দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন কি পূরণ হবে তুষার ইমরানের?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৭:২৩ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৮

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বাধিক রান কার, সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি কোন ব্যাটসম্যানের? কোন ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে সর্বাধিক ফিফটি বেরিয়ে এসেছে? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে ঘুরেফিরে একটি নামই বেরিয়ে আসবে। সবগুলো প্রশ্নের সাথে যে জড়িয়ে আছে তুষার ইমরানের নাম!

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বাধিক ১০৪১৮ রান তুষার ইমরানের। সেই ২০০২ থেকে এবারের বিসিএল অবধি ১৫৬ ম্যাচে ২৬৫ ইনিংসে ২৪ বার অপরাজিত থেকে ২৮টি সেঞ্চুরি, ৫৪টি হাফ সেঞ্চুরি আর ৪৩.২২ গড়ে এই রান করেন তুষার। রান তোলায় তার ধারের কাছেও কেউ নেই।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তুষার বনে গেছেন ‘রান মেশিন’ হিসেবে। তার ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক সেঞ্চুরি। শেষ ছয় ইনিংসে চার চারটি শতক। আর শেষ তিন ইনিংসের প্রতিটায় তিন অংকে পৌছেছেন। এইতো সেদিন ইস্ট জোনের বিপক্ষে বিসিএলের উভয় ইনিংসে শতরানের দুর্লভ কৃতিত্বের অধিকারী তুষার। এর আগে বিসিএলের তৃতীয় রাউন্ডে তুষার ইমরানের ব্যাট থেকে এসেছিল ১৪৮ রানের বড় ইনিংস।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মানে দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে যার রেকর্ড- পরিসংখ্যান আকাশছোয়া, যিনি একের পর এক কীর্তি গড়ে চলেছেন; সেই তুষার দীর্ঘ দিন জাতীয় দলের বাইরে। দীর্ঘদিন মানে কয়েক বছর নয়, প্রায় এক যুগ; ১১ বছর। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ক্যান্ডিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলার পর আর সাদা পোশাকে তার মাঠে নামা হয়নি।

ঘুরিয়ে বললে নামার সুযোগও হয়নি। অথচ এ দীর্ঘ সময়ে কত জনের টেস্ট অভিষেক ঘটেছে। কত ক্রিকেটার, ব্যাটসম্যান সুযোগ পেয়েছেন দলে। বাদ পড়ে আবার বিবেচনায় এসেছেন; কিন্তু তুষার আর সুযোগ পাননি। ১১ বছর ধরে জাতীয় দলের বাইরে থাকার অর্থ- ভাল খেলার প্রবল ইচ্ছা, আকাঙ্খা ও আন্তরিক ইচ্ছার মৃত্যু ঘটা। এসব ক্ষেত্রে ক্রিকেটার নিজে, তার ভক্ত-সমর্থক এবং সাধারণ অনুরাগিরা ধরেই নেন ওই ক্রিকেটারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ।

তুষার ইমরানের জায়গায় অন্য যে কেউ হলে ধরে নিতেন, তারও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ; কিন্তু তুষার ইমরান এখানেই ব্যতিক্রম। জাতীয় দলে দীর্ঘ সময় উপেক্ষিত, নির্বাচক-টিম ম্যানেজমেন্টের চোখে না পড়েও ভাল খেলার ইচ্ছে, চেষ্টা ও দৃঢ় সংকল্প কমেনি একচুলও। বরং নিজ থেকে ভাল খেলার তাগিদ অনুভব করেছেন। এখনো করে যাচ্ছেন।

তাই দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে তুষার ইমরানের এমন ভাল খেলার প্রশংসা অতি বড় সমালোচকের মুখেও। বাংলাদেশের সর্বস্তরের ক্রিকেটপ্রেমী-অনুরাগি সবাই এখন তুষার ইমরান বন্দনায় ব্যস্ত। তাকে নিয়ে অনেক কথা। কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও।

প্রথম প্রশ্ন, প্রায় একযুগ জাতীয় দলের বাইরে থাকার পরও ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলার এবং রান করার এই যে দৃঢ় সংকল্প ও আন্তরিক চেষ্টা- এর পিছনের রহস্য কি?

আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, চার দিনের ক্রিকেটে যার ব্যাট এত চওড়া, যিনি মাঠে নেমে প্রায়ই বড় ইনিংস (সেঞ্চুরি) খেলছেন, তাকে কি আবার জাতীয় দলে বিবেচনায় নেয়া যায় না?

জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে এ সময়োচিত প্রশ্নের প্রথম অংশের জবাব তুষার ইমরানের। অনেক কথার ভীড়ে একটি সত্য বেরিয়ে এসেছে। তাহলো, তুষার মনের গহীনে এখনো জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন লালন করেন। কবি গুরু যেমন লিখে গেছেন, সংসার সাগরে আশাই একমাত্র ভেলা। তুষারের জীবনেও এখন সেই আশাই একমাত্র অবলম্বন।

দেশের হয়ে আবার টেস্ট খেলাই এখনও তার একমাত্র স্বপ্ন। তাইতো মুখে এমন কথা, ‘নাহ! এমন ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলার বা রান করার পেছনে কোন রহস্য নেই। জাতীয় দলে ফেরার তীব্র বাসনা, মোহ আর স্বপ্ন দেখি এখনো। সে লক্ষ্যেই ভিতর থেকে ভাল খেলার তাগিদ অনুভব করি।’

৩৪ বছর বয়স। তার সম-সাময়িক প্রায় সবার ব্যাটের ধারা হয় থেমে গেছে, না হয় কমেছে; কিন্তু তুষারের রানের রথ এগিয়ে চলছে উল্কার বেগে। প্রথম জীবনে জাতীয় দলের হয়ে ভাল খেলতে পারেননি। পাঁচ টেস্টে সাকুল্যে ৮৯ রান (কোন ফিফটি নেই, সর্বোচ্চ ২৮, গড় ৮.৯০)। সেই না পারা থেকেই ভাল খেলার তাগিদ অনুভব করেন তিনি।

তুষার বলেন, ‘আসলে নিজের কাছে খারাপ লাগে। দেশের জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। নিজেকে হয়ত ওইভাবে মেলে ধরতে পারিনি। হয়ত সুযোগ ছিল; কিন্তু নিজেই হয়ত পারিনি। এখন ভাবি, যদি আবার সুযোগ আসে, তাহলে আগের না পারার দায় শোধ করতাম।’

মোট কথা, তার মনে আগে ভালো খেলতে না পারার দায়মুক্তির একটা তাগিদ ও আকুতি। আর তাই এখনো চার দিনের ফরম্যাট মানে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ভাল খেলার প্রাণপন চেষ্টা। তার ভাষায়, ‘আমি আমার চেষ্টাটা চালিয়ে যাব। যতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া যায়।’

সে স্বপ্ন কি আলোর মুখ দেখবে? সফল হবে? আপনি আবার কখনো টেস্ট খেলতে পারবেন? কি মনে হয়? তুষারের জবাবটা তার ব্যাটের মতই, ‘আমার আমায় কি হবে? আমার কাজ রান করা। আমি সেটাই করে যাই। স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই। সেটা ব্যক্তিগত স্বপ্ন। এমন ব্যক্তিগত স্বপ্ন থাকতেই পারে। আমারও আছে। আমার হাতে যেটা (ব্যাট) আছে, আমি সেটা করে যাচ্ছি। বাকিটা নির্বাচকদের হাতে। তারা যদি কখনো মনে করেন, টেস্ট দলে আমার প্রয়োজন আছে, তাহলে সুযোগ দিতেও পারেন।’

তুষারের এমন আশার স্বপ্ন সত্যিই বাস্তব রূপ পাবে কি না? তা বলে দেবে সময়। তবে এখনকার খবর, নির্বাচকরা তাকে নিয়ে ভাবছেন। জানা গেছে বোর্ডের উর্ধ্বতন মহলেও তুষার ইমরানকে নিয়ে কথা-বার্তা চলছে। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে যার ব্যাট এখনো বিশ্বস্ত, আস্থার প্রতীক। যিনি এখনো ধৈর্য্য, টেম্পারামেন্ট আর ব্যাটিংয়ে মুন্সিয়ানার মিশেলে একের পর এক সেঞ্চুরি হাঁকাচ্ছেন, তাকে আবার কোনভাবে দলে নেয়া যায় কি-না? সে চিন্তাও চলছে।

তার প্রমাণ প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর কথায়। আজ সকালে জাগো নিউজের সাথে তুষার ইমরান প্রসঙ্গে আলাপকালে মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর ছোট্ট অথচ তাৎপর্য্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘তুষারের কথা মাথায় আছে আমাদের। আমরা একটা প্লাটফর্ম খুঁজছি। দেখা যাক কি করা যায়?’

আগামী জুনের তৃতীয় সপ্তাহে টাইগাররা যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে টেস্ট সিরিজ খেলবে, ঠিক প্রায় একই সময় বাংলাদেশ সফরে আসবে শ্রীলঙ্কার ‘এ’ দল। বাংলাদেশ ‘এ’ এবং হাই পারফরমেন্স ইউনিটের সাথে তিনটি চারদিনের ম্যাচ খেলবে লঙ্কান ‘এ’ দল। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এ ও হাই পারফরমেন্স ইউনিটে হয়ত ডাক পেতে পারেন তুষার ইমরান।

এআরবি/আইএইচএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :