চাপেই ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশ!

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ পিএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

টেস্ট সিরিজে হারের পর ‘চাপ’ নিতে না পারাকেই দায়ী করেছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগেরদিন সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন ভয়-ডরহীন ক্রিকেট খেলার। তাহলেই নাকি সাফল্যের ভিত রচিত হবে। ব্যর্থতা নিয়ে যদি চিন্তা করা হয়, তাহলে নাকি টি-টোয়েন্টিতে সাফল্যের পরিমাণটা কমে যাবে।

খুবই পজিটিভ কথা-বার্তা। একজন অধিনায়কের মুখে ভয়-ডরহীন ক্রিকেট খেলার কথা জোর গলায় শুনতে পেলে দলের বাকিরা উজ্জীবিত হবেই- কোনো সন্দেহ নেই। তবে মাহমুদউল্লাহর দুর্ভাগ্য- একে তো সাকিব আল হাসান নেই। যে কারণে দায়িত্বের বোঝা বর্তেছে তার ঘাড়ে। সাফল্য-ব্যর্থতা যাই হোক- সব দায়-দায়িত্ব কিন্তু অধিনায়ককেই বহন করতে হয়। সঙ্গে ইনজুরির কারণে খেলতে পারেননি তামিম ইকবাল। দুর্ভাগ্যের পাল্লাটা ভারি হয়েছে আরও।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দুর্ভাগ্য এখানেও। ব্যর্থতাই সঙ্গী থাকছে তার। সাফল্যের আলো ঝিলিক দিয়ে গেলেও, সেটা যেন মরিচিকা। ধরা গেলো না, ছোঁয়া গেলো না, স্পর্শ পাওয়া গেলো না। ঝিলিক দিয়ে দুরে মিলিয়ে গেলো। ফিয়ারলেস (ভয়-ডরহীন) ক্রিকেট খেলেছেন তার ব্যাটসম্যানরা। সৌম্য-মুশফিক এবং তার নিজের দারুণ ব্যাটিংয়ে রান গিয়ে দাঁড়াল ১৯৩-এ। টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রানের স্কোর।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার কখনও ১৭৪ রানের বেশি তাড়া করে টি-টোয়েন্টি জেতার রেকর্ড নেই। বাংলাদেশ তো জিতেই গেছে- এমনটা ভেবে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু বিপিএলে খেলা আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় সেটা আর ক’জনই বা চিন্তা করে টিম ম্যানেজমেন্টের! ‘ফ্রেশ ব্লাড’ আমদানির নীতি অবলম্বন করলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ কতটা সামলাতে পারবেন অনুর্ধ্ব-১৯ দলে খেলা কিংবা বিপিএলে পারফর্ম করা ছোকরাগুলো!

সুতরাং, ১৯৩ রান করার পরও শ্রীলঙ্কা যখন ২০ বল হাতে রেখে ১৯৪ রান করে জয় তুলে নেয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না আমাদের বোলাররা কতটা পারফরম্যান্স করতে পেরেছেন! ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়ে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তাই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে বলতে হলো, ‘যেখানে তাদের ওপর চাপ তৈরি করার কথা ছিল আমাদের, সেখানে উল্টো চাপের কাছেই হেরেছি আমরা।’

তামিমের পরিবর্তে জাকির হাসানের মত সদ্য অনুর্ধ্ব-১৯ দল পার করা ক্রিকেটারকে অভিষেকে নামিয়ে দেয়া হলো ওপেনিং করতে। সৌম্যর সঙ্গে সূচনাটা ভালো করলেও জাকির আউট হয়েছেন ব্যক্তিগত ১০ রানে। এরপর মুশফিক-সৌম্য ভালোই জুটি গড়েন। আফিফ হোসেনকে মাঠে নামানো হলেও সেই যে চাপ- সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি তিনি। সদ্য অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলে এসেছেন। ছিলেন নজরকাড়া পারফরমার; কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপটা ঠিক নিতে পারেননি আফিফ। যে কারণে বল হাতেও দেখা গেলো ২ ওভারে দিয়েছেন ২৬ রান। উইকেট নিয়েছেন ১টি।

সাইফউদ্দিন চাপ কতটা সামাল দিতে পারেন সেটা এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডেভিড মিলারের হাতে এক ওভারে ৫ ছক্কা খেয়েছিলেন তিনি। বিপিএলেও এক ম্যাচে শেষ মুহূর্তে খুব বাজে বোলিং করেছিলেন। এই ম্যাচে এসেও ১৯৩ রানের পুঁজি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে অসাধারণভাবে মেলে ধরতে পারেননি তিনি। ২ ওভারে দিয়েছেন ৩৩ রান। কতটা উদার তিনি। নতুন হিসেবে নাজমুল অপুই ছিলেন অন্যদের তুলনায় কিছুটা উল্লেখ করার মত। ৪ ওভারে ২৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ২ উইকেট।

মাহমুদউল্লাহ ২ ওভারে দিয়েছেন ২৩, অভিজ্ঞ পেসার রুবেল হোসেন ৩.৪ ওভার বল করে দিয়েছেন ৫২ রান। টি-টোয়েন্টিতে মোস্তাফিজের বোলিংও এখন অকার্যকর। ৩ ওভারে দিয়েছেন ৩২ রান। অথ্যাৎ বড় পুঁজি থাকা সত্ত্বেও লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের চাপ সামলাতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা।

সাব্বির রহমানের কী হয়েছে বলা মুস্কিল। টি-টোয়েন্টিতে নিয়মিতই তিন নম্বরে ব্যাটিং করতেন। সেখানে উঠে এসেছেন মুশফিক। যদিও দারুণ ব্যাটিং করেছেন তিনি। ক্যারিয়ার সেরা, ৬৬ রানের ইনিংস খেলেছেন মুশফিক। কিন্তু পজিশন নাড়িয়ে দিয়ে সাব্বিরের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছি কি না সেটা বিবেচনায় আনা জরুরী।

সৌম্য সরকার যেভাবে রান তুলছিলেন, অনেকেই ভেবেছিল বাংলাদেশের রান ২০০ পার হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত হয়েছে ১৯৩। ম্যাচ শেষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বলছেন, তাদের ১০-১৫টা রান কম হয়ে গেছে। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে গিয়ে রিয়াদ বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের ১০-১৫টা রান কম হয়ে গেছে। আমাদের অবশ্যেই ২০০ প্লাস রান করতে হতো। মুশফিক তিন নম্বরে ভালো ব্যাটিং করেছে। সৌম্য আর জাকিরের ওপেনিংটা ছিল চমৎকার। আরিফুলসহ অন্যরা ব্যাটিংয়ের গভীরতা আনলেও আমরা সেটা কাজে লাগাতে পারিনি।’

প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৪ রান তাড়া করে শ্রীলঙ্কা জিতেছে ২০ বল হাতে রেখে। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের কথা অনুযায়ী ১৫ রানও যদি বেশি হতো, তাহলে বাংলাদেশের স্কোর হতো ২০৮। লঙ্কানদের বাকি ১৫ রান করতে হাতে জমা থাকা ২০ বল থেকে আর কয়টা বল খরচ করতে হতো! সংবাদ সম্মেলনে এসেও ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক কতটা মানসিক চাপে থেকে এমন বেহিসেবি কথা-বার্তা বললেন, সেটা সহজেই বোঝা যায়।

সৌজন্যতাবশতঃ শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের প্রশংসা করলেন মাহমুদউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদেরই কৃতিত্ব দিতে হবে। তারা অসাধারণ ব্যাটিং করেছে।’ বোলারদের এমন নখ-দন্তহীন বোলিংয়ে যে কোনো দলের ব্যাটসম্যানরাই ভালো করবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে মাহমুদউল্লাহ শেষ করলেন, সিলেটে ভালো করার প্রত্যাশা নিয়ে। বললেন, ‘আশা করি, সিলেটে ভালো করে এই সিরিজটাও ভালোভাবে শেষ করতে পারবো।’ কথায় বলে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। মাহমুদউল্লাহ এখন এই ভালোর প্রত্যাশায় দিনগুজরান করছেন।

আইএইচএস/আইআই

আপনার মতামত লিখুন :