নতুন স্বপ্নে বিভোর আবুল হাসান রাজু

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ পিএম, ০৯ জানুয়ারি ২০১৮

তিনি একটি বিশ্ব রেকর্ডের জন্মদাতা। টেস্ট ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ১৪১ বছরের ইতিহাসে মাত্র দু’জন ব্যাটসম্যানের অভিষেকে ১০ নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করার বিরল রেকর্ড গড়েছেন। যার প্রথমটি একজন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের। নাম রেগি ডাফ।

১৯০২ সালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১০ নম্বরে নেমে টেস্টে শতরানের দূর্লভ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন রেগি ডাফ। সেটা ছিল তার প্রথম টেস্ট। তার ঠিক ১১০ বছর পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছিলেন আবুল হাসান রাজু।

২০১২ সালের নভেম্বরে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে ১০ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে ব্যাট হাতে শুরুতেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেন আবুল হাসান রাজু।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সাথে নবম উইকেটে ১৮৪ রানের বিরাট পার্টনারশিপ গড়ার পাশাপাশি সেঞ্চুরি (১৬৩ মিনিটে ১২৩ বলে ১৪ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ১১৩) করে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেন সিলেটের এ আত্মপ্রত্যয়ী যুবা।

টেস্ট ক্রিকেটের ১৪১ বছরে ইতিহাসে ১০ নম্বর পজিসনে ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরি করার ঘটনাই মোটে ৪টি। কারণ, যিনি ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নামেন, তার সঙ্গী থাকে মোটে দু’জন। দুটি মাত্র জুটি বা পার্টনারশিপে একজনের তিন অঙ্কে পৌঁছে যাওয়া আসলেই খুব কঠিন। অতি মানবীয় ব্যাটিং ছাড়া আসলে তা করাও সম্ভব নয়। তাই টেস্টে ১০ নম্বরে নেমে শতরানের রেকর্ড খুব কম। আবুল হাসান রাজু ঐ বিরল কৃতিত্ব দেখানো চারজনের একজন। টেস্টে সর্বশেষ ১০ নম্বরে নেমে শতরানের কৃতিত্ব আছে দক্ষিণ আফ্রিকার প্যাট সিমকক্সেরও।

কিন্তু টেস্ট অভিষেকে ১০ নম্বরের মত অত নিচে ব্যাটিং করতে নেমে শতরান করা ব্যাটসম্যান মোটে দু’জন; একজন অস্ট্রেলিয়ার রেগি ডাফ। আর দ্বিতীয়জন বাংলাদেশের আবুল হাসান রাজু। আরও একটি তথ্য আছে, সেটাও রাজুর পক্ষে। রাজু মূলতঃ মিডিয়াম পেসার। পেস বোলারের কোটাতেই দলে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। রেগি ডাফ ছিলেন আসলেই ফ্রন্টলাইন ব্যাটসম্যান।

মেলবোর্নের উইকেট খারাপ থাকায় তাকে নিচের দিকে ব্যাট করতে নামানো হয়। তিনিও সেঞ্চুরি করে বসেন; কিন্তু আবুল হাসান রাজু ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবেই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। এমন স্বপ্নিল যার টেস্ট অভিষেক, সেই ক্রিকেটার প্রায় পাঁচ বছর টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে। ২০১৩ সালে মার্চে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার সাথে শেষ টেস্ট খেলেছেন। মাঝে কেটে গেছে চার বছর দশ মাস। রাজুর আর টেস্ট ক্রিকেটই খেলা হয়নি।

শুধু টেস্ট ক্যারিয়ারই নয়, প্রায় ছয় বছর আগে (২০১২ সালের ১৮ জুলাই বেলফাস্টে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে) টি-টোয়েন্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করা আবুল হাসান রাজুর ওয়ানডে জীবন শুরু হয়েছিল ২০১২ সালেই; কিন্তু হায়, কোন ফরম্যাটেই নিজের অপরিহার্যতার প্রমাণ দেয়া সম্ভব হয়নি।

তিন টেস্ট (৫ ইনিংসে এক সেঞ্চুরিসহ ১৬৫ ও ৩ উইকেট), ছয় ওয়ানডে (২ বার ব্যাট করে ৪ রান ও উইকেটশূন্য) আর ৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে (একবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ৯ রান ও বল হাতে ৪ খেলায় ২ উইকেট, সেরা ২/৩৩) রাজু তিন ফরম্যাটেই জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়েছেন।

দিনক্ষণের হিসেবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তার শেষ ম্যাচ ২০১৫ সালের ১৭ এপ্রিল। শেরে বাংলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে তামিম ও মুশফিকুর রহীমের জোড়া শতরানে সাজানো ম্যাচে বাংলাদেশ ৭৯ রানের বড় ব্যবধানে জিতলেও রাজু একটি উইকেটও (৫ ওভারে ০/৪২) পাননি।

এবার তার সামনে আবার লাল সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নামার হাতছানি। সবার ধারণা, বিপিএলে সিলেট সিক্সার্সের হয়ে ভাল খেলার কারণেই আবার তাকে নেয়া হয়েছে। রাজু নিজেও মনে করেন, বিপিএলের পারফরম্যান্সই তাকে জাতীয় দলে ফিরিয়ে এনেছে।

আজ মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে অনেক কথার ভীড়ে রাজুর অকপট স্বীকারোক্তি, বিপিএলে ভাল খেলার কারণেই তাকে নির্বাচকরা বিবেচনায় এনেছেন। তার বোলিং ভাল হওয়ার পিছনে পাকিস্তানের কিংবদন্তীতুল্য ফাস্ট বোলার ও সিলেটের মেন্টর হিসেবে কাজ করা ওয়াকার ইউনুসের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রাজুর।

তিনি বলেন, ‘বিপিএল আসলে এই জায়গায় আসার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল আমার কাছে। ওয়াকার ভাই (ওয়াকার ইউনুস) ছিলেন আমাদের দলে। আমার অনেক আত্মবিশ্বাস ছিল যে, ওয়াকার ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে স্কিলগুলো ডেভেলপ করতে পারব। আমি যেটা পারসোনালি ফিল করি, আমার রিভার্স সুইংটা নিয়ে অনেক বেশি কাজ করেছি ওয়াকার ভাইয়ের সঙ্গে। পাশাপাশি স্লো বল নিয়েও কথাবার্তা হয়েছে। আমি আগের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী। মনে হয় এখন পারফরম করার সময় আসছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমি এখন আত্মবিশ্বাসী।’

কিন্তু তার ট্র্যাকের রেকর্ড তো তা বলছে না। আপনি ৬ ওয়ানডে খেলে উইকেটই পাননি। এমনকি চার টি-টোয়েন্টি ম্যাচের প্রথম তিনটিতেও উইকেটশূন্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সেই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে কি?

রাজুর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি আত্মবিশ্বাসী। আসলে আগে একটু অন্যরকম ছিলাম। এখন অনেক কিছুই ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। দেখি যদি চান্স পাই, তাহলে নিজেকে প্রমাণ করব।’

বোলিংয়ে কি কি বদল হয়েছে, উন্নতির জায়গাগুলো কোথায়? রাজু মনে করেন, তার লাইন অ্যান্ড লেন্থটা ভাল হয়েছে। অফ সিজনে বোলিং নিয়ে অনেক বেশি কাজ করেছি- এমন দাবিও মুখে, ‘বিপিএলেও অনেক বেশি ঘাম ঝরিয়েছি। ওয়াকার ভাই, চম্পকা রামানায়েকে আর সুজন ভাই সবার সঙ্গে কাজ করেছি।’

তিনজন বোলিং কোচের সাথে কেমন কাজ করেছেন, তা জানতে চাওয়া হলে রাজু জানান, ‘এখানে পেস বোলিং ক্যাম্পে তো চম্পকার সঙ্গে অকেদিন কাজ করছি। এখনও করছি। ওয়ালশের সঙ্গে আগে ও রকম কাজ করার তো সুযোগ হয়নি আমার। এখন জাতীয় দলে ডাক পাবার পর উনার সঙ্গে কাজ করছি। চাচার (খালেদ মাহমুদ সুজনের) সঙ্গে তো আগে থেকেই আছি। তিনজনই লাইন অ্যান্ড লেন্থ ঠিক করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাই ওটা নিয়েই বেশি কাজ করছি।’

এআরবি/আইএইচএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :