন । বাচ্চা হওয়ার পর তার স্ত্রী বুঝতে পারে তার স্বামী অন্ধ। তাই তিনি তার কন্যা সন্তানকে রেখে বাবার বাড়ি চলে যায়। এখন ছয় বছরের মেয়ে বুশরাকে নিয়ে পথ চেয়ে আছে কবে তার স্ত্রী ঘরে ফিরবে।
    
 আবুল কালাম মিয়ার (৩২) এসএসসি পরীক্ষার আট মাস আগে চোখের সমস্যা দেখা দেয়। ওই অবস্থাতেই তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও এক বিষয়ে ফেল করে। এরপর থেকে তিনি চোখের সমস্যার কারণে আর লেখাপড়া করতে পারেননি। এরপর তিনি ঢাকা চলে যায় এবং ঘুরতে ঘুরতে আকিজ গ্রুপের কোনো এক কর্মকর্তার বদৌলতে একটি চাকরি পান। চার বছর চাকরি করার পর অন্ধত্বের কারণে কোম্পানির অনেকেই তাকে অবহেলা করতে থাকে। তাতে সে মনের কষ্টে এলাকায় চলে আসে। ২০১০ সালে তার খালাত বোনকে বিয়ে করেন। কোনো মতে নিজের সামন্য ক্ষেত- খোলা চাষ করে জীবন অতিবাহিত করছেন।

আব্দুস ছালাম (৩০) ৮ম শ্রেণি পাস করে নবম শ্রেণিতে উঠলে তার চোখের সমস্যা দেখা দেয়। পড়ালেখা বাদ দিয়ে মনের দুঃখে অজানার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় । ঢাকায় একটি গার্মেন্টস এ গিয়ে কোনো রকম একটি কাজ নেয়। অন্ধত্বের কারণে প্রায়ই কাজে ভুলক্রটি ধরা পড়ত বলে কিছুদিন পর গার্মেন্টেস এর চাকরিটি চলে যায়।

এরপর তিনি আর একটি কোম্পানিতে লিফটম্যান হিসেবে চাকরি পায়। এখানে কিছুদিন চাকরি করার পর তার দৃষ্টি দিনে দিনে আরো লোপ পেতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেলে চাকরিচ্যূত হয়ে বাড়ি চলে আসে। তার ইচ্ছা তিনি বিয়ে না করে অন্ধ ভাই ও পরিবার পরিজনের সহযোগিতা করবে। তবে কেউ যদি কখনও তাকে চাকরির প্রস্তাব দেয়তিবে তিনি তা বিবেচনা করবেন।

আব্দুল মোতালেব (২২) বছর খানেক ধরে ক্রমেই অন্ধ হয়ে পড়ছেন। এলাকার একটি মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছেন। এখন তিনি ৭৫ ভাগ অন্ধ অবস্থায় গাছে উঠা, সাইকেল চালানোসহ বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম করে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছে। তিনি জানায়, সুক্ষকাজ ছাড়া যে কোন ধরনের কাজ সে করতে পারে। তাই কোন প্রতিষ্ঠান তাকে কোন কাজ দিলে তিনি ঠিকভাবে কাজ সম্পাদন করতে পারবে বলে দাবি করেন।

এই অন্ধ ৪ ভাইয়ের বাবা আবুল খায়ের মিয়া (৬৫) জানান,  ২২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে তার ছেলেরা একে একে অন্ধ হয়ে গেছে। তাদের আর্থিক সঙ্গতি তেমন একটা নেই। সামান্য কিছু জমির উপরই তাদের পরিবারটি চলে। একমাত্র ছোট ছেলেটি তার কাজকর্মে সহায়তা করতে পারে। তিনি জানান, সরকারি অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়াও তার সম্পদ রক্ষার্থে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বানিবহ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, ২৫ বছর হওয়ার পর থেকেই তারা অন্ধ হতে শুরু করে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু সাহায্য করেছি। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। এই পরিবারের আয় উপার্জনের কেউ নেই। সরকারের একটু সাহায্য সহযোগিতা পেলে পরিবারটির একটা উপায় হবে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আমজাদ হোসেন এর সঙ্গে কথা হয়। তিনি চার ভাইকেই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষা করে জানান, এই রোগের নাম রেটিনাইটস পিগমেনটোসা (আরপি)। এটি বংশগত রোগ। সাধারণত যারা আপন আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে করে তাদের ছেলে বাচ্চারা এই রোগে আক্রান্ত হয়। রোগটি দুই চোখ একইভাবে আক্রান্ত হয় । প্রথমে রাতকানার রোগের মধ্য দিয়ে এই রোগটি শুরু হয়। ৩০ বছর বয়সের মধ্য এর প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। চোখের পিছনের পর্দা বা রেটিনা আক্রান্ত হয়।

তিনি আরও জানান, এই রোগের আজ পর্যন্ত ভাল চিকিৎসা নেই তবে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ ও ভিটামিন ই এবং হলুদ ফলমূল শাকসবজি খেলে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হতে পারে। এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসা থেকে সচেতনতাই বেশি কার্যকর বলে এই চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন।   

অন্ধ এই চার ভাইয়ের ব্যাপারে কথা হয় রাজবাড়ী জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দীপক কুমার প্রামানিকের সঙ্গে। তিনি জানান, চারজনের সঙ্গেই তার পরিচয় আছে। ইতোমধ্যে এদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেয়া হয়েছে এবং আগামিতেও সমাজসেবা অধিফিতরের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
    
এসএস/পিআর

বিষয়: রাজবাড়ী

আপনার মন্তব্য লিখুন...